উৎপল দত্ত : ‘ইশতেহারের নাটক নাটকের ইশতেহার’

সুদেব সিংহ

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপকদের সঙ্গে বসেছিলেন উৎপল দত্ত। সেটা ১৯৭২ সাল। এই আলোচনায় সকলকে আশ্চর্য করে উৎপল দত্ত বলেছিলেন, ম্যাক্সিম গোর্কি মোটেও শ্রমিক শ্রেণির নাট্যকার নন। মার্কসবাদ এবং লেনিনবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে গোর্কির নাটকে শ্রমিক শ্রেণির কথা ফুটে ওঠে না। বিখ্যাত নাটক লোয়ার ডেপথস বা নিচের মহল, যে নাটক অবলম্বনে ফিল্ম নির্মাণ করেছেন জঁ রেনোয়া কিংবা আকিরা কুরোসাওয়ার মতো চিত্রপরিচালকরাও, সেই নাটক আসলে লুম্পেন প্রোলেতারিয়েতের কথা বলে। শ্রমিকশ্রেণি কোথায় এখানে! এই নাটকে এসেছে চোর, ভিখারি, ডাকাত, গুন্ডা, সমাজবিরোধী- এদের কথা। এদের নিয়ে গড়ে উঠেছে একটি বিপজ্জনক শ্রেণি। ম্যাক্সিম গোর্কির মা উপন্যাসটি বরং শ্রমজীবী মানুষের কথা বলতে পারে মনে হয়েছিল উৎপল দত্তের।

প্রকৃতপক্ষে সনাতন মার্কসবাদী-লেনিনবাদী ধারণায় সমাজ বিশ্লেষণ করেছেন অসামান্য প্রতিভাধর নাট্যকার-নির্দেশক-অভিনেতা উৎপল দত্ত। এই কথা মোটের উপর সকলেই মানবেন যে আধুনিক নাটকের পরিসর গড়ে উঠেছে বার্টোল্ট ব্রেখট্ এবং স্তানিস্লাভস্কির প্রভাবে। স্তানিস্লাভস্কির যে মঞ্চমায়ার ধারণা, তা মূলত সাধারণ রঙ্গালয় এবং পরবর্তীকালের থিয়েটারকে প্রভাবিত করেছে। হেনরিক ইবসেন এবং আন্তন চেখভ, এই দুই নাট্যকারের বাস্তববাদী নাটক আধুনিক মঞ্চকে নানাদিক থেকে প্রভাবিত করেছে। ধরা যাক উৎপল দত্তের অঙ্গার নাটকটির কথা। যাঁরা এই নাটক দেখেছেন তাঁরা বলেন, তাপস সেনের আশ্চর্য আলোকসম্পাতের প্রভাবে প্রায় ম্যাজিক ঘটেছিল। অঙ্গার নাটকে ছিল খনি শ্রমিকদের জলমগ্ন হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ার দৃশ্য। দর্শকদের মনে হতো তাঁরা নিজেরাই জলে ডুবে যাচ্ছেন। এতটাই ছিল অঙ্গার নাটকের অভিঘাত। ছিল মঞ্চ মায়ার আশ্চর্য বিস্তার। অন্যদিকে রীতিমতো স্পেক্ট্যাকেল ঘটত। বাস্তববাদী ধরণেই উৎপল দত্ত যোগ করেছিলেন শ্রমজীবী মানুষের অকল্পনীয় দুর্দশার কথা। অঙ্গার কিংবা কল্লোল, এসব তো আজ ইতিহাস অথবা কিংবদন্তি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই উৎপল দত্ত হয়ে উঠলেন সময়কে ছাপিয়ে যাওয়া এক শিল্পী। যিনি শেক্সপিয়ার চর্চার মধ্যে দিয়ে তাঁর নাট্যস্বপ্নকল্প শুরু করেছিলেন, তিনি এসে পৌঁছলেন পথনাটিকায়। পৌঁছে গেলেন গ্রাম-গ্রামান্তরের যাত্রাদলের সঙ্গে। লিট্‌ল থিয়েটার গ্রুপ, গণনাট্য সংঘ কিংবা পিএলটি, সবসময়ই উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের হাত ধরেছিলেন উৎপল দত্ত। করেছেন ম্যাকবেথ, জুলিয়াস সিজার, টুয়েলভ্‌থ নাইট, মাইকেলের বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ, গোর্কির নীচের মহল, জ্যোতিরিন্দ্রনাথের অলীকবাবু এবং উৎপলের নিজের লেখা ছায়ানট ঘুম নেই, রাইফেল, ফেরারী ফৌজ, মেঘ, প্রফেসার মামলক, কল্লোল, মা, নয়া ইতিহাস, তীর, মানুষের অধিকারে, ক্রুশবিদ্ধ কিউবা, সূর্য শিকার, টিনের তলোয়ার, টোটো, মহাবিদ্রোহ প্রভৃতি চিরস্মরণীয় নাটক।

