মৃত্যুর কাছে কেন এই নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ?

সৌম্য সিংহ

বিশ্বজুড়ে অদ্ভুত অস্থিরতা। তোলপাড় হৃদয়ের অন্দরমহল। বর্তমান-ভবিষ্যৎ একাকার হয়ে গিয়ে যেন কয়েক মুহূর্তেই ঢাকা পড়ে গিয়েছে অনিশ্চয়তার কালো মেঘে। নিরাশায় কেমন যেন আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে জীবন। গ্রাস করছে অবসাদ। হারিয়ে যাচ্ছে আত্মবিশ্বাস। ঘুরে দাঁড়ানোর ইচ্ছেটাই বোধহয় হারিয়ে যাচ্ছে কেমন করে। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। কিন্তু এই মানসিকতা এখন ঘরে ঘরে। কারণ একটাই, বিশ্বজুড়ে করোনা-ত্রাস। বিপর্যস্ত অর্থনীতি। এবং অবশ্যই কর্মহীন সময়,একাকীত্ব। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা-রিপোর্ট বলছে বাংলার প্রায় ৪৯.৩ শতাংশ মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরে প্রভাব ফেলেছে করোনা এবং লকডাউন। গুরুতর বিঘ্নিত হয়েছে ১০ শতাংশের বেশি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য। পিটিএসডি বা পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে প্রায় ১ কোটি ২ লক্ষ মানুষের। তবে অবশ্যই মনে রাখা দরকার, মানসিক অসুস্থতা-অবসাদ আগেও ছিল, এখনও আছে। করোনার কারণে উদ্ভুত পরিস্থিতি একে আরও উস্কে দিচ্ছে মাত্র। ঠিক যেমন অবসাদের পথ ধরে আত্মহত্যার প্রবণতা অনেকদিন ধরেই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মানব-দুনিয়ার। নেপথ্য কারণে ভিন্নতা থাকলেও,লুকিয়ে থাকা অবসাদটা কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একটা বড় ফ্যাক্টর। সাম্প্রতিক অনিশ্চয়তার অন্ধকারে এই প্রবণতাটাই আসলে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে বিপজ্জনকভাবে।

আপত্তিকর মন্তব্যের ঝড়

মৃত্যু অবশ্যই দুঃখজনক বিশেষ করে তা যদি থাবা বসায় অকালে। তবে আত্মহত্যার যৌক্তিকতায় অবশ্যই থেকে যায় বিতর্কের অবকাশ। থাকে প্ররোচনার সম্ভাবনা। দেখা দেয় তদন্তের প্রয়োজনীয়তাও। এসব তো হতেই পারে। কিন্তু উদ্বেগটা অন্য জায়গায়। দেখা যায়,অনেক ক্ষেত্রেই কোনও সম্ভাবনা অকালে হারিয়ে যাওয়ার থেকেও বেশি দুঃখজনক হয়ে ওঠে যদি ঐ আত্মহত্যাকে কেন্দ্র করে অনাবশ্যক আপত্তিকর আলগা মন্তব্যের ঝড় আসে। সম্প্রতি সুশান্ত সিং রাজপুতের আত্মহত্যার ঘটনার পরে এই বিষয়টাই প্রকট হয়ে উঠলো। মানসিক স্বাস্থ্য বা অবসাদ সম্পর্কে যাঁদের বিন্দুমাত্র জ্ঞান নেই,তাঁরাও বিশেষজ্ঞ সেজে জ্ঞান বর্ষণ করতে শুরু করে দিলেন সোশ্যাল মিডিয়া গ্রুপে। কে যেন অবসাদের সঙ্গে রোমান্টিসিজমকে অযথা জড়িয়ে চূড়ান্ত অপব্যাখ্যাও করলেন বিষয়টার। নিজেদের মতো কাটাছেঁড়া,বিশ্লেষণ – আসল ব্যাপারটা ছেড়ে শুধুই নিজেদের জাহির করার মরিয়া চেষ্টা।একটা ইস্যু হাতে পেয়ে গিয়ে তাকে নিজের মতো ব্যাখ্যা করার অপকৌশল। অথচ এর কিছুদিন আগেই মুম্বইতেই কাজ হারিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন সম্ভাবনাময় এক তরুণ অভিনেতা, একই পথ বেছে নিয়েছেন দক্ষিণ ভারতের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সম্ভাবনাময় ভাইবোন। পৃথিবীকে বিদায় জানিয়েছেন এক মডেল। কতটা আলোড়িত হয়েছিল স্বঘোষিত বিশেষজ্ঞদের মন? দূরে নয় কাছে, এই কলকাতাতেই মাত্র একদিনে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে গেল সাত সাতটা। মাস তিনেক আগে করোনা-ত্রাসের শুরুতেই দিল্লিতে শুধুমাত্র আতঙ্কে আত্মহত্যা করেছিলেন এক যুবক। তাঁর কোভিড টেস্ট হবে শুনেই হাসপাতালের ওপর থেকে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তিনি। কতটুকু আলোচনার ঝড় উঠেছিল বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া গ্রুপে?

