বারবার হাত ধোয়ার ভবিষ্যত কী !

সৌম্য সিংহ

প্রশ্নটা মনে আসা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে দু-টো ব্যাপার কিন্তু মোটেই এক নয়। একটা হলো মৃত্যুর হাতছানি দেওয়া করোনা ভাইরাসের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সম্পূর্ণ বিজ্ঞানসম্মত প্রয়াস। আর একটা হলো বাতিক তথা শূচিবায়ুগ্রস্ততা নামের মানসিক অসঙ্গতি। যাকে বলা হয় Obsessive Compulsive Disorder বা OCD. আলোচনার বিষয়টা আসলে ঘনঘন হাত ধোয়া। বিশ্বের ত্রাস নোভেল করোনার আক্রমণ প্রতিহত করতে অত্যন্ত জরুরি হলো খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে অন্তত ১৫/২০ সেকেন্ড ধরে সাবান দিয়ে ভালো করে হাত ধোয়া। সাবানের বদলে সাময়িকভাবে কাজে লাগতে পারে আসল স্যানিটাইজারও। বাইরে থেকে ফিরলে তো কোনও কথাই নেই, ঘরবন্দি থাকলেও এই বিষয়টা মেনে চলতেই হবে। এর মধ্যে কোনও কিন্তু নেই। এখন সমস্যাটা হচ্ছে, OCD-র অন্যতম প্রাথমিক বহিঃপ্রকাশও কিন্তু এই ঘনঘন হাত ধোয়ার বাতিক। ব্যাপারটা যে আদৌ ঠিক হচ্ছে না তা বুঝেও এই মানসিক বিকারে আক্রান্ত মানুষ কেমন যেন অসহায়ভাবে আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হন অর্থহীন আচরণের কাছে। বারবার  হাত ধুয়েও শান্তি আসে না মনে। এখন প্রশ্নটা হলো, করোনার সংক্রমণ রুখতে অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত এই হাত ধোয়ার ব্যাপারটা ভবিষ্যতে OCD বা শূচিবায়ুগ্রস্ততার রূপ নেবে না তো? উত্তরটা শুনে নিন ইন্সটিটিউট অফ সাইকিয়াট্রির অধিকর্তা বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. প্রদীপ কুমার সাহার মুখেই।

প্রথমেই জানতে হবে এই OCD ব্যাপারটা ঠিক কী। আসলে শুরুতেই একটা  ভাবনা আসে মাথায়। এই ভাবনাটা নিজেরই ভাবনা। কিন্তু দেখা যায় নিজের  ইচ্ছের বিরুদ্ধেই তা বারবার ঘুরে ঘুরে আসছে মাথায়। যা নিজেকেই বিরক্ত করছে, যন্ত্রণা দিচ্ছে, রীতিমতো অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অথচ যাঁর এটা হচ্ছে তিনি নিজেও জানেন যে ভাবনাটা সঠিক নয়। অযৌক্তিক একটা ভাবনা। বারবার ঘুরেফিরে আসছে। ভাবনাটাকে আটকানোর চেষ্টা করেও তা সম্ভব হচ্ছে না কিছুতেই। গোটা ইগো-সিস্টেমকে আঘাত করছে এই ঘটনা। তৃপ্তি দিচ্ছে না,  আনন্দ দিচ্ছে না। কারও হয়তো মাথায় ঢুকলো যে তাঁর হাতে নোংরা লেগে গেছে বা জীবাণু লেগে গেছে। এবার তিনি তা পরিষ্কার করতে ভালোভাবে হাত ধুয়ে  এলেন। মিনিট পাঁচেক পরে তাঁর হয়তো আবার মনে হলো যে হাত এখনও জীবাণুমুক্ত হয়নি। অগত্যা আবার খুব ভালো করে হাত ধুয়ে তিনি শান্তিতে এসে বসলেন। কিন্তু মিনিট দশেক পরে আবার হয়তো একই চিন্তা ঘুরপাক খেতে শুরু করলো। মনে হলো, হাত এখনও ঠিক জীবাণুমুক্ত হয়নি। নোংরায় গা ঘিনঘিন করছে। অতএব, ১৫ মিনিট পরে আবার হাত ধুতে চলো। এই যে অর্থহীন চিন্তা আর অর্থহীন কাজের বাধ্যতামূলক পুনরাবৃত্তি এটাই Obsessive Compulsive Disorder. এটা মস্তিষ্কের কডেট নিউক্লিয়াসের (Caudate Nucleus) রোগ। এটা কিছুটা বংশগত। বাবার সম্পর্কে কারও কিংবা মায়ের সম্পর্কে অর্থাৎ মামার বাড়ির দিকে কারও কোনওদিন এই রোগ থাকলে বংশগতির ধারায় তা প্রবাহিত হওয়ার একটা সম্ভাবনা থেকে যায়। এছাড়া শৈশবে অভিভাবকদের অতিরিক্ত শাসন, নিজেদের অতিরিক্ত আকাঙ্খা সন্তানের ওপরে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া—যাকে বলে faulty parenting, ভবিষ্যতে আমন্ত্রণ  জানাতে পারে এই রোগকে। আলোড়ন তোলা কোনও বিশেষ ঘটনা, অবদমিত চাপ, উৎকন্ঠা বা দ্বন্দ্ব থেকেও আসতে পারে মনের এই অসঙ্গতি। আরও একটা ব্যাপার, ছোটবেলায় যৌন নির্যাতনের শিকার হলেও কিন্তু এই রোগের একটা  সম্ভাবনা থেকে যায় ভবিষ্যতে। নেপথ্যে থাকে ট্রমা।

কিন্তু COVID 19 এর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা সম্পূর্ণ আলাদা। এর কোনও ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি এখনও। একে কেন্দ্র করে গোটা বিশ্বের মানুষের মনে ভয় আর উৎকন্ঠা। এক্ষেত্রে বারবার হাত ধোয়ার ব্যাপারটা আসছে একটা অদৃশ্য অজানা ভাইরাসকে ঘিরে ভয়,উৎকন্ঠা এবং এর বিরুদ্ধে একটা যুদ্ধের মানসিকতা থেকে।  এই ভয়,উদ্বেগ আর আবেগ নিয়ন্ত্রিত করে মস্তিষ্কের Amygdala এবং Hippocampus। কিন্তু এই ভয় বা উদ্বেগ কোনও কারণে যদি হতাশা বা অবসাদে পরিবর্তিত হয় তা হলে কিন্তু বিষয়টা Basal ganglia-র নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ফলে এই হাত ধোয়াটা একটা অভ্যাসে পরিণত হতে পারে কারও কারও ক্ষেত্রে। তবে যদি কারও জিনে সুপ্ত অবস্থায় থাকে OCD, বেশ কিছুদিন এভাবে হাত ধুতে ধুতে তা কিন্তু মাথাচাড়া দিতেই পারে। কিন্তু সবার ক্ষেত্রে মোটেই নয়।

তাই সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে বারবার হাত ধোয়ার প্রয়োজনীয়তা থেকে শূচিবায়ুগ্রস্ততা বা বাতিকের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সম্ভাবনা খুবই কম।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*