রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল গুরু শিষ্য সংবাদ

বিশ্বময় রায়চৌধুরী

স্কুলের ক্লাসে উপরের বাসা থেকে একটি পাখীর ছানা পড়ে গেলে ক্লাসের এক বালক লিখেছিলেন—

“ধরতে ছোটে ছানাটিরে ক্লাসের যত দুষ্ট ছেলে

ছুটছে পাখী প্রাণের ভয়ে ছোট্ট দুটি ডানা মেলে

বুঝতে নারি কি সে ভাষায় জানায় মা তার হিয়ার বেদন,

বোঝে না কেউ ক্লাসে ছেলে মায়ের বক্ষভরা ধন।”

ক্লাসের শিক্ষক স্মরণ করলেন জগতের আদি মহাকবির ছন্দবদ্ধ প্রথম শ্লোক, “মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতী গমাঃ…।”

এই বিস্ময় বালকের নাম নজরুল ইসলাম। জন্ম বর্ধমানের চুরুলিয়া গ্রমে ১৩০৬ সালের ১৬ ই জৈষ্ঠ্য। মাত্র ৮ বছর বয়সে পিতৃহীন হলে শিক্ষা বন্ধ হয়ে গেল। গ্রামের মক্তব থেকে প্রাথমিক পরীক্ষা পাশ করে, পরে এখানে শিক্ষকতাও করেন।

১১-১২ বছরের কিশোর নজরুল লোটোর দলে নাটক লিখে পরিচিতি লাভ করতে থাকেন। গবেষকদের মতে লোটোগান অনেকটা কবির লড়াইয়ের মত মুখে মুখে সওয়াল জবাব আছে। আবার সাথে সঙ্গীত বহুল নাটক। বাংলার হাজার বছরের সাংস্কৃতিক জগতে নজরুল ১১ খানির মতো পালা যোগ করলেন। তার কিশোর বয়সে। দর্শকের অনুরোধে কোরান থেকে রামায়ণ, মহাভারত থেকে গল্পের সাহায্য নেবার জন্য নজরুলের ক্লাসিক পাঠের অভ্যেস তৈরী হয়ে যায়। তৈরী হয়ে যায় বাংলা লেখার চমৎকার অভ্যাস।

১৯৩৮ সালে কুমুদরঞ্জন মল্লিকের স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণির পরই স্কুল ত্যাগ করতে বাধ্য হন। এক খ্রিস্টান বন্ধুর দিদির স্বামী ছিলেন রেলের গার্ড, তাঁদের বাড়িতে বাবুর্চির কাজ করতে করতে আলাপ হয় পুলিশের দারোগা রফিকউল্লার সঙ্গে। তিনি ময়মনসিংহে নিয়ে গিয়ে স্কুলে ভর্তি করান। সেইখান থেকে বাড়ি ফিরে ভর্তি হন ফ্রী-স্কুল শিয়ারখোল স্কুলে। এখানেই আলাপ হল শৈলজানন্দের সঙ্গে। প্রিয় বন্ধু, খ্রিস্টান এখন হল মুখোপাধ্যায় ব্রাহ্মণ। এই বয়সেই জাত-পাতের বাধা ভেঙে গেল। এই স্কুলেরই শিক্ষক নিবারণচন্দ্র ঘটক ছিলেন বিপ্লবী, আত্মোন্নতি গোষ্ঠীর সদস্য। তাঁর মামীমা দুকড়িবালা দেবীসহ তিনি গ্রেফতার হলে বালক স্নেহশীল শিক্ষকের জন্য মনোকষ্ট পান। নজরুল জেনেছিলেন নিবারনবাবুর কাছে রাখা পিস্তল এবং রডা কোম্পানির কার্তুজ কোন বিপ্লবী ব্যবহারই জানতেন না। ফাইন্যাল পরীক্ষায় নজরুল জলপানি পাবে সকলেই জানে। সেই নজরুল পরীক্ষার তিন মাসের আগে চলে গেলেন সৈন্যদলে যোগ দিতে। অনেক গবেষক এই ঘটনার জন্য নিবারণবাবুদের ঘটনাকে কারণ বলে মনে করেন।

