ঋতুপর্ণ ঘোষ, গল্পের গাঁটছড়া

সুদেব সিংহ

কথায় বলে গল্পের গাঁটছড়া। এ কথা তো জানা যে, মানুষ গল্প শুনতে ভালোবাসে আদিকাল থেকে। তাহলে আবার গাঁটছড়া বাঁধতে হয় কেন? গল্পের মধ্যে মিশে যায় লোকায়ত বিশ্বাস, মানুষের সংঘবদ্ধ স্মৃতি বা সমষ্টির স্মৃতি ইত্যাদি নানা বিষয়। আধুনিক সময়ে গল্পের ধারণাটা অনেকটা বদলে গেল। ছোটোগল্প, উপন্যাস এসব তো আছেই, সেই সঙ্গে সিনেমাতেও গল্প বলার দারুণ চল হলো। এই গল্পের পাঠক যেমন ছিল মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ সিনেমার দর্শক কিন্তু বরাবরই নানা ধরনের। এক ভাষার সিনেমা নানা ভাষার মানুষ দেখেন। আবার এমন সিনেমা তৈরি হয় যেটা শহুরে মধ্যবিত্তকে বেশি প্রভাবিত করবে। ঋতুপর্ণ ঘোষ যখন ছবি করতে এসেছেন সে সময় প্রধানত বাংলা বাণিজ্যিক সিনেমার প্রবল দাপট। বাণিজ্যিক ছবি বলার উদ্দেশ্য কতগুলো বিষয়কে সহজ করে নেওয়া। যে ধরণের সিনেমা শহরে তো বটেই গ্রামে-গঞ্জেও দর্শককে মাতিয়ে দেয়, আমরা প্রধানত মূলধারার বাণিজ্যিক ছবি সেগুলোকেই বলি। ৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে সিনেমা হলের সংখ্যা কমতে শুরু করলো। বিভিন্ন জেলাশহর, কলকাতার নানা জায়গায় সিনেমা হল বন্ধ হতে শুরু করলো। আবার ২১ শতকের গোড়া থেকেই মাল্টিপ্লেক্সের চল শুরু হলো।

ঋতুপর্ণ ঘোষ কিন্তু এই সময়েই ছবি করতে এসেছেন। তাঁর প্রথম পূর্ণ দৈর্ঘের ছবি ‘১৯শে এপ্রিল’ তাতে প্রধান তিনটি চরিত্রে ছিলেন অপর্ণা সেন, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় এবং দেবশ্রী রায়। অপর্ণা সেন স্বনামধন্য মানুষ। প্রসেনজিৎ এবং দেবশ্রী তখন কিন্তু একের পর এক হিট সিনেমা নিয়ে আসছেন। প্রসেনজিৎ-এর এই ছবি টানার ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে ঋতুপর্ণ তাঁকে ব্যবহার করলেন। ১৯৯৪ সালে এই ছবি দারুণ সাফল্য পেলো।

এরপর দহন, অসুখ, উৎসব, তিতলি, রেনকোট, দোসর—এইসব ছবি ধারাবাহিক সাফল্য পেয়েছিল। কিন্তু খেয়াল করলে দেখা যাবে, এই ছবিগুলোতে বারবার ফিরে এসেছে মধ্যবিত্তের গল্প, বরং মধ্যবিত্ত মানুষের সম্পর্কের গল্প। সম্পর্কের টানাপোড়েন কখনও ভাঙাচোরা, এসব মিলে প্রতিটি গল্পেই মধ্যবিত্তের গেরস্থালি খুব জরুরি হয়ে উঠলো। সেই মধ্যবিত্ত কিন্তু রেশন দোকানে লাইন দেওয়া বা বাসে ঝুলে পথ চলা মানুষ নয়—তারা সকলেই উচ্চ মধ্যবিত্ত। স্বচ্ছল পরিবার, তার ভিতরের নানারকম গল্প-কাহিনি। রুটি, ডাল, সবজি থেকে শুরু করে ফ্যাব ইন্ডিয়ার মতো বিখ্যাত ব্র্যান্ডের জামাকাপড়, জানলা-দরজার পর্দা, বিছানার চাদর টেবিলের ঢাকা এসব অঙ্গাঙ্গিভাবে দেখা গেল তাঁর ছবির দৃশ্যে।

বলা হয়, এদেশে নব্বই-একানব্বই সাল থেকে অর্থনীতির উদারীকরণের ফলে মধ্যবিত্ত শ্রেণি ক্রমশ বাড়তে থাকে। ২১ শতকের গোড়াতেই শহরের নানা জায়গায় শপিং মল-মাল্টিপ্লেক্স দেখা যেতে লাগলো। পুরোনো সিনেমা হল দু-একটা নতুন কলেবরে আত্মপ্রকাশ করলো। কিছু হল চিরতরে বন্ধ হলো। এই নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে নিপুণভাবে গল্পের ছকে বেঁধে ফেললেন ঋতুপর্ণ ঘোষ।

