সিপিএমের তৃণমূল বৈরিতাই এরাজ্যে সাফল্যের মূল পুঁজি বিজেপির

কল্যাণ সেনগুপ্ত

বিগত লোকসভার নির্বাচনে সিপিএমের ভোট শতাংশ অকল্পনীয় রূপে ৭%এ নেমে আসে, একমাত্র যাদবপুর কেন্দ্র ছাড়া সর্বত্র দলীয় প্রার্থীদের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। এরাজ্যে একটানা ৩৪বছর ক্ষমতায় থাকার পর হেরে যাবার ৮ বছরের মধ্যেই দলীয় সমর্থকরা পুরোনো দলের প্রতি সম্পূর্ণ আস্থা হারিয়ে বিনা প্ররোচনায় বিজেপির মতো একটি সাম্প্রদায়িক দলকে সবাই মিলে ভোট দিয়ে দেবে, তা একপ্রকার সম্পুর্ন অবিশ্বাস্য। এই ঘটনার পিছনে রহস্যকে আড়াল করতে যতই বলা হোক- ‘ভোটার কারও কেনা হয় না’, তা আদৌ বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ, ২০১১-র পর থেকেই ধীরে ধীরে তা নামছিল ঠিকই, কিন্তু  একবারে প্রায় ২০%-র কাছে ধ্বস নামা কোন নির্দিষ্ট লক্ষ্যে ভোট ট্রান্সফারের আত্মঘাতী গোপন নির্দেশ ছাড়া সম্ভব নয়। এই যুক্তি কেউ না মানতে চাইলেও এর স্বপক্ষে বলা যায়, এতবড় দলীয় বিপর্যয়ের পরেও এই ফলাফল নিয়ে দলে বিশেষ কোন হাহুতাশ নেই তো বটেই, উল্টে তৃণমূলের ১২টি আসন খোয়ানোর ফলে সিপিএম নেতারা খুশী চেপে রাখতে পারেন নি। যদি এই বিপর্যয় অজ্ঞাত কোন কারনে হোত তাহলে স্বাভাবিকভাবেই এনিয়ে দলে প্রচুর আলোড়ন হোত। কিন্তু সেরকম কিছুই ঘটেনি, ফলে এসব ঘটনাই সন্দেহকে সুনিশ্চিত করেছে।

সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি সংবাদ অনেকের চোখে পড়েছে, যার শীর্ষক হচ্ছে : রাজ্যে তৃণমূল মূল শত্রু -সূর্য। সংবাদে বলা হয়েছে, কেন্দ্রে বিজেপি হলেও রাজ্যে তৃণমূলকেই প্রধান শত্রুরূপে চিহ্নিত করল সিপিএম। তার ব্যাখ্যাও দিলেন সিপিএম রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র। তৃণমূল গণতন্ত্রকে ধ্বংস করছে। গণতন্ত্র ফেরাতে সরকারে যারা আছে প্রথমে তাদের হারাতে হবে। তারপর সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই হবে বলে জানান তিনি।

উক্ত সংবাদটি বৃহৎ সংবাদপত্রে চোখে না পড়লেও এর বিষয়বস্তু বা বয়ান এতটাই পরিচিত ও বিশ্বাসযোগ্য যে, সিপিএম নেতাদের পক্ষেও একে অস্বীকার করা প্রায় অসম্ভব। যদিও এতটা স্পষ্ট করে এই যুক্তি অতীতে প্রকাশ্যে শোনা যায়নি। তবে আশা করা যায়, ভবিষ্যতে নিশ্চিতভাবেই শোনা যাবে। কারণ ঘটনা পরম্পরা তারই সাথে সাযুজ্য রক্ষা করে চলেছে।

এই বয়ানটি থেকে তিনটি সিদ্ধান্ত পরিষ্কার—

১) এরাজ্যে বাম-কংগ্রেস জোটের মূল শত্রু তৃণমূল,

২) কারণ, তৃণমূল রাজ্যে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করছে তাই সেই দলকে প্রথমেই সরাতে হবে,

৩) অতঃপর রাজ্যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে তারপরেই সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই হবে।

এর থেকে আরও পরিষ্কার, ‘সিপিএম মনে করে, বিজেপি ক্ষমতায় এলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে’। কিন্তু একটি বিষয় তো ঘোষিত সত্য যে, ‘সিপিএমের চোখে তৃণমূলের চেয়ে বিজেপি ভাল এই রাজ্যের জন্য’।

