কালের নিয়ম হার মেনেছে জর্জ বিশ্বাসের গানের কাছে

সুদেব সিংহ

বছর খানেক আগে দেবব্রত বিশ্বাস স্মারক বক্তৃতা দিয়েছিলেন সংগীত গবেষক তথা  কর্ণাটকের অবসরপ্রাপ্ত মুখ্যসচিব অধীপ ভট্টাচার্য। কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার দফতরেও তিনি একসময় যুক্ত ছিলেন। সে সময় রেকর্ড বা ক্যাসেট বিক্রি নিয়ে গবেষণা শুরু করেছিলেন। অবসরের পর সেই গবেষণা শেষ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, আঞ্চলিক ভাষার রেকর্ড  বিক্রি সবসময়ই হিন্দি গানের রেকর্ডের চেয়ে কম হয়। এটা স্বাভাবিকও। কিন্তু ব্যতিক্রম ঘটিয়েছেন একজন বাঙালি গায়ক। তিনি দেবব্রত বিশ্বাস। একেক বছর মহঃ রফি, লতা মঙ্গেশকর, কিশোর কুমারদের রেকর্ড বিক্রিকে পেছনে ফেলে দেবব্রত বিশ্বাসের রবীন্দ্রসংগীতের ক্যাসেট  রেকর্ড সংখ্যক বিক্রি হয়েছে। নিন্দুকরা বলবেন, ও মা! তা আর হবে না, ওই যে বিশ্বভারতীর সাথে গণ্ডগোল।—এই বিতর্ককে পুঁজি করে আসলে জর্জ বিশ্বাস ব্যবসা বাড়িয়েছেন! দুঃখের বিষয় এটা নিয়েও অধীপ ভট্টাচার্য তথ্য-পরিসংখ্যা দিয়েছেন। ষাটের দশকের মাঝামাঝি দেবব্রত বিশ্বাস রবীন্দ্রসংগীতের রেকর্ড বিক্রিতে বোম্বাইয়ের শিল্পীদের বেশ কয়েক বছর পিছনে ফেলে দিয়েছে। ষাটের শেষের দিকে প্রথম বিতর্কের সূচনা। আজকে যখন আমাদের বীজমন্ত্র বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্ণী, তাই এই কথাগুলো মাথায় রাখা উচিত। আর আজকে বোম্বাইয়ে সাফল্য লাভ করে যারা এক হাজার রকম বাদ্যযন্ত্র এবং আরও কয়েক হাজার প্রযুক্তিগত কৌশল কাজে লাগিয়ে গান রেকর্ড করেন, তাঁদের সিডি বিক্রি দেবব্রত বিশ্বাসের একের চারও নয়। এগুলো কিন্তু একজন প্রাক্তন আমলার গবেষণায় উঠে এসেছে। এ ছাড়া রয়েছে গোটা পুব বাংলায় তাঁর রেকর্ড বিক্রি। তাঁর গান নিয়ে কয়েক হাজার বই সেখানে প্রকাশিত হয়েছে।

ঋত্বিককুমার ঘটকের মতো দেবব্রত বিশ্বাসের নাম শুনলেই যাঁরা পাগল পাগল আচরণ করেন, এমন কোনও বোকা মানুষ এসব তথ্য দিচ্ছেন না। অধীপবাবু আরও দেখিয়েছেন, হুগলির চাঁপাডাঙা, মহারাষ্ট্রের মাথেরান কিংবা আম্বালা এসব জায়গার বাঙালিরাও জর্জ বিশ্বাসের রেকর্ড কেনেন।

দেবব্রত বিশ্বাসের জন্ম ১৯১১ সালের ২২ আগস্ট। সকলেই জানেন, তিনি একেবারে কাঠ বাঙাল। ময়মনসিংহের কিশোরগঞ্জ মহকুমার মানুষ। তাঁর পিতামহ কালীকিশোর বিশ্বাস ব্রাহ্ম হয়েছিলেন। তাঁর বাবা দেবেন্দ্রনাথ বিশ্বাস একটু গোড়া ধরনেরই ব্রাহ্ম ছিলেন। মা অবলা বিশ্বাস খোলা মনের মানুষ। তাঁর কোলে বসে রবীন্দ্রনাথের গান শেখা। ১৯১১ সালের পঞ্চম জর্জ ভারত সফরে আসেন বলে ডাক নাম হয় জর্জ। খুব ছোটোবেলা থেকেই রবীন্দ্রনাথের গান শিখে বড়ো হয়েছেন। পরে পড়াশানা করতে কলকাতায় আসেন। হিন্দুস্থান বিমা কোম্পানিতে চাকরি করেছেন। লেখালেখি শুরু স্বাধীনতা পত্রিকায়। সলিল চৌধুরী, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র— এঁদের সঙ্গে জোট বেঁধে গণনাট্য আন্দোলনের মাঠে-ময়দানে গান গেয়েছেন। সে সময়ের আইপিটিএ-র অনুষ্ঠানে গণসংগীত গাওয়ার চল ছিল। জর্জ বিশ্বাস বললেন, ও মা, রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে কিছু হয় নাকি! কমিউনিস্ট পার্টির প্রকাশ্য সমাবেশে তিনি গেয়ে উঠেছেন, বসন্তে ফুল গাঁথলো আমার জয়ের মালা।

