তৃণমূল না বিজেপি, কাকে হারানো প্রায়োরিটি কংগ্রেসের?

কল্যাণ সেনগুপ্ত

উপরোক্ত প্রশ্নের উত্তরে কংগ্রেস হয়তো বলবে, বাংলায় তৃণমূল এবং দিল্লীতে বা জাতীয় ক্ষেত্রে বিজেপি। অর্থাৎ বিজেপিকে নিয়ে কংগ্রেস খুব বেশি উদ্বিগ্ন নয়। যেমন অতীতে বাংলায় সিপিএম শাসন নিয়ে কংগ্রেস আদৌ বিশেষ উদ্বিগ্ন ছিল না এবং সে কারণেই মমতাকে কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল দল গঠন করতে হয়। ৩৪ বছরের সিপিএম শাসনের অবসান ঘটে মমতার নেতৃত্বাধীন তৃণমূল দলের মরিয়া লড়াইয়ের ফলে। নইলে আজও হয়তো সিপিএমই শাসন করতো বাংলা, যদি প্রধান বিরোধী পক্ষ থাকতো জমিদার মনোবৃত্তির সুখী কংগ্রেস। নইলে যে কাজটা মমতা করতে পারলো, তা কেন কংগ্রেসের বাঘা বাঘা জনপ্রিয়, অভিজ্ঞ ও প্রভূত বুদ্ধিমান নেতারা দীর্ঘসময় ধরে করতে পারলেন না? আছে এর কোন সদুত্তর কংগ্রেস নেতাদের কাছে? নেই। আজ জাতীয় ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে, দেশকে বিজেপির চূড়ান্ত দুঃশাসনের হাত থেকে উদ্ধার করার কোন তাগিদ বা আগ্রহ, কিছুই যেন নেই। ভাবা যায়না, কোন প্রধান বিরোধী দল এতখানি উদাসীন থেকে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ করতে পারে! ফলে যতদিন যাচ্ছে শাসক বিজেপি নিশ্চিন্ত চিত্তে ক্রমশঃ আরও বেশি বেশি করে তাদের দাঁত-নখ যেন বার করে চলেছে। কিন্তু কংগ্রেসের সেই নিয়ে বিশেষ দুশ্চিন্তা আছে বলে বোধই হচ্ছে না। তারা মশগুল দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্ব ও ভিন্ন স্বরকে স্তব্ধ করে দিতে। সেই সুযোগ নিয়ে অধীর চৌধুরীর মতো নীতিহীন, চরম সুবিধাবাদী নেতা দলের মধ্যে আরও বেশি করে প্রাধান্য আদায় করে নিচ্ছে।

দেশের এই চরম সংকটে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসকে যখন মোদী সরকারের সমস্ত ভুল ও অন্যায় পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বিজেপি বিরোধী সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে রাস্তায় নেমে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলায় উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন, তখন দেখা যাচ্ছে কংগ্রেস দল এক চূড়ান্ত দিশাহীন, ছন্নছাড়া পরিস্থিতির শিকার। দলের নেতৃত্বের মধ্যে কে যে নীতিনিষ্ঠ, সৎ ও আদর্শবাদী, দলের প্রকৃত শুভচিন্তক আর কে যে নিজের আখের গোছাতে বিজেপির সঙ্গে গোপনে যোগ রেখে তাদেরই স্বার্থসিদ্ধি করছে, বোঝা মুশকিল। সবাই জানে, বোঝে যে আঞ্চলিক দল সমূহকে বাদ দিয়ে কংগ্রেসের একার পক্ষে বিজেপিকে পরাস্ত করা কঠিন শুধু নয়, বলা যায় একপ্রকার অসম্ভব। কিন্তু তবু সে বিষয়ে কোন সৎ বা আন্তরিক প্রচেষ্ঠাই নেই। নেই কোন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা। শত্রু-মিত্র কোন আলাদা প্রভেদ বা বিচার নেই। মিত্রকে নিমেষে শত্রু বানিয়ে ফেলতে এতটুকু দ্বিধা নেই। এই দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রধান বিরোধী শক্তির ভূমিকা পালন করা যায় না, আর এই অপারগতার সুফল ভোগ করছে শাসক দল। সে জন্যই শাসক বিজেপি ও তার প্রধান মোদী আজ এতখানি বেপরোয়া হবার সাহস দেখাতে পারছে এবং তার কঠিন মূল্য চোকাতে হচ্ছে দেশের মানুষকে বিশেষত বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত গরিবদের। আর প্রধান বিরোধী দল বিবৃতি দিয়ে বা ট্যুইট করেই যথেষ্ট দায়িত্ব পালন করা হচ্ছে বলে মনে করছে।

