বুদ্ধি আর স্মৃতিশক্তির সমন্বয়টাই সাফল্যের আসল শর্ত

সৌম্য সিংহ

ছোটবেলা থেকেই কারও সঙ্গে তেমন মেলামেশা পছন্দ ছিল না লাল্টুদার। সব সময় শুধু পড়া আর পড়া। দিনে-রাতে ১৮ ঘন্টাই বইতে মুখ গুঁজে বসে থাকতো এই লাল্টুদা। কিন্তু পরীক্ষার রেজাল্ট বের হলেই মুখ ভার,কান্নাকাটি। প্রত্যেক বারেই কোনও রকমে পাশ। অন্যদিকে পাশের বাড়ির বুল্টিদির পড়ার ঘরে যাতায়াত ছিল খুবই কম। প্রায় সব সময়ই এ পাড়া, ও পাড়া সফরে ব্যস্ত থাকতে দেখা যেতো তাকে। সমাজ সেবায়। কিন্তু স্কুলের পরীক্ষা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স— সবেতেই এই অমায়িক বুল্টিদির পারফরম্যান্স রীতিমতো তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো। কারণটা কী? কোনও জাদুকাঠির ছোঁয়া? মোটেই না। তা হলে বুল্টিদির ‘আই কিউ’ কি লাল্টুদার থেকে অনেক বেশি? যদি তা হয়ও সেটাও কিন্তু বড় কথা নয়। সেটা আজকের দিনে আর তেমন গুরুত্বপূর্ণও নয়। আসলে বুল্টিদি আর লাল্টুদার মধ্যে মৌলিক পার্থক্যটা হলো,বুদ্ধি আর স্মৃতিশক্তির ব্যবহারের সঠিক কৌশলটা জানতো বুল্টিদি। তাই অল্প পড়াতেই বাজিমাত। কিন্তু লাল্টুদার বিশেষ ধারণাই ছিল না এ ব্যাপারে। সেই কারণেই প্রচুর পড়েও সাফল্য অধরা।

আসলে বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা—সব স্তরের পড়াশোনাতেই বুদ্ধি আর স্মৃতির সম্পর্কটা খুব ঘনিষ্ঠ। এই ঘনিষ্ঠতার বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণাই বাতলে দিতে পারে লেখাপড়ায় সাফল্যের সঠিক পথটা। আসুন সেই সম্পর্কের সূত্র ধরে ডুব দেওয়া যাক একটু গভীরে।

মস্তিষ্ক-রহস্য

ব্রেন বা মস্তিষ্কের মূল ৩টে অংশ— সেরিবেলাম বা লঘুমস্তিষ্ক, মিডব্রেন বা মধ্যমস্তিষ্ক এবং সেরিব্রাম বা গুরুমস্তিষ্ক। মস্তিষ্কের সব থেকে জটিল এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এই গুরুমস্তিষ্ক। এর ভেতরে সাদা রঙের স্নায়বিক পদার্থের ধূসর আবরণকে বলা হয় সেরিব্রাল কর্টেক্স। এতে আছে বেশ কিছু খাঁজ বা ফিসার এবং ভাঁজ বা কনভলিউশন। এই কনভলিউশনের সংখ্যা যত বেশি হয় মানুষের বুদ্ধিও ততো বেশি হয়। সংখ্যাটা অবশ্য এক এক জন মানুষের এক এক রকম হয়। তবে মস্তিষ্কের ব্যায়াম, মানে চিন্তা আর পড়াশোনার মাধ্যমে এই সংখ্যাটা কিন্তু বাড়ানো যায় বেশ কিছুটা। ব্রেনের ক্ষমতাও বেড়ে যায় তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। এই কনভলিউশন-গুলোকে আবার যুক্ত করে নার্ভ ফাইবার বা অ্যাসোসিয়েশন ফাইবার। এই ফাইবারের ক্ষমতা কমে গেলে বা নষ্ট হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় মস্তিষ্কও। ব্যাপারটা খুব বাড়াবাড়ির পর্যায়ে গেলে মানুষের মধ্যে মানসিক ভারসাম্যহীনতা পর্যন্ত দেখা দিতে পারে। মস্তিষ্কের অতিরিক্ত ব্যায়ামের ফলেও ঘটতে পারে এ জিনিস। সব মিলিয়ে যেটা জেনে রাখা ভালো, মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতার হেরফের মূলত নির্ভর করে এর আকার, ওজন এবং কনভলিউশনের ওপরে— মানুষের শিক্ষা, জ্ঞান অর্জন এবং স্মৃতিশক্তির ক্ষেত্রে যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

