শিল্পের উৎকর্ষকেই প্রাধান্য দিয়েছেন শম্ভু মিত্র

সুদেব সিংহ

এ বছর স্বাধীনতার সত্তর বছর পূর্তি হলো। একই সঙ্গে  বহুরূপী নাট্যদলও সত্তর পেরোলো। আজ তো এ কথা বলাই বাহুল্য যে, বহুরূপীর প্রাণস্বরূপ ছিলেন শম্ভু মিত্র। ১৯৪৮ সালে বিজন ভট্টাচার্যের ‘নবান্ন’ নাটক ফের মঞ্চস্থ হয়। ১৯৪৪ সালে যে ঝড় উঠেছিল তা কিন্তু দ্বিতীয় বার দেখা গেল না। ১৯৫১ সালে রবীন্দ্রনাথের ‘চার অধ্যায়’ প্রযোজনা করলেন শম্ভু মিত্র। এই প্রযোজনার সাফল্যও কিন্তু বিরাট কিছু নয়। দুখীর ইমান, ছেঁড়া তার, বিভাব, উলুখাগড়া, পথিক— এই নাটকগুলি নিয়েও পরীক্ষা করেছেন শম্ভুবাবু। ১৯৫২ সালের ১ জুন প্রথম বার ‘দশচক্র’ মঞ্চস্থ হয়েছে। এই মঞ্চায়নের পরে বহুরূপীতে বড়ো ধাক্কা লাগে। সবিত্যব্রত দত্ত, তুলসী লাহিড়ী, কালী সরকার এঁরা সব দল ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। এই সময় ফিল্মেও অভিনয় করছেন শম্ভু মিত্র। ১৯৫৩ সালে শম্ভু মিত্র অভিনীত ‘মহারাজা নন্দকুমার’ ফিল্মটি মুক্তি পেলো। ওই বছরই ইউজি ও’নিল-এর একটি নাটক মঞ্চস্থ করে বহুরূপী। এর পরেই দেবকীকুমার বসু পরিচালিত পথিক ছবিটিও মুক্তি পায়। এতেও শম্ভু মিত্র অভিনয় করেন। এর পরের বছর ১৯৫৪ সালের জানুয়ারি মাসের ২১ তারিখ প্রয়াত হলেন মহর্ষি মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য। একসময় গণনাট্য সংঘ ছেড়ে এসেছিলেন শম্ভুবাবু মহর্ষি মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যকে কেন্দ্র করেই। তাঁর সম্পর্কে কেউ কটু মন্তব্য করেছিলেন।

আপাতভাবে মনে হয়, এই কালপর্বটি যেন বহুরূপীর পক্ষে বেশ টালমাটাল পরিস্থিতি। অনেকে মনে করেছিলেন, বহুরূপী বোধহয় ভেঙেই গেল। শিয়ালদহের বিয়ার ম্যানসন ইনস্টিটিউটে শম্ভু মিত্র মঞ্চস্থ করলেন ‘রক্তকরবী’। এটাও কিন্তু ১৯৫৪ সালেই। তার পর রক্তকরবী পৌঁছে গেল নিউ এম্পায়ারে। ১৯৫৬ সালে এই প্রযোজনা এমন আলোড়ন সৃষ্টি করলো যে, তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু দিল্লিতে কলাসঙ্গমের অনুষ্ঠানে ছুটে এলেন এই প্রযোজনা দেখতে। তাঁর সঙ্গে এলেন ইন্দিরা গান্ধী-সহ মন্ত্রিসভার সদস্যরা। এই দু-বছরেই রক্তকরবী প্রযোজনা বুঝিয়ে দিলো রবীন্দ্রনাথ মঞ্চায়নে শম্ভু মিত্রের সাফল্য। আর শম্ভু মিত্র তো বলতেনই, জীবনে সবচেয়ে বেশি কারও কাছ থেকে পেয়ে থাকি তা তো ওঁর কাছ থেকেই, অর্থাৎ রবি ঠাকুর। দু-হাত ভরে নিয়েছি।

বহুরূপী যে পত্রিকা প্রকাশ করতো সেখানে শম্ভুবাবু সিদ্ধান্ত নেন যে, এই পত্রিকায় নিজেদের প্রযোজনা নিয়ে একটি কথাও লিখবো না। এমন কোনও কাজ করবো না যা কারও মনে হয় নিজের ঢাক নিজে পেটানো। অথচ বহুরূপীর সমৃদ্ধ লাইব্রেরিকে ঘিরে জড়ো হয়েছেন শঙ্খ ঘোষ, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়, সৌরীন ভট্টাচার্যদের মতো বিদ্বান লেখকরা। এঁদের মনে হয়েছে, যখন শম্ভুবাবু বলতেন নীচ প্রবৃত্তিকে প্রশ্রয় দিতে নেই তখন ভারি অদ্ভুত ঠেকতো। কেন মনে হতো এ কথা? অন্যরা যখন বলেন, সেক্ষেত্রে কথাটা যেন হয়ে ওঠে নীতি-উপদেশের মতো। চলতি কথায় যাকে আমরা বলি জ্ঞান দেওয়া। কিন্তু রক্তকরবী, চার অধ্যায়, রাজা, দশচক্র, অয়দিপাউসের পরিচালক যখন এ কথা বলেন তখন যেন মনে হয় কথাটির মাত্রা পাল্টে গেছে। আসলে জীবনকে দেখার যে অনন্য প্রচেষ্টা ছিল এঁদের মধ্যে তাই বোধহয় গভীর অনুভবে জারিত করতো শম্ভুবাবুদের মতো মানুষের যে কোনও বক্তব্যকে।

১৯৩৯ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে পেশাদারি থিয়েটারে অভিনয় শুরু করেছিলেন। সে সময় পড়তেন কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। লেখাপড়াও শেষ করেননি। চলে এসেছিলেন অভিনয়ে। গণনাট্য আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। পরে বহুরূপী গড়ে তুলে নাটকের ধারাই পাল্টে দিলেন। আজকের বেশ কয়েকজন বিখ্যাত পরিচালক, নাট্য আলোচক ১৯৫০ সালের মাঝখান থেকে সত্তর দশক পর্যন্ত শম্ভু মিত্রের যুগ বলতে চান। কারণ, রবীন্দ্রনাথের নাটক বা কয়েক হাজার বছরের পুরোনো গ্রিক নাটক মঞ্চায়নের কোনও ইতিহাস তো আগে ছিল না। যে নাটক মনে করা হতো নিবিড় পাঠের বিষয়, সেই নাটক সফল মঞ্চায়ন করলেন শম্ভু মিত্র।

১৯১৫ সালের ২২ আগস্ট তাঁর জন্ম। বাবা শরৎকুমার মিত্র, মা শতদলবাসিনী দেবী। বাবার কাছ থেকে পেয়েছিলেন পড়াশোনার অভ্যাস। সেই ধারা বহন করেছেন সারা জীবন। ১৯৯৭ সালের ১৯ মে শম্ভু মিত্র মারা যান।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*