শিক্ষক দিবস আত্মসমীক্ষার দিন

শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়

৫ সেপ্টেম্বর সমগ্র ভারতবর্ষের প্রতিটি রাজ্যে মহাসমারোহে শিক্ষক দিবস পালিত হলো। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, নাচের, গানের, যন্ত্রসংগীতের স্কুল, বিভিন্ন খেলাধুলোর স্কুল-সহ বিভিন্ন শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক দিবস পালিত হলো। ছাত্ররা তাদের প্রিয় শিক্ষকদের কোথাও গান, আবৃত্তি, নৃত্যনাট্য, আবার কোথাও নানা কসরত করে শিক্ষকদের খুশি করেছেন। কোনও কোনও প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের জন্য নানা উপহার দিয়েছেন। শিক্ষকরাও ছাত্রদের অনুষ্ঠান দেখে আনন্দিত হয়ে ছাত্রদের আশীর্বাদ করেছেন প্রাণ ভরে।

ছাত্র-ছাত্রীদের ভালো অথবা খারাপ হওয়ার পিছনে শিক্ষকদের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। যদিও পিতা-মাতা ও গুরুজনদের ভূমিকাও আমরা অস্বীকার করতে পারি না। যে ছাত্র-ছাত্রীরা শিক্ষক দিবস পালন করল তারা এই দিবস সম্পর্কে কতটা ওয়াকিবহাল এবং কতটা আন্তরিক সেটাও জানা দরকার। ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণান স্বামী বিবেকানন্দের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন এবং তাঁর ছাত্ররা যখন তাঁর জন্মদিন পালন করতে চেয়েছিল, তখন তিনি তাদের উপদেশ দিয়েছিলেন, শিক্ষক দিবস পালন করার জন্য।

শিক্ষক দিবস পালনের অবসরে শিক্ষকরা ছাত্র-ছাত্রীদের অন্তরে মানুষ্যত্ব জাগিয়ে তুলবেন। তাদের সৎ, মানবিক ও সুশিক্ষিত করে তুলবেন এটাই শিক্ষকদের মিশন। নিছক চাকরি করাই শিক্ষকদের ব্রত হতে পারে না। যখন কোনও ছাত্র সফল হয়, তখন তার বাবা-মা যেমন আনন্দ পান, ঠিক তেমন আনন্দ পান তার শিক্ষক। তবে শিক্ষক বললে একজন নয়, সকল শিক্ষক এমনকী গৃহশিক্ষককেও বোঝায়। আবার ছাত্র-ছাত্রীরা যখন অকৃতকার্য হয়, তখন দায় কার? শিক্ষক-শিক্ষিকাদের না অন্য কারওর। আমাদের মনে রাখতে হবে, সাফল্যের কৃতিত্ব যদি শিক্ষক-শিক্ষিকাদের হয় তাহলে অসাফল্যের দায়িত্বও অনেকটাই তাঁদের ওপর। অনেক স্কুল-কলেজ ও নানা প্রতিষ্ঠান আছে তারা শুধুমাত্র ভালো ছাত্র-ছাত্রীদের তাদের প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ দেয় এবং সবাই ভালো ফল করে পরীক্ষায় পাশ করে। কিন্তু যে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সাধারণ মানের ছাত্রদের নিয়েও পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করে দেখায় তাদের কৃতিত্ব অনেক বেশি। সাম্প্রতিককালে কলকাতার নামী-দামি স্কুলের থেকেও মফঃস্বলের ছাত্র-ছাত্রীরা অনেক ভালো ফল করেছে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের দায়বদ্ধতা কতখানি তা প্রমাণিত হয়, আবার ভালো ফল করা কলকাতা একেবারে প্রথম সারিতে থাকা কলেজের ছাত্ররা যখন খারাপ ফল করে তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না যে শিক্ষকরা ছাত্রদের বোঝাতে পারেন না যে তারাই দেশ গড়ার কারিগর। শিক্ষকদের কাজ হলো মনুষ্যত্বের উদ্বোধন, মানবিকতা, সততা, জীবিকা সংস্থানের শিক্ষা এবং জীবন ও মনের পরিপূর্ণ বিকাশ।

স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, ‘প্রতিটি মানুষের মধ্যে পূর্ণতা আছে, আর তার পরিপূর্ণ বিকাশই হল শিক্ষা।’

আমাদের দেশের শিক্ষককুল গর্ব করতে পারেন এই কারণে যে, রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, স্বামী বিবেকানন্দ, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, আচার্য সত্যেন বসু, আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র,  নজরুল-সহ অসংখ্য ক্ষণজন্মা মানুষ অতি সাধারণ স্কুল থেকে মহান হয়েছেন।

এক সময় ছিল যখন ছাত্ররা চতুষ্পাঠী, পাঠশালা, মক্তব, মাদ্রাসা প্রভৃতি স্থানে পঠনপাঠন শুরু করেছেন। ক্রমে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনুশীলন, বিদেশি শিক্ষার উত্তম দিকগুলি পাঠ্যক্রমের মধ্যে সংযোজন, জাতীয়তাবোধের উন্মেষ ঘটেছে। পরবর্তীকালে জীবনমুখী ও জীবিকামুখী শিক্ষার প্রসার ঘটে। শিক্ষকরা ছাত্রদের মধ্যে যে গুণগুলি আছে তা প্রকাশ করার জন্য সাহায্য করবেন। কারণ শুধু পুঁথিগত বিদ্যায় ছাত্রের জীবনে পরিপূর্ণতা আসে না। তাই প্রকৃত শিক্ষক না হলে প্রকৃত ছাত্র তৈরি হবে না। ছাত্ররা অনেকটাই মাটির তাল। সেই নরম মাটি থেকে প্রতিমা তৈরি করে তার পূজা অর্চনা হয়। এক্ষেত্রে সেই পটুয়া বা শিল্পীর নাম সকলে উচ্চারণ করেন, যে ভালো প্রতিমা তৈরি করেন।

শিক্ষকরাও প্রকৃতপক্ষে পটুয়া। একটি ছাত্রের সমস্ত গুণগুলির প্রকাশ যাতে হতে পারে সেই শিক্ষা দেবেন যাতে তার পূর্ণতা পরিপূর্ণতা পায়।

শেষ করব একট বিতর্কিত বিষয়ের অবতারণা করে। তা হলো শিক্ষকদের একটি অংশ তাঁদের আত্মসমীক্ষা করেন না। তাঁরা তাঁদের দায়িত্ব পালন করেন না। যে মহান আদর্শ একজন শিক্ষককে সর্বোচ্চ সম্মানের জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করে তাঁরা সেই পথের পথিক নন। সেই জন্য আজ ছাত্রসমাজ ও শিক্ষকসমাজের আত্মসমীক্ষার দিন।

সংগ্রামী মা মাটি মানুষ পত্রিকা ২০১৭ পূজা সংখ্যায় প্রকাশিত

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*