মনে রবে কি না-রবে

বেশির ভাগ ছাত্র-ছাত্রী,পড়ুয়া বা পরীক্ষার্থীরই আক্ষেপ, ‘প্রচুর পড়ছি, কিন্তু কিছুই মনে রাখতে পারছি না। সব যেন কেমন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে।’ বহু অভিভাবকেরও এ নিয়ে বাঁধভাঙা উদ্বেগ। সন্তানদের নিয়ে ছুটে আসেন তাঁরা একটু কাউন্সেলিং-এর আশায়। ফোনেও আসে অজস্র প্রশ্ন। কিন্তু কেন? একটু খতিয়ে দেখা যাক সমস্যাটা।

আসলে এই স্মরণ করা বা পড়ার বিষয় যথাযথভাবে মনে রাখার নেপথ্যে কাজ করছে ৪টে উপাদান। ১) লার্নিং বা শেখা ২) রিটেনশন বা ধারণ তথা মস্তিষ্কে সংরক্ষণ ৩) রিকল বা রিপ্রোডাকশন যাকে পুনরুদ্রেক বা পুনরুৎপাদনও বলা যেতে পারে এবং সব শেষে রেকগনাইজেশন, যার মানে একটা পরিচিতিবোধ বা চেতনা। এর মধ্যে যে কোনও একটা ক্ষেত্রে দুর্বলতা বা অসম্পূর্ণতা কারণ হতে পারে স্মৃতিশক্তির দুর্বলতার। যেমন, মনোযোগের অভাবে বা অন্য কোনও কারণে ভালো করে হয়তো শেখাই হয়ে ওঠা হলো না কোনও একটা বিষয়, স্বাভাবিকভাবেই মস্তিষ্কে তা ঠিকমতো ধরে রাখার প্রশ্নও উঠবে না। আবার ভালোভাবে শেখার পরেও রিকল না করা হলে, মানে বিষয়টা বার বার মাথায় না আনলে বা পর্যালোচনা না করলে আসল সময়ে তা মনে পড়বে কী করে? কিন্তু পড়াশোনার সময় এবং পরে এই ৪টে ধাপ বা উপাদানে যদি বিশেষ যত্ন নেওয়া যায় তা হলে পড়া মনে থাকতে বাধ্য।

আসলে পড়া ভালোভাবে তৈরি করে তা যথাযথ ভাবে মনে রাখা নির্ভর করে বেশ কয়েকটা বিষয়ের ওপরে—