সবাই জানেন, ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের শতবর্ষ পালন শুরু হয়। এই ষাটের দশকে অসংখ্য অনুষ্ঠান করেছেন দেবব্রত বিশ্বাস। খুব দ্রুত জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছেছেন। একদিকে ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী, পুলিনবিহারী সেন, শৈলজারঞ্জন মজুমদার, সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর, কানাই সামন্ত— এই সব রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, ইনিই শ্রেষ্ঠ। আর রবীন্দ্রসদনে কাউন্টার খোলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে টিকিট শেষ হয়ে যাচ্ছে। অনুষ্ঠানে দর্শক রুচি নিয়ে বেশ কয়েকজন  মন্তব্য করতেন। একবার অনুষ্ঠানে দু-তিন জন দর্শক নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলেন। তিনি গান থামিয়ে গেয়ে ওঠেন, ‘সাধন কী মোর আসন নেবে হট্টগোলের কাঁধে!’ স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত নেহরু বলেছিলেন, একক অনুষ্ঠানে তাঁর গান শুনতে চান। দেবব্রত বিশ্বাসের সপাটে জবাব, আমি এখন অনুষ্ঠান পিছু ১০ হাজার নিই। পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীও দিল্লিতে তাঁর বহু অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকেছেন। জর্জ বিশ্বাস এক বাক্যে ধন্যবাদ দিয়ে কাজ সারতেন। ষাটের দশক থেকে তাঁর জনপ্রিয়তা বিপুল আকার ধারণ করে। ১৯৬৪ সালে বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ড দেবব্রত বিশ্বাসের ‘এসেছিলে তবু আসো নাই’, এবং ‘মেঘ বলেছে যাব, যাব’। এই গান দুটি নিয়ে আপত্তি জানায়। পরে আরেক কিংবদন্তি শিল্পী তথা মিউজিক বোর্ডের চেয়ারম্যান, রবীন্দ্র শিষ্য শান্তিদেব ঘোষের হস্তক্ষেপে সেবারের সমস্যা মেটে। ফের ১৯৬৯ সালে ‘পুষ্প দিয়ে মারো যারে’ এবং ‘তোমার শেষের গানে’— এই দুটো গান নিয়ে মিউজিক বোর্ড আপত্তি তোলে। দেবব্রত বিশ্বাস রেকর্ডিং বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর মূল প্রকাশক হিন্দুস্থান রেকর্ডসের মালিক চণ্ডীচরণ সাহা বাড়ি গিয়ে তাঁকে অনুরোধ জানান ফের রেকর্ড করতে। তখন কয়েকটি গান রেকর্ড করেছিলেন। কিন্তু ওই শেষ।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে তিনি ঢাকায় যান। লাখো মানুষের ঢল নেমেছিল দেবব্রত বিশ্বাসের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে। ঢাকা কার্যত অচল হয়ে গিয়েছিল। সব মুক্তিযোদ্ধারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে অনুরোধ করেন, দ্বিতীয়বার সংবর্ধনা অনুষ্ঠান করতে। কারণ, স্টেডিয়ামে জায়গা নেই। বাইরে কয়েক হাজার লোক দাঁড়িয়ে রয়েছেন।

১৯৭৮ সালে তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এসেছিলেন স্নেহাংশুকান্ত আচার্য চৌধুরীর অনুরোধে। পরে রবীন্দ্রসদনে একটি অনুষ্ঠানে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, উত্তমকুমার, সকলে মিলে তাঁকে সংবর্ধনা দেন। ১৯৮০ সালের ১৮ আগস্ট দেবব্রত বিশ্বাসের অকাল প্রয়াণ। সারা জীবন শ্বাসকষ্টের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন এই মানুষটি। নিজের সবচেয়ে কঠিন সমস্যাকে সামর্থ করে তুলেছিলেন তিনি। সে কথাই তাঁর প্রয়াণের পর লিখেছেন সত্যজিৎ রায়। বলেছেন, সংগীতের যে একান্ত সাধনা জর্জদা করে গেছেন, তার কোনও তুলনা হয় বলে আমি তো জানি না। রবীন্দ্রনাথের একটি গান জর্জদার গলায় যেমন খুলতো, তেমন অন্য কোনও গায়কের ক্ষেত্রে দেখিনি। নিজের সবচেয়ে কঠিন সমস্যাকে তিনি উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দিলেন। এটা উনিই পারেন।

একটা কথা বলার, কালের নিয়ম হার মেনেছে তাঁর গানের কাছে।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*