উদ্বেগের তথ্য

তথ্যটা সত্যিই উদ্বেগজনক। অন্তত সচেতন নাগরিকদের চোখে তো বটেই। সমীক্ষা বলছে দেশে মোট জনসংখ্যার অন্তত ১৩.৭ শতাংশ মানুষই এখন মানসিক রোগের শিকার। এর মধ্যে আবার ১০ শতাংশই অবসাদ, উদ্বেগ কিংবা নেশাসক্তি জনিত মনোবিকারের শিকার। অথচ এই বিশাল সংখ্যার মানুষের যথাযথ চিকিৎসার জন্য বিশেষজ্ঞের সংখ্যা বড়জোর ৪০০০। শুধু তাই নয়, মনের অসুখের চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা আর তার ব্যবস্থার মধ্যে ফারাকের মাত্রাটাও বিস্তর। মানে,দেশে যত মানুষের মানসিক ভারসাম্যহীনতার জন্য চিকিৎসা জরুরি,আদতে তার ৬০ শতাংশের ভাগ্যেই জোটে না নিয়মিত চিকিৎসার সুযোগ। আত্মহত্যার প্রবণতার তথ্যটাও কম উদ্বেগজনক নয়। দেশের প্রায় ১ শতাংশ মানুষের মধ্যেই এই ঝুঁকিটা রয়েছে বেশ বিপজ্জনক মাত্রায়। কিন্তু সব থেকে অবাক কাণ্ডটা হলো,একটানা প্রায় এক বছর অসুস্থতার পরেও চিকিৎসাই শুরু হয় না প্রায় ৮০ শতাংশ মানসিক রোগীর।

অবশেষে ঘুম ভেঙেছে

তবুও মন্দের ভালো, লজ্জা আর সমস্যাটা আরও গভীরে পৌঁছনোর আগেই শেষ পর্যন্ত ঘুম ভেঙেছে কেন্দ্রের আইনপ্রণেতাদের। সংসদে পাশ হওয়া মানসিক স্বাস্থ্য বিলে মানসিক রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা পাওয়ার অধিকারকে দেওয়া হয়েছে আইনগত স্বীকৃতি। এই আইনের দৌলতে মানসিক ভাবে অসুস্থ মানুষও সমাজের আর পাঁচটা সুস্থ মানুষের মতোই স্বাভাবিক জীবন যাপন করার অধিকার পাবেন। শুধু তাই নয়, আইনের চোখে আত্মহত্যা আর দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে পরিগণিত হবে না। আত্মহত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে এক বছর কারাদণ্ড ভোগের সম্ভাবনা আর কিন্তু মান্যতা পাবে না আইনের চোখে।