পল্টনে গিয়ে আলাপ এক পাঞ্জাবী মৌলবীর সঙ্গে। তিনি প্রতিদিন সন্ধ্যায় কয়েক ঘণ্টা নজরুলকে ফার্স্ট ভাষা শিক্ষা দিতেন। এইসময় থেকে নজরুলের নিজের সাহিত্য রচনায় সৌন্দর্যের সঙ্গে প্রাণ প্রাচুর্যের ছাপ দেখা দেয়। মূল ফারসি থেকে ওমর খৈয়াম অনুবাদ করলেন। ১৩২৬ সালে কোলকাতায় প্রকাশিত হল ‘হেনা’ গল্প। প্রথম পত্র-উপন্যাস ‘বাধনহারা’ প্রকাশিত হল মোসলেম ভারতে বাঙালি পাঠক এক বড়ো সাহিত্যিকের খোঁজ পেল।

নিজের সঙ্গে আনা কয়েকটি কবিতার বই-এর পাতা ওলটান, কিন্তু মন ভরে না, মহৎ কবিতার পাশেই এমন কিছু কবিতা দেখে মন খারাপ হয়ে যায়। যেমন দীনেন্দ্রলাল রায়ে পড়েন—

“গাও ভাসি সকলে মুখের সাগরে

বৃটন মহিমা প্রফুল্ল অন্তরে।

সত্যেন দত্ততে পড়লেন—

“রাজ্যসুখে বিরাজ করলে আমরা তাকে মান্য করি

কালো-গোরা দুই প্রজা তারী দুইয়ে চালায় রাজ্য তরী”।।

নজরুল লিখলেন—

“পরের মুলুক লুঠেরের খায় ডাকাত তারা ডাকাত

তাই তাদের তরে বরাদ্দ ভাই—আঘাত শুধু আঘাত।”

নজরুল হাতে তুলে নিলেন রবীন্দ্রনাথ, চমকের পর চমক। এক একটি কবিতা নজরুলকে চুম্বকের মতো আটকে রাখতে লাগলো। কবিতা মুখস্থ করে করে নজরুলের বিনিদ্র রাত কাটে। কখনো প্রচন্ড আনন্দে মহাকবির সঙ্গী হন, আবার কখনো প্রচণ্ড দুঃখে কবির সঙ্গী হন। কোথায় যেন মনেপ্রাণে একই সুরের একতারা বাজে। গুরু বলে মানতে চায় মন। নিজের মানসিক ছায়া পড়ে মহাকবির লাইনে লাইনে—নজরুল আবৃত্তি করেন—

“শুধু বিঘে দুই ছিল মোর ভুঁই আর সবই গেছে ঋণে

বাবু বলিলেন বুঝেছ উপেন এ জমি লইব কিনে।

কহিলাম আমি তুমি ভূস্বামী ভূমির অন্ত নাই

চেয়ে দেখো মোর আছে বড়োজোর মরিবার মত ঠাঁই।”

আঠার বছরের রক্তে দোলা দেয় গুরুর লাইন। নজরুল লিখলেন,—

“লাগেনা কি শুকনো হাড়ে বজ্রজ্বালা তোর।

চোখ বুজে তুই দেখবি রে আয়, করবে চুরি চোর?

বাঁশের লাঠি পাটনি তোর তাও কি হাতে নাই?

না থাকতো দেহের রক্ত, হাড় কটা তোর চাই।

তোর হাঁড়ির ভাতে দিনরাতে যে দসা দেয় হাত

তোর রক্ত শুষে হলো বনিক, হল ধনি জাত

তাদের হাড়ে ঘুন ধরাবে তোদের এই হাড়

তোর পাঁজরার এই হাড় হবে ভাই যুদ্ধের তলোয়ার।”

রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনে নজরুল লিখেছিলেন,—

“রবি দেখে পেয়েছে যে আলোক প্রথম

তারই মাঝে লভে রবি প্রথম জনম।

নিরক্ষর ও নিস্তেজ বাউলায়

অন্বয় অব্যয় রবি সেই দিন

সহস্র পরে বাজাবেন তার বীন।”

মানবতাবাদী মহাকবিকে দ্রোনাচার্যের মতো সামনে রেখে নজরুল একলব্যের মতো এগোতে লাগলেন। গুরু লিখেছিলেন,—

“ইহার চেয়ে হতেম যদি আরব বেদুইন…”

শিষ্য লিখলেন,—

“আমি বেদুইন আমি চেঙ্গিস

আমি আপনারে ছাড়া করিনা কাহারে কুর্নিস।”

তারপর দীর্ঘ কবিতা—

“বল বীর

বল উন্নত মম শির

শির নিহারীয়া নত শির ওই শিখর হিমাদ্রির

বল বীর।”

