‘কারাগারে রোজনামচা’ বাংলা পূর্ণ জন্ম লাভের দলিল

সুইটি রানী বনিক

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলা একাডেমি প্রকাশ করেছে তাঁর রচিত নতুন গ্রন্থ ‘কারাগারের রোজনামচা’। ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৮ কালপর্বের কারাস্মৃতি এ গ্রন্থটিতে স্থান পেয়েছে। এটি মূলত বঙ্গবন্ধুর লেখা একটি ডায়েরির গ্রন্থরূপ।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ, প্রথম সেনাবাহিনী তাঁকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়। সামরিক আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয়ের পর ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তান সরকার বৈশ্বিক চাপের মুখে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেয়!

****মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বহুদিন কারাগারে বন্দী ছিলেন। সদ্য স্বাধীন পাকিস্তানে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ তিনি প্রথম গ্রেফতার হন। তারপর থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ২১ বছর সময়কালে বহুবার তাকে কারাগারে যেতে হয়। ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তিলাভের পর আর তাঁকে বেশ কিছুদিন কারাগারে যেতে হয়নি। তবে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে আবার তাঁকে আটক করা হয় ও পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে মিয়ানওয়ালি জেলে আটক রাখা হয়। সেও অবশ্য কারাজীবনই।

তিনি বলেন,

‘জেলে যারা যায় নাই, জেল যারা খাটে নাই তারা জানে না জেল কী জিনিস। বাইরে থেকে মানুষের যে ধারণা জেল সম্বন্ধে ভিতরে তার একদম উল্টা।… জেলের ভিতর অনেক ছোট ছোট জেল আছে’।

কারাগারে রাজনৈতিক বন্দী হিসেবেই তিনি আটক থেকেছেন। তার মধ্যেই দু-একবার বক্তৃতা দেয়া বা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার মামলায় তাঁকে বিনাশ্রম কারাদন্ড দেয়া হয়েছে। একবার কয়েদি হিসেবে ফরিদপুর জেলে থাকার সময় তাকে সুতা কাটতে হয়েছে। বড় কথা হলো, বারবার আটক হয়ে দীর্ঘকাল জেলে কাটানোর কারণে জেল জীবন, কয়েদিদের বিভিন্ন ঘটনা, জেলের ভেতরের অন্যায়, অনিয়মসহ বহু বিষয় তিনি দেখেছেন, জেনেছেন। তার অনেক কিছু তিনি টুকরো টুকরোভাবে ‘কারাগারের রোজনামচা’য় তুলে ধরেছেন। সেই সাথে দেশ নিয়ে, জনগণ নিয়ে, আন্দোলন নিয়ে তাঁর চিন্তা-ভাবনা তো আছেই।

*** ‘কারাগারের রোজনামচা’

২ জুন, ১৯৬৬ থেকে ২২ জুন ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত লেখা দিনলিপি। তখনো তিনি ‘শেখ মুজিবুর রহমান। উল্লেখ্য, ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আয়োজিত সংবর্ধনা সভায় তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

*** রোজনামচায় তিনি যা লিখেছেন সেসব ঘটনা বা বিষয়গুলো হয়তো স্বাভাবিক বা সাধারণ, কিন্তু তাঁর বর্ণনাগুণে তা আর সাধারণ থাকেনি, অসাধারণ হয়ে উঠেছে। মূলত এর মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর বর্ণাঢ্য জীবনেরই প্রতিফলন ঘটেছে যা তাঁকে ঘনিষ্ঠভাবে চিনতে ও জানতে সাহায্য করে।

এ গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, প্রথম দিকে তাঁর জেল জীবন সব সময় তেমন ভালো কাটেনি। দীর্ঘ সময় ‘সলিটারি কনফাইনমেন্ট’ হিসেবে তাঁকে একটি কক্ষে একা থাকতে হয়েছে। খবরের কাগজ ও বই ছিল তাঁর সাথী। জেলখানায় তাঁকে সুতা কাটার কাজও করতে হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, ১৯৪৯ সাল থেকে ১৯৫০ সালে ঢাকায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গের জন্য একটা মামলা চলে। তাতে শামসুল হক, মওলানা ভাসানী ও তাঁকেসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়। সে মামলায় তাঁকে সশ্রম কারাদন্ড দেয়া হয়। তিনি একই সাথে হন রাজনৈতিক বন্দী ও কয়েদি। তাঁকে পাঠিয়ে দেয়া হয় ফরিদপুর জেলে।

বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘আমাকে ফরিদপুর জেলায় আনার পর কাজ দেয়া হলো, সুতা কাটা, কারণ এখন আর আমি রাজবন্দী নই, কয়েদি। সুতা কাটতে হতো। আর কয়েদির কাপড় পরতে হতো।’ তিন মাস এ সাজা খেটে আবার তিনি রাজনৈতিক বন্দী হয়ে যান।

*** কারাগারে দুর্ভাগ্যের শিকার কয়েদিদের কিছু কিছু কথা তিনি বলেছেন। বঙ্গবন্ধুর কথায় আমরা জানতে পারি, জেলে ঘানি টানার ব্যবস্থা চালু ছিল ব্রিটিশ আমল থেকে। জেলে কেউ মেজাজ দেখালে তাকে আইন দফায় সাজা দেয়া হতো। তিনি লিখেছেন, ‘এদের গরুর মতো ঘানিতে ঘুরতে হতো, আর একটা পরিমাণ ছিল, সেই পরিমাণ তেল ভেঙে বের করতে হতো। পেছনে আবার পাহারা থাকত, যদি আস্তে হাঁটত অমনি পিটান!