কুন্ঠা নয়, স্বাধীনতা

এটা নিশ্চয়ই আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না যে বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন কারণে নানা রূপে দেখা দিতে পারে মনের বিকার। কিন্তু তার মানেই কিন্তু পাগল হয়ে যাওয়া নয়। কারও মধ্যে মানসিক সমস্যা দেখা দেওয়া মানেই তিনি পাগল, এই ধারণা শুধু ভ্রান্ত নয়, অমানবিকও। অশিক্ষার বহিঃপ্রকাশ। সমাজের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকরও বটে। কাউকে পাগল বলে প্রকাশ্যে হেয় করে যিনি আনন্দ পেতে চাইছেন বা স্বার্থসিদ্ধি করতে চাইছেন, তিনি নিজেই হয়তো নিজের অজান্তে মানসিক রোগের শিকার হয়ে বসে আছেন দীর্ঘদিন ধরে। আসলে এই ধরনের আপত্তিকর মন্তব্য মানসিক সমস্যায় জর্জরিত মানুষের আত্মবিশ্বাসকে শুধু আঘাত করে না, তাঁর সুস্থ জীবনে ফেরার ইচ্ছেটাকেই নষ্ট করে দেয়। অথচ চিকিৎসক বা মনোবিদের দ্বারস্থ হতে তিনি বা তাঁর পরিজনেরা কুন্ঠাবোধ করেন সামাজিক লজ্জায়। কিন্তু কীসের লজ্জা? এটা কোনও অপরাধও নয়। ঠিক এই কুন্ঠা আর লজ্জা কাটিয়ে ওঠারই পথ দেখিয়েছে মানসিক স্বাস্থ্যের নয়া আইন। এই আইনে স্পষ্টতই আশ্বস্ত করা হয়েছে, সরকারি খরচে বা ব্যবস্থাপনায় মানসিক চিকিৎসার সুযোগ গ্রহণের অধিকার থাকবে প্রতিটি মানুষের। জাতি-ধর্ম-সংস্কৃতি-লিঙ্গ, সামাজিক পরিচিতি বা রাজনৈতিক বিশ্বাস যাই হোক না কেন প্রতিটি নাগরিকের জন্যই নামমাত্র খরচে মিলবে উচ্চমানের পরিষেবা। যা অবশ্যই মানসিক রোগী, পরিচর্যাকারী এবং পরিবারের সদস্যদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। রোগীদের আশ্রয় এবং বাসস্থানের ব্যবস্থার ওপরেও জোর দেওয়া হয়েছে সংশোধিত স্বাস্থ্যনীতিতে। সব থেকে বড় কথা, নতুন আইন অনুযায়ী একজন মানসিক রোগীর পূর্ণ অধিকার থাকবে নিজের চিকিৎসার ব্যাপারে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার। অর্থাৎ কোন ধরনের চিকিৎসা পরিষেবা নিতে তিনি ইচ্ছুক এবং ঐ সময়ে কে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন,এই প্রতিটি বিষয়েই আগাম নির্দেশ দেওয়ার অধিকার থাকবে রোগীর নিজের। তবে তা অবশ্যই কোনও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা অথবা মেন্টাল হেলথ বোর্ডের অনুমতি সাপেক্ষ। কিন্তু জোর করে চাপিয়ে দেওয়া চলবে না কিছুই। ইলেক্ট্রো কনভালসিভ থেরাপির ক্ষেত্রেও বদলানো হয়েছে নিয়ম কানুন। মানে পুরো ব্যাপারটাই হতে হবে সমানুভুতির দৃষ্টিতে।

কড়া নজরদারি

লক্ষণীয়, মানসিক রোগের চিকিৎসা প্রত্যশিত পথে এগোচ্ছে কী না, তা দেখার জন্যও কেন্দ্রীয় ও রাজ্যস্তরে বেশ আঁটোসাঁটো ব্যবস্থা চালু করার পক্ষে মত দেওয়া হয়েছে নয়া স্বাস্থ্যনীতিতে, যার প্রতিফলন পড়ছে মানসিক স্বাস্থ্য আইনেও। ডাক্তার, মনোরোগ বিষয়ক পেশাদার এবং সমস্ত মানসিক স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরির পাশাপাশি পরিষেবার মানোন্নয়নের ব্যাপারেও বিশেষ নজর রাখার কথা বলা হয়েছে। কোনও জায়গা থেকে কোনও রকমের অভিযোগ এলে তা খতিয়ে দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এবং সরকারি স্তরে প্রয়োজনীয় পরামর্শের ওপরে বিশেষ আলোকপাত করা হয়েছে।

এবং আত্মহত্যা

কিন্তু নয়া আইনে সবথেকে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়টা হলো, আত্মহত্যা নিয়ে সরকারের পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গি। বছর তিনেক আগেই সিদ্ধান্ত হয়েছিল, আত্মহত্যাকে আর দণ্ডনীয় অপরাধ বলে গণ্য করা হবে না। একজন মানুষ যিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন বা করছেন তাঁকে এবার থেকে মানসিক রোগী হিসেবেই বিবেচনা করা হবে। আত্মহত্যার চেষ্টা করে কেউ ব্যর্থ হলে এবার থেকে তাঁকে আর ভারতীয় দণ্ডবিধি অনু্যায়ী এক বছর জেল খাটতে হবে না।