পত্রিকায় প্রকাশ হওয়া মাত্র হাজার হাজার কপি নিঃশেষ। অন্য পত্রিকা এগিয়ে এলো প্রকাশের দায়িত্ব নিয়ে। বাংলার পাঠককুল কবি নজরুলকে অচ্ছেদ্য বাঁধনে আপন করে নিল। প্রিয় বন্ধুদের ভিতর মুজঃফ্ফর আহমেদ। কবিকে নিজেদের মেসবাড়িতে নিয়ে গেলেন সাদরে। পবিত্র গাঙ্গুলী, প্রেমেন্দ্র মিত্র, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, অচিন্ত্য সেনগুপ্ত প্রমুখ বান্ধবকুল মধ্যমনির আসন স্থির করে দিলেন। সত্যেন দত্তের মতো রবিমণ্ডলীর গ্রহ নিজে এসে জানিয়ে গেলেন,—রবীন্দ্রনাথ গল্প, কবিতা পাঠে মুগ্ধ আর্শীবাদ জানিয়েছেন। পবিত্র মজা করে লিখেছেন,—“চিরচঞ্চল, হুল্লোড়বাজ, রবীন্দ্রনাথ কবিতা পড়ে খুশী হয়েছেন জেনে, কয়েক মিনিট ভ্যাবলা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।”

জীবনের বহু প্রতিক্ষিত আনন্দের দিন সমাগত কবি নজরুলের জীবনে। বহুদিন বহু বিনিদ্র রজনী তার দ্রোনাচার্য্যকে সামনে রেখে মানবতায়, অগ্রসর হয়েছেন, জাতের নামে যারা বজ্জাতি করে, তাদের আঘাত করার জন্যে শান্তি সঞ্চয় করেছেন। সারস্বত চর্চায় বুঝি সদয় হয়েছেন স্বয়ং দেবী সরস্বতীর আশীর্বাদে আহবান এসেছে তার বর পুত্রের কাছে থেকে। এখন থেকে “ভারা ভারা ধান কাটা” শুরু হবে বাংলা সাহিত্যে। রবির কিরনে অদম্য যৌবনের দূত বিদ্রোহী হয়ে উঠবে। রবীন্দ্রনাথের ছাত্রকবি নিশিকান্ত রায়চৌধুরী লিখেছেন “একদিন আমাদের বাড়িতে দাদা সুধাকান্ত তার বন্ধুবান্ধবদের বলছেন হাবিলদার কবি নজরুল ইসলাম আজ সন্ধ্যায় গুরুদেবের সঙ্গে দেখা করতে আসবেন…. কলাভবনের দোতলায় আসর সাজিয়ে কবিগুরু বসে আছেন। পাশে দুজন আগন্তুক সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। একপাশে শহিদুল্লা অপর পাশে নজরুল ইসলাম। শহিদুল্লা বলছিলেন ট্রেনে আসতে আসতে কাজী সাহেব আপনার গীতাঞ্জলীর সবকটা গান আমাকে গেয়ে শুনিয়েছেন। কবিগুরু বললেন অদ্ভূত শক্তি তোমার। গীতাঞ্জলীর সব গান তো আমারই মনে থাকে না। কাজী সাহেব বললেন, গুরুদেব আমি আপনার কণ্ঠে একটি গান আর কবিতা আবৃত্তি শুনতে চাই। গুরুদেব বললেন, সে কি আমি যে তোমার গান আবৃত্তি শুনব বলে প্রতীক্ষা করে বসে আছি। তাড়াতাড়ি শুরু করে দাও।” নজরুল দ্বিরুক্তি না করে আবৃত্তি করলেন আগমণী কবিতাটি। “আসর পেতে আর আবৃত্তির জন্য প্রতীক্ষা করে” আছেন পৃথিবীখ্যাত ব্যক্তিত্ব এটা ঐতিহাসিক সংবাদ। এমন সম্ভাষণ একমাত্র রবীন্দ্রনাথের পক্ষেই সম্ভব। এক মহাকবি উনিশ বছরের কবিকে মধুর স্নেহে চিরদিনের জন্য কাছে টেনে নিলেন। বলেছিলেন তুমিও আমাদের পাশের বর্ধমানের ছেলে। সময় পেলেই শান্তিনিকেতনে চলে আসবে। তুমি এলে ছেলেরা আরও স্বাস্থ্য সচেতন হবে।