  • শেখার ইচ্ছে। আমি এই বিষয়টা শিখবই,এই মানসিক দৃঢ়তা শেখাটাকে অনেক সহজ হয়ে দেয়।
  • পছন্দের বিষয় হলে শেখার সময় আগ্রহ আর মনোযোগটা অনেক বেশি থাকে। ফলে পড়াটা আয়ত্তেও আসে দ্রুত। মনে পড়ে সময়মতো। আর অপছন্দের বিষয় হলে ঠিক তার উলটো। আগ্রহ আর মনোযোগের অভাবে পড়া যেন মগজে ঢুকতেই চায় না, ধরে রাখা তো দূরের কথা। তাই স্কুল শিক্ষার পরের ধাপ থেকে পড়ার বিষয় নির্বাচনটা করা উচিত অত্যন্ত ভেবেচিন্তে। দেখা গেছে, বাবা-মাকে খুশি করতে গিয়ে নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে কোনও কোর্সে ভর্তি হয়ে ভবিষ্যত নষ্ট হয়ে গেছে কতো মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীর। তবে মনের মতো কোর্সের মধ্যেও এসে যেতে পারে অনেক অপছন্দের বিষয়। যেমন ম্যানেজমেন্টের যে ছাত্রটি হিউম্যান রিসোর্সে স্পেশালাইজেশন করতে আগ্রহী, মার্কেটিং ম্যানেজমেন্টে তার অ্যালার্জি থাকতেই পারে। কিন্তু ডিগ্রি বা ডিপ্লোমা পেতে হলে মার্কেটিং ম্যানেজমেন্টের পেপারটাতেও তো পাশ করতেই হবে। তা হলে উপায়? ওভার লার্নিং বা বার বার পড়ে জয় করতে হবে এই ভালো না লাগাটাকে।
  • কোনও রকমে শুধু মুখস্থ করে পড়া তৈরি করে ফেলার প্রবণতা অত্যন্ত বিপজ্জনক। পরীক্ষার হলে যে কোনও মুহূর্তে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে স্মৃতিশক্তি। কিন্তু গভীরে ঢুকে শেখার বিষয়টাকে অর্থপূর্ণ ভাবে সংগঠিত করতে পারলে, মানে বেশ ভালোভাবে বুঝে বিষয়টাকে আয়ত্ত করতে পারলে শেখা আর মনে রাখা—এই দুটোই বেশ জোরদার হয়। অর্থাৎ, শিক্ষণীয় বিষয়ের ওপরে ধারণা স্বচ্ছ হলেই সহজ হবে তা মনে রাখা।
  • জেনে রাখা জরুরি, দুশ্চিন্তা-ভয়-উদ্বেগ প্রাথমিক স্তরে মোটিভেটর হিসেবে কাজ করলেও মাত্রাতিরিক্ত ভয় বা উৎকন্ঠা কিন্তু পড়া তৈরি আর মনে রাখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত বড় বাধা। তাই এগুলোকে যতোটা সম্ভব পাত্তা না দেওয়াই ভালো।
  • পড়া তৈরি করা বা মনে রাখা ব্যাপারটা অনেকটাই নির্ভর করে পড়ুয়ার নিজস্ব কৌশলের ওপরে,শুধুই শিখিয়ে দেওয়া সাবেক কৌশলের ওপরে নয়। এক্ষেত্রে পড়ার পরিবেশটাও অবশ্যই একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। একঘেঁয়েমি কাটাতে পরিবেশের পরিবর্তন অনেক সময়ই পড়া তৈরি আর মনে রাখাকে বেশ উদ্বুদ্ধ করে।

লড়াই পরীক্ষাভীতির বিরুদ্ধে

এবারে আসা যাক পরীক্ষাভীতির কথায়,যাতে আক্রান্ত হয় প্রায় ৯৫ শতাংশ পরীক্ষার্থী। যারা সময়মতো পড়াশোনা করে না, ফাঁকি দিয়ে ভাবে স্টেজে ম্যানেজ করে নেবে, তাদের ক্ষেত্রে এই ভীতিটার যুক্তি থাকলেও

আন্তরিকভাবে নিয়মিত যারা পড়াশোনা করে তাদের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষাভীতি কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই অমূলক। এক ধরণের ফোবিয়া। নেপথ্যে উৎকন্ঠা কাজ করলেও আসল কারণ কিন্তু আত্মপ্রত্যয়ের অভাব। এই ধরণের পরীক্ষার্থীদের মধ্যে লক্ষ্যপূরণের দৃঢ়তা আর ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী না থাকায় প্রত্যাশিত সাফল্য কিন্তু অধরাই থেকে যায়। Generalized Anxiety Disorder(GAD) এর পাশাপাশি এসে যায় Depressive Disorder — এর মতো মানসিক সমস্যা। পরীক্ষার আগেই সহজে অবসাদ গ্রাস করতে পারে এদের। তা হলে সমাধান আসবে কোন পথে? পরীক্ষার দিকে পায়ে পায়ে এমনভাবে এগোতে হবে যাতে আত্মবিশ্বাস জেগে ওঠে মনের মধ্যে। কী ভাবে তা সম্ভব?