এরাজ্যের আসন্ন নির্বাচন প্রসঙ্গে আসি। কংগ্রেস এখানে বামেদের সঙ্গে জোট বেঁধেছে তৃণমূলকে পরাজিত করতে। কিন্তু তৃণমূল হারলে জিতবে কে? অবশ্যই বিজেপি। কারণ বিজেপি আদা জল খেয়ে লেগেছে বাংলাকে দখল করতে এবং তৃণমূলকে উচিত শিক্ষা দিতে। আর বিজেপির এই খেলায় আশ্চর্যজনকভাবে পরোক্ষ সঙ্গী হচ্ছে বাম-কংগ্রেস জোট। এই জোটের যদি বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা থাকতো ভোটে জেতার, তাহলে এতকথার প্রয়োজনই ছিল না। কারণ তৃণমূলকে হারিয়ে এই জোট জিতলে ততটা রাজ্য বা দেশের সর্বনাশ হোত না যতটা বিজেপি জিতলে হবে। এই সময় বিজেপি বিরোধী প্রতিটি রাজনৈতিক দলের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত সর্বত্র বিজেপির পরাজয়কে নিশ্চিত করা এবং এই দলকে যতখানি সম্ভব দুর্বল করা। কিন্তু এরাজ্যের সিপিএম নেতারা বলে বেড়াচ্ছেন, তৃণমূলের শাসনে রাজ্যে গণতন্ত্র নেই, তাই সর্বাগ্রে তৃণমূলকে পরাজিত করে রাজ্যে গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে অতঃপর সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই চালাতে হবে। অর্থাৎ এখন সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বদলে তথাকথিত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই আগে চালাতে হবে। সিপিএম নেতারা এমনকি এটা বলতেও দ্বিধা করছেন না যে, এই নির্বাচনে শাসক তৃণমূলই মূল শত্রু, বিজেপিকে পরে দেখা যাবে। সিপিএমের এই বিজেপিকে পরোক্ষে তোল্লা দেবার রাজনীতির শরিক হচ্ছে কংগ্রেসও। কংগ্রেসেরতো জাতীয় রাজনীতিতে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তৃণমূলকে প্রয়োজন হবে। না কি ভাবছে, বাংলায় তৃণমূল হেরে দুর্বল হলে বাধ্য হবে আমাদের বশ্যতা শিকারে। কিন্তু এর ফলে যে দেশের শত্রু বিজেপি আরও অনেক বেশি শক্তিশালী হবে এবং তখন লড়াই প্রচন্ড কঠিন হয়ে পড়বে, সেটা বোধকরি ভাবছে না। কে ভাববে, ভাবার মতো সত্যিই কেউ আছে কি? থাকলেও তার কথা শুনবে কে, গুরুত্ব দেবে কে?