আশৈশব নজরুলের স্বপ্ন, বন্ধুরা মিলে একটা কাগজ বার করবার। কিন্তু না আছে কোন বড়ো মানুষের সঙ্গে পরিচয় না আছে অর্থবল। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচয় হওয়া অবধি সৃষ্টিশীল কাজের জন্য প্রচণ্ড বাসনা জেগেছে। কাগজ বের হবে, নামও ঠিক হলো ধুমকেতু। কিন্তু রবির আশীর্বাদ ছাড়া ধুমকেতু দৃষ্টিগোচরই হবে না যে। অগত্যা শান্তিনিকেতনে লোক ছুটলো। মুজঃফফর, পবিত্র, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ, নলিনীকান্ত (ইনি ব্যস্ত বন্ধু সুভাষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন), হুমায়ুন কবীর উচ্ছ্বসিত উদ্বাহ। কবিগুরুর আশীর্বাদ এসে গেছে। স্থির হল প্রতিটি সংখ্যায় ছাপা হবে এই আশীর্বচন—

“কাজী নজরুল ইসলাম

কল্যাণীয়েষু—

আয় চলে আয়রে ধূমকেতু

আধারে বাধ অগ্নিসেতু

দুর্দিনের এই দুর্গ শিরে উড়িয়ে দে তোর বিজয়কেতন।

অলক্ষণের তিলক রেখা

রাতের ভালে হোক না লেখা

জাগিয়ে দেরে চমক মেরে। আছে যারা অর্ধচেতন।”

রবির পরশের পর তাঁর স্নেহের কবি নজরুল ধূমকেতুর প্রথম সংখ্যাতেই অগ্নিসংযোগ করে লিখলেন—“স্বরাজ-টরাজ কিছু বুঝি না, ভারতের অণু পরিমাণ জমি বিদেশীর অধিকারে থাকবে না।” ইতিপূর্বে এমন কথা বলার জন্য একজন কংগ্রেসী কর্মীকে সরকার জেলে আটকে রাখে। ১৯২৪ সালে কবি নজরুল কুমিল্লার কান্দিগ্রামে যান। সেখানে বন্ধু বীরেন্দ্র সেনগুপ্তের মার কাছে। নিজের মা জাহ্নদা খাতুন-এর মতই স্নেহ ভালোবাসা পেতেন। এই পরিবার ছিল স্বাদেশিকতা, সাহিত্য রবীন্দ্রসঙ্গীতের আবহাওয়ায় গড়া। নজরুলের মত কবি মানুষের ইপ্সিত স্থান। এই বাড়িতে কাকে বীরেন্দ্রর পিতৃহীনা তুত-বোন আশালতা। এই তেজী মেয়ে সুভাষের ডাকে স্কুল ত্যাগ করেছে। সুন্দর রবীন্দ্রসংগীত সাধনা করে। আবার ভালো কবিতা লেখার হাত। গানে এবং কবিতায় নজরুল সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। এই পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থায়ী করবার জন্য নজরুল আশালতাকে বিবাহের প্রস্তাব দিতে চান, কিন্তু পৃথক ধর্মে এমন সম্পর্ক গড়ার সংবাদে কুমিল্লা-কলকাতা তোলপাড় হয়ে যাবে। নজরুলের মনে পড়ল রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে হিন্দু মুসলমানের মিলন নিয়ে আলোচনা। মিলনের কথায় রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন যে ল্যাজ বাইরে থাকে তাকে কেটে বাদ দেওয়া যায়। কিন্তু ভিতরের অংশকে ভিতর থেকেই বাদ দিতে হবে। নজরুলের সব চিন্তা ভাবনায় রবির কিরন ফেললো। মনে মনে কবি নজরুল ভাবছেন তার গুরুদেব কবি রবীন্দ্রনাথ যেন বলছেন এবার তোমায় মনুষ্যত্বের পরীক্ষা। নজরুল ইসলাম হিন্দু-মুসলমানের মিলনের অঙ্গীকারে আশালতাকে ধর্মান্তরিত না করেই বিবাহ করলেন। আশীর্বাদ এল কবির কাছ থেকে। নীরদ চৌধুরী, মোহিতলাল, শনিবারের চিঠির সজনীকান্তদের সব আক্রমণ নির্বিষ হয়ে গেল।