  • প্ল্যানিং অ্যাণ্ড টাইম ম্যানেজমেন্ট— পরীক্ষার দিন ঠিক কতোটা দূরে বা কাছে তা বিচার করে মাস, সপ্তাহ, দিন আর ঘন্টার হিসেবে ভাগ করে নিতে হবে প্রস্তুতির ক্ষেত্রটাকে। এর ওপরে ভিত্তি করেই ঠিক করতে হবে পরিকল্পনার রূপরেখা। পড়াশোনার সময় কোন বিষয়টার ওপরে কতোটা জোর দিতে হবে, কোথায় নিজের ঘাটতি পূরণ করতে হবে, সাম্ভাব্য প্রশ্ন কী হতে পারে –এই সব বিষয়ে মোটামুটি একটা অনুমান করে এগোতে হবে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। মানে, এই সপ্তাহে আমি কী কী পড়ব, কী কী লিখব বা আগামীকাল কোন সময়ের মধ্যে কোনটা কোনটা তৈরি করবো, এ সবই স্থির করতে হবে আগে থেকে। এগোতে হবে ডেডলাইন ধরে।
  • পড়ার পরিবেশ — কোনও বাঁধাধরা নিয়ম নেই। তবে নির্জন ঘরে দরজার দিকে পিঠ করে বসলে লেখাপড়ায় মনোনিবেশটা অনেক গভীর হয়। কিন্তু বাড়ি বা ফ্ল্যাটে জায়গার অভাবে বাস্তবে সব সময় এমন শান্ত, আদর্শ পরিবেশ পাওয়া নাও যেতে পারে। তা ছাড়া পড়ুয়ারও এমন পরিবেশ পছন্দ করবে তারও কোনও নিশ্চয়তা নেই। সেক্ষেত্রে ছাদ,বারান্দা এমনকী সবুজঘন কোনও পরিবেশ পরীক্ষার্থীর কাছে অনেক বেশি উপযোগী বলে মনে হতে পারে। আসল কথাটা হলো, ঘুরে ঘুরে জায়গা পরিবর্তন করে পড়লে বিষয়টা মনে গেঁথে যায় অনেক সহজে। আর গান চালিয়ে অঙ্ক করার সুফলতো পেয়েছেন অনেকেই।
  •  শুধু পড়া নয় — যে বিষয়টা পড়লাম বা তৈরি করলাম সেটাকে বার বার মাথায় নিয়ে আসা অভ্যেস করতে হবে। মানে, বাড়িতে বসে যে পড়াটা তৈরি করলাম রাস্তায় হাঁটতে বেরিয়ে সেটা আবার মনে করতে চেষ্টা করতে হবে। বাসে বা ট্রেনে বসার জায়গা পেলে নিজের নিরাপত্তা বিঘ্নিত না করে বাইরের দিকে তাকিয়ে পড়াটা মনে মনে আওড়ানো যেতে পারে। খেলার মাঠে বসে বা লেকের দিকে তাকিয়ে থেকেও ভাবা যায় পড়াটা। যদি পুরোপুরি মনে পড়ে তবেই বুঝতে হবে প্রস্তুতিটা ঠিকঠাক হয়েছে। পড়া আর ভাবার মধ্যে সামঞ্জস্য থাকলে পরীক্ষার খাতায় তার ইতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য। যখন খুশি, যেখানে খুশি বিষয়টা মনে করা সম্ভব হলে আত্মবিশ্বাস বাড়বেই।
  • চাই আলোচনা, পর্যালোচনা — শুধু বইতে মুখ গুঁজে পড়ে থাকলে চলবে না, সহপাঠীদের সঙ্গে পড়ার বিষয় আর পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে নিয়মিতভাবে মত বিনিময়ও করতে হবে। অনুশীলন করতে হবে বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে। তাতে বিষয়ের ওপরে দখলও যেমন বাড়ে, তেমনি বাড়ে আত্মবিশ্বাসও।
  • যেমন ইচ্ছে — পড়া আর শোনা এবং সেই সঙ্গে তা ছবি আকারে দেখা, এই তিনটে শর্ত পূরণ হলে পূর্ণতা পায় প্রস্তুতি। এ ব্যাপারে জুরি নেই ইন্টারনেট এবং অডিও ভিসুয়াল মিডিয়ার। তবে এই সু্যোগ না মিললে পড়ার পাশাপাশি শোনার ওপরেও একটু জোর দিতে হবে। কারণ, পড়ার থেকে শোনাটা নাকি অনেক বেশি ফলদায়ক। কিন্তু চেঁচিয়ে পড়া বা নীরবে পড়া, কার ক্ষেত্রে কোনটা কতোটা উপযোগী, তা নির্ভর করে পড়ুয়ার ওপরেই। তবে যে বিষয়টা পড়া হচ্ছে মনে মনে তার একটা ছবি কল্পনা করতে পারলে পড়া আর মনে রাখার চেষ্টাটা অনেক ফলপ্রসূ হয়ে থাকে।