জনপ্রিয় সিনেমায় তিনি তোলপাড় করেছেন। কী বাংলা কী হিন্দি, সর্বত্র তাঁর সমান বিচরণ। মূলধারার হিন্দি ছবিতে গোলমাল, আনাড়ি, অমানুষ, নরম গরম, বরসাত কি এক রাত, এইসব বাম্পার হিট হিন্দি ছবি। অন্য দিকে বাংলা ছবিতে যুক্তি তক্কো গপ্পো, জন অরণ্য, মোহনবাগানের মেয়ে, জয় বাবা ফেলুনাথ, চৌরঙ্গী, বিবাহ বিভ্রাট, কুহেলি, মাইকেল মধুসূদন প্রভৃতি ছবি। একই সঙ্গে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার সুনিশ্চিত করতে নাট্যমঞ্চকে তিনি ব্যবহার করেছেন আর নাটকের জন্য সব রকম ঝুঁকি নিয়েছেন। এমনভাবে তিনি নাটক রচনা করতেন যে নাটকটি সমকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে মিলে যেত। অর্থাৎ অব্যবহিত চারপাশকে দর্শক সহজেই চিনে নিতে পারতেন অঙ্গার, কল্লোল এসব নাটকে। বাস্তবের সম্প্রসারণ হয়েছে স্পেক্ট্যাকেল কিংবা মঞ্চসজ্জার মধ্যে দিয়ে। কল্লোল নাটকে মঞ্চে খাইবার জাহাজের ডেক আর অডিটোরিয়াম মিলে মিশে যেত। সেই সঙ্গে ছিল শহর কাঁপানো কল্লোলের একের পর এক গান। এসব মিলেই উৎপল দত্ত— এক বিস্ফোরক নাম।

উৎপল দত্তের জন্ম ১৯২৯ সালে ২৯ মার্চ অধুনা বাংলাদেশের বরিশাল জেলায়। তাঁদের আদি বাসস্থান ছিল পূর্ববঙ্গের কুমিল্লায়। কীর্তনখোলা নদীর ধারে বরিশালে তাঁর জন্মস্থান। বাবা গিরিজারঞ্জন দত্ত এবং মা শৈলবালা রায়। শৈলশহর শিলংয়ে সেন্ট এডমন্ড স্কুলে শিক্ষাজীবন শুরু হয়। পরে সেন্ট লরেন্স স্কুল এবং সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে পড়াশোনা করেন। ধ্রুপদী, পাশ্চাত্য সংগীতচর্চার পরিবেশ ছিল বাড়িতে।

চল্লিশের দশক কলকাতায় আগুনঝরা এক সময়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ৪২-এর আন্দোলন, ৪৩-এর মন্বন্তর, এসবের মধ্যেই গণনাট্য সংঘের জয়যাত্রা। উৎপল বলেছেন, এই প্রথম ক্রাউড সিন আশ্চর্য সফলভাবে দেখা গেল বাংলার নাট্যমঞ্চে। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়ার সময় শেক্সপিয়ারের নাটকে হাতেখড়ি। এর পরই তিনি যোগ দিয়েছেন পৃথিবীবিখ্যাত দল শেক্সপিয়ারওয়ালায়। এই দলে জিয়োফ্রে কেন্ডালের তত্ত্বাবধানে শেক্সপিয়ার প্রযোজনায় শিক্ষালাভ করেন। ১৯৪৯-৫০ সালে লিট্‌ল থিয়েটার গ্রুপ বা এলটিজির সূচনা। ক্রমশ এগিয়েছেন উৎপল, বাংলার নাট্যজগতে চিরস্মরণীয় এক নক্ষত্র হয়ে উঠেছেন। সমাজবিদ্যা, ইতিহাস, অর্থনীতি, এইসব বিষয়ে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। শেক্সপিয়ার এবং বার্টোল্ট ব্রেখ্‌ট বিষয়ে তিনি একজন বিশ্ববিখ্যাত বিশেষজ্ঞ।

শেষে কবি অমিতাভ দাশগুপ্তকে স্মরণ করি— উৎপল নাটক লেখেন ইশতেহারের মতো এবং তাঁর ইশতেহার হয়ে ওঠে নাট্যকলা।

বাংলা থিয়াটারের অন্যতম প্রাণ পুরুষ উৎপল দত্ত। আজ তাঁর মৃত্যুদিন। বাংলার মা-মাটি-মানুষ ওয়েব পোর্টালের পক্ষ থেকে তাঁকে জানাই শ্রদ্ধা ও প্রণাম।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*