দেশব্যাপী কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে বিজেপির পরাজয়ে এবং সেটি একমাত্র সম্ভব বিজেপি বিরোধী সমস্ত রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিকে এক মঞ্চে এনে দেশজুড়ে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারলেই। তৃণমূলকে দূরে সরিয়ে রেখে, দুর্বল করে সেটা কি সম্ভব? কখনোই নয়। এ বিষয়ে সিপিএমের কথায় নাচলে কংগ্রেসের স্বার্থসিদ্ধি হবে কি? কেরলে কি সিপিএম কংগ্রেসের সাথে লড়বে না, ছেড়ে দেবে? আজ এই রাজ্যে কংগ্রেসের দুরবস্থার জন্য দায়ী কংগ্রেসের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারাই। অন্তকলহ ও তীব্র দ্বন্দ্বের কারণে দলের অনেক নেতা বা জনপ্রতিনিধি স্বীয় ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্যই কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে আসতে বাধ্য হয়েছে। রাজনীতির ইতিহাসে এমনটা কি নতুন? তৃণমূল ভিন্ন এদল ওদল কি আর হয় নি বা হচ্ছে না? দলের ভেতর গুরুত্ব হারালে বা অন্যদলে অধিক সুযোগ লাভের আশা দেখা দিলে, দল বদল হয়েই থাকে। সুতরাং দলবদলের জন্য শুধুমাত্র তৃণমূলই দায়ী, এমন দোষারোপ করা হয় স্রেফ নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে। এ প্রসঙ্গে ধরা যাক অধীর চৌধুরীর কথা। তিনি কিভাবে হটাৎ সবাইকে টপকে সংসদে বিরোধী নেতা নির্বাচিত হলেন! এর কারণটি প্রকাশ্যে উচ্চারিত না হলেও সবারই জানা যে, তাঁর বিজেপিতে যোগদান প্রায় পাকা হয়ে গেছিল এবং সেটা ঠেকাতেই তাঁকে তড়িঘড়ি বিরোধী নেতা বানানো হোল। বর্তমানে এই বিষয়টি নিয়েও দলের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। আর ‘১৯ এ তিনি কিভাবে তৃণমূল ছাড়া আর বাকি সব পক্ষকে ম্যানেজ করে নির্বাচনে জিতলেন! তাঁর বিরুদ্ধে সিপিএম প্রার্থীও দিল না বা আরএসপি প্রার্থীকে সমর্থন না করে সরাসরি অধীরের পক্ষে প্রচার করে নিশ্চিত করলো বাম ভোট যাতে অধীরের পক্ষেই যায়। আর বিজেপি সারা রাজ্যজুড়ে এত তেড়েফুঁড়ে লড়াই চালালেও একমাত্র অধীরের বিরুদ্ধেই একজন এলেবেলে প্রার্থী (যার একমাত্র পরিচয় তিনি দিলীপ ঘোষের বাড়িতে পুজোপাঠ করেন) দাঁড় করলেন, কোন বড় নেতা প্রচারেও গেলেন না এবং অধীর নির্বিঘ্নে জিতলেন। এহেন প্রবল মমতা বিদ্বেষী অধীর চৌধুরীকেই কংগ্রেস রাজ্য সভাপতির দায়িত্ব দিয়ে পাঠালেন মমতা বিরোধী সম্মিলিত গেম প্ল্যানে মদত দিতে। বিজেপি যে কোন মূল্যে ভোটে জিততে গো বলয় থেকে হাজারে হাজারে ক্যাডার এনে এরাজ্যে ঢোকাচ্ছে, কেন্দ্রের নির্বাচন কমিশনের অন্ধ-বোবা-কালা চরিত্রের বিষয়টি আমাদের অজানা নয়, এর উপর তাঁদের নিয়ন্ত্রণাধীন রাজ্যের পুলিশ প্রশাসন ও সঙ্গে বিশাল সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনীকে নিয়ে নির্বাচন কি সঠিকভাবে সম্পন্ন হবে না ভোট লুট হবে, সেই আশঙ্কায় রাজ্যের মানুষ প্রচন্ড দুশ্চিন্তাগ্রস্থ। এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে, এর ফলে তৃণমূল হারলে কি, বিজেপি বিরোধী লড়াই শক্তিশালী হবে না দুর্বল হবে?

দেশের মানুষ চায়, দেশের সর্বাধিক পুরোনো দল এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের ঐতিহ্যবাহী কংগ্রেস দল দেশের এই চরম সংকটকালে তার যথাযোগ্য ভূমিকা পালন করুক। বুঝুক যে, তৃণমূল নয় বিজেপিকে পরাজিত করাই তাদের প্রধান ও একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত। তৃণমূল সহ বিভিন্ন আঞ্চলিক দলকে সাথে না পেলে এই লড়াই কখনোই সফল হতে পারে না। মানুষ আরো চায়, কংগ্রেস নেতৃত্ব এই বাস্তব চিত্রটা বুঝুক এবং দলের অভ্যন্তরীণ ভুল বোঝাবুঝি দূর করে দলকে নির্দিষ্ট নীতির ভিত্তিতে সঠিকভাবে সংঘবদ্ধ করে এবং বিজেপি বিরোধী ব্যাপক মঞ্চ গড়ে রাস্তায় নেমে মোদি সরকারের সমস্ত ভুল ও অন্যায় অপরাধ কে চ্যালেঞ্জ জানাক, দেশকে রক্ষা করুক, মুক্তির দিশা দেখাক।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*