সিপিএম সবসময় দলের নীতি নির্ধারণ করে দলের ক্ষুদ্রস্বার্থকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে, দেশের স্বার্থে নয়। ফলে এর বাস্তবরূপ হচ্ছে ‘যেখানে যেমন সেখানে তেমন’, অর্থাৎ এক চূড়ান্ত সুবিধাবাদী নীতি। যথা, এরাজ্যে কংগ্রেস মিত্র আর কেরলে শত্রু। আবার কেন্দ্রে বিজেপি বড় শত্রু কিন্তু এরাজ্যে বিজেপি বড় শত্রু নয়, ছোট। আবার ত্রিপুরায় বিজেপি বড় শত্রু, কিন্তু কেরলে ছোট শত্রু। অথচ এর পরেও সিপিএম দাবি করে, তাদের দল অতীব আদর্শবাদী ও নীতি নিষ্ঠ। যদিও দেশের মানুষ এসবে কোন গুরুত্ব না দিলেও ৭% মানুষতো এখনো বিশ্বাস করে অন্ধভাবে। কিন্তু সিপিএম দল ‘আগে রাম পরে বাম’ কৌশল অনুযায়ী ‘মমতা ভাগাও বিজেপি লাও’ স্লোগান ক্রমশ গোপনে সর্বত্র ছড়াচ্ছে। এই ভয়ংকর ভুল চিন্তা ভাবনার বশবর্তী হয়ে যেভাবে সিপিএম মমতাকে সরিয়ে বিজেপিকে রাজ্যের ক্ষমতায় বসাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে, তা কোনভাবে সফল হলে বিজেপি বাংলাকে শাসন করবে ইউপির স্টাইলে। গো রক্ষার নামে মুসলিম হত্যা ও দলিত নিগ্রহ নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়াবে। ধর্মীয় উন্মাদনার আড়ালে বড়বাজারী অবাঙালি মস্তানদের চাকর বাকর হয়ে পাড়ার বাঙালি ছোকড়ারা হুকুম তামিল করবে। দাঙ্গা, হত্যা, খুন জখমের ঘোর অমানিশার অন্ধকারে ডুববে গোটা রাজ্য। তখন মানুষ হিসাব করবে, মমতা জমানায় ভালো ছিলাম না এখন! আর তখনই মানুষ দূষবে সিপিএমকে ভুল বোঝানোর দায়ে।

সিপিএম নেতৃত্ব কি ভুলে গেছেন— ১৯৬৪ তে দল গঠনের পর থেকেই বাজপেয়ী জমানার শুরু পর্যন্ত একটানা অন্ধ কংগ্রেস বিরোধিতা চালিয়েছেন কংগ্রেসকে দুর্বল করতে। কী কুৎসিত ব্যক্তি সমালোচনা করেছেন ইন্দিরা, রাজীব গান্ধীর বিরুদ্ধে এবং তার ফলে কংগ্রেস দুর্বল হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সিপিএম কি নিজে শক্তিশালী হয়ে সেই জায়গাটা নিতে পেরেছে? না, সেই জায়গাটা নিয়েছে বিজেপি এবং ক্রমশ বিজেপি আজ সারাদেশে নিজেকে এক অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত করেছে। সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধরূপে একে ঠেকাতে না পারলে বিজেপি দেশকে হিন্দুরাষ্ট্ৰে পরিণত করবে। এরকম চরম বিপদের সন্ধিক্ষণে বিজেপিকে লঘুজ্ঞান করে মমতাকে মূলশত্রু চিহ্নিত করলে লাভ হবে শুধুমাত্র বিজেপির। আর চরম ক্ষতি হবে বাংলার, তার মহান ঐতিহ্যের এবং সব সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী শক্তির। আজ যে বিজেপি বঙ্গবিজয়ের স্বপ্ন দেখছে, তার একমাত্র কারণ সিপিএমের চূড়ান্ত মমতা বৈরিতা। যার পূর্ণ সুযোগ নিচ্ছে বিজেপি। সিপিএমের এই সুবিধাবাদী মনোভাবের কারণেই এরাজ্যেকে হয়তো চরম সর্বনাশের মুখে পড়তে হতে পারে যদি না মমতা সক্ষম হয় বিজেপির সর্বনাশা হাত থেকে বাংলাকে রক্ষা করতে।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*