রবীন্দ্র সহচর কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের প্রয়াণ সভা রামমোহন লাইব্রেরীর সামনের সারিতে শনিবারের চিঠির দল দখল করে বসে আছেন। রবীন্দ্রনাথ মঞ্চে উঠে সভাপতির আসনের দিকে এগোতে, নজরুলকে দেখে ইশারায় তাঁর কাছে বসতে বললেন। সঙ্গে সঙ্গে সামনের সারি থেকে হিস হিস শব্দ। নজরুলের মত কবি মহতি সভায় রবীন্দ্রনাথের পাশে বসায় তাঁদের আপত্তি। রবীন্দ্রনাথ ভাষণে প্রয়াত সত্যেন্দ্রনাথের বহু প্রশংসা করে নজরুলকে ডাকলেন। নজরুল অসত্য রহিল পড়িয়া মৃত্যু যে গেল চলে। আবৃত্তি করলেন। রবীন্দ্রনাথ নিবিষ্টমনে শুনছিলেন কবিতার পর গান—

“আষাঢ় মেঘের কালো কাকনেয় সাড়া হল মুখখানি ঢাকি

আহা কে তুমি জননী, কার নাম ধরে বারে বারে যাও ডাকি।”

সভাশেষে নজরুলের কাঁধে হাত রেখে কথা বলতে বলতে গাড়িতে উঠলেন রবীন্দ্রনাথ।

রবীন্দ্রনাথ পাঠে অক্লান্ত নজরুল পাঠ করেছেন—

“আজি এ প্রভাতে রবির কর

কেমনে পশিল প্রাণের পর

কেমনে পশিল গুহায় আধারে প্রভাত পাখীর গান

না জানি কেনরে এতদিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ।”

কবি নজরুল লিখলেন—

“আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে

মোর মুখ হাসে মোর চোখ হাসে, মোর টগবগিয়ে খুন হাসে

আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে।”

কবি নজরুল দুঃখ করে লিখেছিলেন, “নেই কিরে কেউ শক্তি সেবক শহিদ হবে মরে/চরণ তলে দুয়ারে মরণ ভয়কে হরণ করে।” বিস্মিত নজরুল তাঁর গুরুর লেখা পাঠ করলেন। সারা বাংলাদেশকে যেন আলোকে উদ্ভাসিত করে রেখেছেন—“বাংলাদেশের যুবকদের মধ্যে যেমন দুঃসাহসিক অধ্যাবসায়ের পরিচয় পাই তার মূলে আছে বিবেকানন্দের বাণী যা মানুষের আত্মাকে ডেকেছে। আঙ্গুলকে নয়।” আবার পাঠ করেন—“যাহারা ধরা পড়িয়াছে। নিয়ম রাজদণ্ড—যাহাদের পরে উদ্যোত হইয়া উঠিয়াছে, আর কিছু বিচার না করিয়া কেবলমাত্র বিপদ ঘটাইয়াছে বলিয়া তাহাদের প্রতি তীব্রতা প্রকাশ করাও কাপুরুষতা।”

এই সময়ে বন্ধু সুভাষচন্দ্র, বারীণ ঘোষদের সঙ্গে কবি নজরুল মাতৃভূমিকে শৃঙ্খলমুক্ত করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এক একটি কবিতা তখন বোমার মতো আছড়ে পড়ছে ব্রিটিশ সিংহের উপর।

মাতৃমুক্তির জন্য লিখলেন—আর কতকাল থাকবি বউ মাটির ঢেলার মুক্তি আড়াল। স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাড়াল। দেব শিশুদের মারছে চাবুক বীর যুবাদের দিচ্ছে ফাঁসি। ভূভারত আজ কশাইখানা। আসবি কখন সর্বগ্রাসী। ভারতবর্ষে প্রথম ঘটনা। কবিতার ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত ইংরেজ সরকার বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে জেলে আটকে নিশ্চিন্ত হতে চাইল। সঙ্গে সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ এগিয়ে এলেন। নজরুলের অনশনের সংবাদে সারা ভারতের সঙ্গে উদ্বেলিত রবীন্দ্রনাথ টেলিগ্রাম পাঠালেন—গেভ আপ হাঙ্গার স্ট্রাইক আওয়ার লিটারেচার ক্লেইমস ইউ।

নজরুল বন্ধু পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়কে ডেকে তাঁর হাতে তুলে দিলেন নজরুলের নামে উৎসর্গ করা নাটক “বসন্ত” বললেন তাকে বলো আমার নিজেরই যাবার ইচ্ছে ছিল।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*