নিজের ফিল্ম সম্পর্কে কখনওই উচ্চকিত কোনও মন্তব্য করতে তাঁকে শোনা যায়নি। তিনি বলতেন, মুশকিলের বিষয় হলো ঋত্বিক ঘটক, সত্যজিৎ রায়ের মতো চিত্র পরিচালকদের সঙ্গে অনেকেই আমার তুলনা করেন। আমি বরং স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবো যদি তপন সিংহ, তরুণ মজুমদারদের মতো ছবি করিয়েদের পাশে আমাকে বসানো হয়। কেন বলছেন এ কথা? তাঁর মতে, ঋত্বিক ঘটক একচুলও জমি ছাড়ার পাত্র নন। সত্যজিৎ রায়ের কাহিনি বুননের সঙ্গে ঋতুপর্ণের ছবির কতকটা মিল আছে। কিন্তু ‘পথের পাঁচালি’ বা ‘অপরাজিত’-এর মতো রূঢ় বাস্তব তিনি অনুসরণ করেন না। কিন্তু তপন সিংহের ‘গল্প হলেও সত্যি’র মতো একটি ছবিও কি ঋতুপর্ণ নির্মাণ করলেন?

সমস্যার জায়গা বোধহয় আলাদা। সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে ছবিতে জমজমাট গল্প তৈরি করা ২০০১-০২ সাল থেকে বড়ো ট্রেন্ড হয়ে উঠলো। ঋতুপর্ণ গল্পের এই ধরনটাকে আঁকড়ে ধরলেন। অথচ দেশ-বিদেশের ফিল্ম-শিল্প-সাহিত্য বিষয়ে তাঁর অগাধ জ্ঞান ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাওয়া সিনেমা সম্পর্কে খবরাখবর রাখতেন তিনি। ২০০৩-০৪ সালে নির্মিত রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস অবলম্বনে ‘চোখের বালি’ নানা দিক থেকে উল্লেখযোগ্য হলেও সেখানেও সম্পর্ক নিয়ে জটিলতা বড়ো আকার ধারণ করলো। একভাবে দেখলে এই ছবিটি মধ্যবিত্তের দেখার ধরনে উনিশ শতককে ফিরে দেখা হচ্ছিল। তা-ও কিন্তু গল্পের জমজমাট যুক্তি অনুসরণে।

ঋতুপর্ণ ঘোষ বুঝতেন, ফিল্ম তো এমন একটা প্রক্রিয়া যেখানে যুক্ত রয়েছে বহু মানুষের স্বার্থ ও জীবিকা। নিজে এ কথা বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেওছেন। তাঁর প্রত্যেকটা ছবি দেখে মনে হয়েছে, কী বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী ছবিতে বোধহয় একটা মোড় ঘোরানো ঘটনা ঘটবে। সেটা ঘটার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হলো ‘চিত্রাঙ্গদা’ ছবিটি পর্যন্ত। মহাভারত কাহিনি রবীন্দ্রনাথের হাত ঘুরে ঋতুপর্ণের দেখায় সেলুলয়েডের চেহারা পেলো। নিজের অস্তিত্বটাই তিনি যেন গুঁজে দিলেন এই ছবির পরিসরে। একজন মানুষের শারীরিক পরিসর ফিল্মের পরিসরে ক্রমশ ঢুকে পড়তে লাগল। এটা কিন্তু ২০১২ সালের কথা। এর ঠিক এক বছর পর  ২০১৩ সালে ৩০ মে তাঁর প্রয়াণ। ইতিমধ্যে তিনি কাজ করছেন রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনস্মৃতি’ নিয়ে। তাঁর বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে এবং লেখাপত্রে বোঝা যেত কী গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ পড়েছেন এই ফিল্ম নির্মাতা। রবীন্দ্রনাথের কবিতাকে নানাভাবে ফিল্মের পরিসরে ব্যবহার করার চেষ্টাও করেছেন। মাত্র ৪৯ বছর বয়সে অকালে প্রাণ গেছে এই চিত্র পরিচালকের। দেশজোড়া বিপুল সমাদর পেয়েছেন। একের পর এক জাতীয় পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছে তাঁর ছবি। তাঁর ছবিতে অভিনয় করেছেন বলিউডের বড়ো বড়ো তারকারা। আরও অনেকে সুযোগ চাইছিলেন অভিনয় করার। একজন বাঙালি ছবি করিয়ের এহেন দাপট বহুকাল কিন্তু দেখা যায়নি। কিন্তু আমাদের আশা যেন কোথাও পূর্ণ হলো না। একে তো তাঁর অকালমৃত্যু। সেই সঙ্গে তাঁর কাছে আমাদের প্রত্যাশার তালিকাও ততদিনে দীর্ঘায়িত হয়েছে। কেননা তাঁর ছবি প্রযোজনা করতে চাইছেন অসংখ্য প্রযোজক। বাড়িতে প্রোডিউসারের লাইন। এই অবস্থা কিন্তু বেশ কয়েক বছরের। সেদিক থেকে দুঃখ রাখার জায়গা নেই। ১৯৬৪ সালের ৩১ আগস্ট ঋতুপর্ণ ঘোষের জন্মদিন। বেঁচে থাকলে তাঁর বয়স হতো মাত্র ৫৩ বছর। হয়তো বিস্মিত হওয়ার মতো আরও কোনও কাজ তিনি উপহার দিতেন আমাদের। তেমনটা ঘটলো না। এই দুঃখ অন্তরে বহন করে তাঁর জন্মদিনে আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*