  • ভাগ করে পড়া — একটা দীর্ঘ জটিল বিষয়কে এক সঙ্গে আয়ত্ত করতে গেলে মস্তিষ্কের ওপরে অনাবশ্যক চাপ সৃষ্টি হতে পারে, পরিণামে ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনাও অনেক বেশি। তাই কয়েকটা ছোট ভাগে ভাগ করে বিষয়টা নিয়ে এগোলে প্রস্তুতিটা অনেক সহজ হয়, দৃঢ় হয়। একটানা পড়ে যাওয়াটাও মস্তিষ্কের পক্ষে স্বাস্থ্যকর নয় মোটেই। ৪৫ মিনিট অন্তর চাই বিরতি। একটা বিষয় শেষ করার পরে আর একটা বিষয় শুরুর আগেও বিরতি বাধ্যতামূলক। তা না হলে গুলিয়ে যাবে দু-টো বিষয়ই।
  • ভোরের পড়া—গুরুত্বপূর্ণ এবং অপেক্ষাকৃত জটিল বিষয় আয়ত্ত করার উপযুক্ত সময় হলো ভোরবেলা। ঘুম থেকে উঠে বিষয়টা ধরলে কাজ হয় দ্রুত। তবে অনেকেই আবার পড়া তৈরির জন্য পছন্দ করে রাতের নিস্তব্ধতাই। অবশ্য স্মৃতিশক্তিকে জোরদার করতে হলে রাতের ঘুম খুবই জরুরি। না হলে কিন্তু মূল্য দিতে হতে পারে পরীক্ষার উত্তরপত্রে। পরীক্ষার প্রস্তুতিতে দুপুর থেকে বিকেলের মাঝের সময়টাও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।
  • মনে রাখার ‘লিঙ্ক’—কোনও একটা জায়গার নাম বা বিষয় বার বার ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলে কাছাকাছি একটা নাম বা বিষয়ের সঙ্গে মনে মনে তার একটা লিঙ্ক বা যোগসূত্র তৈরি করে নিতে হয়। যেমন, হায়দারাবাদের ‘দিলসুখ নগর’-এর নাম মনে রাখার জন্য জনপ্রিয় মিষ্টি ‘দিলখুশ’-এর কথা ভাবা যেতে পারে। তেমনি ‘হলদিবাড়ি’-র জন্য হলুদের কথা মনে রাখা যেতে পারে।
  • চাই লেখার মুন্সিয়ানা — মস্তিষ্কের সঙ্গে কলমের নিবিড় যোগসূত্র কিন্তু পরীক্ষায় সাফল্যের প্রধান শর্ত। যে পড়াটা তৈরি করলাম তা সঠিকভাবে গুছিয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে খাতায় নামানোটাই আসল কথা। গভীর অনুশীলনের মাধ্যমেই উন্নত করা সম্ভব এই লিখিত প্রকাশভঙ্গী। তবে পরীক্ষা দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করলে শুধুমাত্র পয়েন্টগুলো মাথায় রেখে মুখে মুখেই বিষয়গুলো আওড়ে নিলেই চলবে। শর্ট টার্ম মেমারি থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে নিয়ে যেতে হবে লং টার্ম মেমারিতে। স্থির করে নিতে হবে উত্তরটা কোথায় শুরু আর কোথায় শেষ করবো। বিষয়ের ওপরে মোটামুটি ধারণা আর লেখায় মুন্সীয়ানা থাকলে কিছুটা অচেনা প্রশ্নেরও মোকাবিলা করা সম্ভব হবে শেষ প্রহরে।
  • ইমোশনাল ব্লকিং — মনে রাখতে হবে, একটা পরীক্ষাই জীবনের সব নয়। আছে অসংখ্য বিকল্প। অন্যের আয়নায় নিজেকে দেখে মানসিক সমস্যা তৈরি করে লাভ নেই। জেনে রাখা ভালো, রাগ, ভয় আর ঘৃণা থেকে মনে একটা এমন অস্বাভাবিক উত্তেজনা তৈরি হয় যে খুব ভালো করে জানা উত্তরও পরীক্ষার হলে আর মনে পড়ে না। একে বলে আবেগজনিত প্রতিরোধ। অতএব, সাবধান!