অবসাদ আর ভালোবাসা

এই প্রসঙ্গেই জেনে নেওয়া যাক দু’টো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। প্রথমটা হলো, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব অনুযায়ী সারা পৃথিবীতে এখন অবসাদের শিকার প্রায় তিন কোটি মানুষ। আর এই ধরণের গভীর মনের অসুখের ফলে পৃথিবীর সবকটা দেশ মিলিয়ে বছরে ক্ষতির অঙ্কটা প্রায় ৬৫ লক্ষ কোটি টাকা। এর মধ্যে অবশ্যই ধরা হয়েছে চিকিৎসা এবং আনুষঙ্গিক খরচ। মনে রাখা দরকার এই মারাত্মক অবসাদ বেশ বড়োসড়ো থাবা বসিয়েছে আমাদের দেশেও। দ্বিতীয় তথ্যটাও কিন্তু মানুষের মনকে নাড়া দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। সমীক্ষা রিপোর্ট বলছে, ভারতে গত কয়েক বছরে যত মানুষ সন্ত্রাসের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন, তার ছয় গুণ মানুষ মারা গেছেন প্রণয়ঘটিত কারণে। কে না জানে বেশির ভাগ আত্মহত্যার নেপথ্য কারণই হয় অবসাদ, না হয় প্রণয়। মানে ব্যর্থ প্রেম বা বাসনা। কখনও হয়তো দু’টোই।

বিশেষজ্ঞদের চোখে

এই আত্মহত্যাকে ঘিরে সরকারের পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেই বিশেষ তাৎপর্য খুঁজতে চেয়েছেন বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. অমরনাথ মল্লিক এবং মনোবিদ ডা. অমিত চক্রবর্তী। দু’জনেরই বক্তব্য, এতোদিন যাঁরা আত্মহত্যা করতে গিয়ে ব্যর্থ হতেন তাঁদের অনেককেই হাসপাতাল কিংবা নার্সিংহোমে নিয়ে গিয়ে যথাযথ শারীরিক বা মানসিক চিকিৎসা করাতে ইতস্তত করতেন প্রিয়জনেরা। পুলিশের ভয়ে,আইনগত জটিলতার ভয়ে কিংবা লোকলজ্জায়। নতুন আইন কিন্তু সেই কুন্ঠা, লজ্জা আর ভয় থেকে মুক্তির পথ দেখালো। ডা. মল্লিকের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছরে পৃথিবীতে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন প্রায় ৯ লক্ষ মানুষ। ভারতে এই সংখ্যাটা প্রায় ১ লক্ষ ৬০ হাজার। আবার মহিলাদের আত্মহত্যার সংখ্যার বিচারে শীর্ষস্থানে রয়েছে ভারতই। বেশিরভাগ আত্মহত্যার নেপথ্যেই কাজ করছে ডিপ্রেশন, বাইপোলার মুড ডিসঅর্ডার কিংবা স্কিজোফ্রেনিয়ার মতো মনের অসুখ। এই কারণেই আত্মহত্যা যাঁরা করতে যান তাঁদের মনের অবস্থাটা খুবই সমানুভূতির সঙ্গে বিচার করা উচিত বলে মনে করেন ডা. মল্লিক। এই ভাবনা থেকেই নতুন আইনকে স্বাগত জানিয়েছেন তিনি। কিন্তু সেই সঙ্গে এটাও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে রাজ্য সরকারও কিন্তু গত কয়েক বছরে মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে। শহরের সরকারি হাসপাতাগুলোতে তো বটেই, জেলা-মহকুমা এমনকী ব্লক স্তরের হাসপাতালগুলোতেও এখন মানসিক রোগের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

অন্যদিকে মনোবিদ ডা. অমিত চক্রবর্তীর অনুভূতি, মানুষ উদ্বেগ আর অবসাদের গভীরে চলে গেলেই আত্মহত্যার কথা ভাবেন। একটা অসহায় মানসিকতা কাজ করে এর পেছনে। কিন্তু একজন আত্মহত্যা করতে ব্যর্থ হলে তাঁকে এক বছর জেল খাটতে হবে- এ কেমন কথা? পৃথিবীর ক-টা সভ্য দেশে এমন আইন আছে? তাই এই আইনের পরিবর্তন অবশ্যই প্রয়োজন ছিল। পাশাপাশি মানসিক ভাবে অসুস্থ মানুষকে চিকিৎসার মধ্যে দিয়ে সুস্থ সমাজজীবনের অঙ্গ করে তোলার প্রয়াসটাও অত্যন্ত জরুরি। তাঁর যুক্তি, শাস্তি দিয়ে এই গুরুতর সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। মনের গভীরে ঢুকে আসল সমস্যাটা খুঁজে বের করে তা সমাধানের ব্যবস্থা করতে হবে।