অগ্রাধিকার মন আর শরীরের সুস্থতায়

ঠিক এই জায়গাটাতেই ধ্যান, প্রাণায়াম, যোগ, মুদ্রা আর ফ্রি হ্যাণ্ড এক্সারসাইজের সীমাহীন প্রয়োজনীয়তা। কারণ, পরীক্ষায় সাফল্য পেতে হলে তো উদ্বেগ, উৎকন্ঠা, বিশেষ করে অবসাদের গ্রাস থেকে পড়ুয়াদের মুক্তি পেতেই হবে। মুক্তির জন্য চাই মন আর শরীরচর্চা। মনঃসংযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে পদ্মাসনের সত্যিই কোনও বিকল্প নেই। পড়া শুরু করার আগে একটু ধ্যান বা পদ্মাসন করলে মন্দ নয়। অন্যদিকে উত্তেজনাকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে গোমুখাসন। পর্যাপ্ত ঘুমেরও ব্যবস্থা করে এই আসন। শবাসনের গুরুত্বও নতুন করে ব্যাখ্যা করা নিস্প্রয়োজন। সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে এবং অবশ্যই মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধির মাধ্যমে ক্লান্তি দূর করে লেখাপড়ার ইচ্ছেটাকে জাগিয়ে তোলে এই আসন। আবার গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস, নিয়মিত হাঁটা, সুর-গান আর সবুজের নৈকট্য হার মানায় অবসাদকে। সতেজ রাখে মনকে, স্নায়ুকে। বৃদ্ধি পায় ‘ই কিউ’ বা ইমোশানাল কোশেন্ট অর্থাৎ পরিস্থিতি মোকাবিলার ক্ষমতা। সেই সঙ্গে চিন্তা করার ক্ষমতা আর সৃষ্টিশীলতাও। তবে শুধু পরীক্ষার সময় কেন, বুদ্ধি আর স্মৃতির সঠিক সমন্বয় চাই জীবনের প্রতিটা মুহূর্তেই, যা সম্ভব শুধুমাত্র সুস্থ শরীরেই। এর জন্য জরুরি মন আর দেহের নিয়মিত ব্যায়াম।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*