চাই গণজাগরণ

আসলে শুধু আইনই যথেষ্ট নয়, আত্মহত্যা প্রতিরোধে গণচেতনার উন্মেষও জরুরি। জানতে হবে লক্ষণগুলো। সতর্ক হতে হবে আগে থেকেই। দেখা যায় অনেক সময়ই আত্মহত্যা প্রবণতার আগাম ইঙ্গিত পাওয়া যায় অনেকের কথায়, আচরণে। তাঁরা বারবার মৃত্যু নিয়ে আলোচনা করেন,জীবন সম্পর্কে বিতৃষ্ণার কথা বলেন, আত্মহত্যার ইচ্ছে প্রকাশ করেন। একবার আত্মহত্যা করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে বারবার সেই চেষ্টা করতে পারেন। নেপথ্যে থাকতে পারে ব্যর্থতা, মানসিক আঘাত, আশঙ্কা, লোকলজ্জা, প্রিয়জন বিয়োগ, একাকীত্ব, পারিবারিক অশান্তি, সম্পর্কছেদ, আর্থিক সঙ্কট, দীর্ঘ রোগভোগ অথবা নিছকই ক্ষণিকের অসংযত আবেগের মতো অজস্র কারণ, ঘটনা।

জেনে রাখলে মন্দ কী?

তা হলে উপায়? প্রথম কাজ, আত্মহত্যার সাম্ভাব্য উপকরণ, মানে যে সব জিনিস আত্মহত্যায় মদত জোগায় সেগুলোকে নাগালের বাইরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া। আত্মহত্যাপ্রবণ মানুষের গতিবিধির ওপরে সারাক্ষণ নজর রাখা,মানে যাকে বলে চোখে চোখে রাখা।সঙ্কটে দোষারোপ না করে তাঁকে মানসিক সমর্থন জোগানো এবং অবশ্যই জীবন সম্পর্কে আশার আলো দেখানোটাও দরকার। অনুভূতি জাগানো দরকার, মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পন নয়। আত্মহত্যার পথ থেকে ফিরে এসেও বসা যায় সাফল্যের সিংহাসনে। অস্বস্তিকর আলোচনা, প্রসঙ্গ প্রাথমিকভাবে এড়িয়ে গিয়ে পরে বুঝিয়ে বলা দরকার কঠিন বাস্তবটাকে। উপায় বাতলানো দরকার ঘুরে দাঁড়াবার। এছাড়া সিনেমা আর গান,পছন্দমতো জায়গা, লোকজন, আড্ডা, খাওয়া দাওয়া –এ সবই অবসাদ কাটিয়ে ওঠার পক্ষে অনবদ্য। ফিরিয়ে আনে বাঁচার ইচ্ছেটাকে, কেটে যায় নেতিবাচক চিন্তাধারা। এবং সেই সঙ্গে অবশ্যই দ্বারস্থ হতে হবে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা মনোবিদের। কারণ, কাউন্সেলিং, কগনিটিভ বিহ্যাভিয়ার থেরাপি, ইন্টার পার্সোনাল থেরাপি এবং সাপোর্টিভ থেরাপি বা রেশনাল ইমোটিভ থেরাপি কিন্তু হতাশা আর অবসাদ কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে খুবই ফলপ্রসূ। জীবন সম্পর্কে ইতিবাচক ভাবনার সুযোগ এনে দেয় এই ধরনের। চিকিৎসা পদ্ধতি। গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডের অনেকেই কিন্তু এভাবেই অবসাদের খাদ থেকে পৌঁছে গিয়েছেন সাফল্যের শিখরে। সেই জন্যই আত্মহত্যা প্রতিরোধের এই চেতনাটাকেই ছড়িয়ে দিতে হবে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। তা না হলে আত্মহত্যাকে শুধুমাত্র ভারতীয় দণ্ডবিধির আওতার বাইরে নিয়ে গিয়ে লাভটা কী?

চাই আন্তরিকতা

সত্যিকথা বলতে কী, দেশে মানসিক স্বাস্থ্য উদ্ধারের ক্ষেত্রে বাস্তব এবং চাহিদার মধ্যে ফারাকটা কিন্তু বিস্তর। সময়টাও হাতে অল্প। তাই শুধু আইন আনাটাই যথেষ্ট নয়, এই দুরত্বটা মুছতে আমরা আদৌ কতটা আন্তরিক সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*