‘কারাগারের রোজনামচা’য় তাঁর জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাজাত কিছু পর্যবেক্ষণ আপ্তবাক্যের রূপ লাভ করেছে। তিনি বলেছেন, ‘জেল দিয়ে লোকের চরিত্র ভালো হয়েছে বলে আমি জানি না।’

তিনি আরো বলেছেন, ‘তবে রাজনীতি করতে হলে নীতি থাকতে হয়।

*** তিনি বলেছেন, ‘রক্তের পরিবর্তে রক্তই দিতে হয়। এ কথা ভুললে ভুল হবে। মতের বা পথের মিল না হতে পারে, তার জন্য ষড়যন্ত্র করে বিরুদ্ধ দলের বা মতের লোককে হত্যা করতে হবে, এ বড় ভয়াবহ রাস্তা। এ পাপের ফল অনেককেই ভোগ করতে হয়েছে।’

***এ রোজনামচায় বারবার শেখ মুজিবুর রহমান তার স্বরূপে, স্ববৈশিষ্ট্যে আত্মপ্রকাশ করেছেন।

একটি উদাহরণ :

মনে পড়ল আমার বৃদ্ধ বাবা-মা’র কথা। বেরিয়ে কি তাঁদের দেখতে পাব? তাঁদের শরীরও ভালো না। বাবা বুড়ো হয়ে গেছেন। তাঁদের পক্ষে আমাকে দেখতে আসা খুবই কষ্টকর। খোদার কাছে শুধু বললাম, ‘খোদা তুমি তাঁদের বাঁচিয়ে রেখ, সুস্থ রেখ।’

*** খাঁচায়ও পাখি থাকতে চায় না। বন্দি জীবন পশুপাখিও মানতে চায় না। আমরা মানুষ, আমাদের মানতে কি ইচ্ছা হয়! মোহাম্মদউল্লাহ সাহেবের কথা ভাবতে ভাবতে অনেক কথা আজ মনে পড়ল। যুগে যুগে যারা আদর্শের জন্য জীবন দিয়েছে তাড়া নিশ্চয়ই ক্ষমতা দখলের জন্য করে নাই। একটা নীতি ও আদর্শের জন্যই ত্যাদ স্বীকার করে গেছে। কত মায়ের বুক খালি হয়েছে, কত বোনকে বিধবা করেছে, কত লোককে হত্যা করা হয়েছে, কত সংসার ধ্বংস হয়েছে। কারণ তো নিশ্চয়ই আছে, যারা এই অত্যাচার করে তাড়া কিন্তু নিজ স্বার্থের বা গোষ্টী স্বার্থের জন্যই করে থাকে। সকলেই তো জানে একদিন মরতে হবে। তবুও মানুষ অন্ধ হয়ে যায় স্বার্থের জন্য। হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। পরের ছেলেকে যখন হত্যা করে, নিজের ছেলের কথাটি মনে পড়ে না। মানুষ জাতি স্বার্থের জন্য অন্ধ হয়ে যায়।পাকিস্তানের ১৯ বৎসরে যা দেখলাম তা ভাবতেও শিহরিয়া উঠতে হয়। যেই ক্ষমতায় আসে সেই মনে করে সে একলাই দেশের কথা চিন্তা করে, আর সকলেই রাষ্ট্রদ্রোহী, দেশদ্রোহী আরও কত কি! মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কারাগারে বন্দি রেখে অনেক দেশনেতাকে শেষ করে দিয়েছে। তাঁদের স্বাস্থ্য নষ্ট করে দিয়েছে, সংসার ধ্বংস হয়ে গেছে। আর কতকাল এই অত্যাচার চলবে কেই বা জানে! এইতো স্বাধীনতা, এই তো মানবাধিকার! অনেকক্ষণ চিন্তা করলাম বসে বসে। মনে হয়, এ পথ ছেড়ে দেই, এত অত্যাচার নীরবে সহ্য করব কি করে? বিবেক যে দংশন করে। বয়স হয়েছে, শরীর তো খারাপই হতে থাকবে। স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে পারব কি না? মনকে সান্ত্বনা দেই এই কথা ভেবে, আর কতদিনই বা বাঁচব? চলুক না।

এই দেশের মানুষের জন্য কিছু যদি নাও করতে পারি, ত্যাগ যে করতে পারলাম এটাই তো শান্তি। ব্যথাটা অনেক সেরে গেছে। আস্তে আস্তে হাঁটাচলা করতেও আরম্ভ করেছি।

*** ভারত কাশ্মীর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ভারত, গণতন্ত্রের পথে যেতে রাজি হয় না কেন?’ কারণ, তাড়া জানে গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরের জনগণের মতামত নিলে ভারতের পক্ষে কাশ্মীরের লোক ভোট দিবে না। তাই জুলুম করেই দখল রাখতে হবে।দুই দেশের সরকার কাশ্মীরের একটা শান্তিপূর্ণ ফয়সালা না করে দুই দেশের জোঙ্গণের ক্ষতিই করছেন। দুই দেশের মধ্যে শান্তি কায়েম হলে, সামরিক বিভাগে বেশি টাকা খরচ না করে দেশের উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করা যেত। তাতে দুই দেশের জনগণই উপকৃত হতো। আমার মনে হয়, ভারতের একগুঁয়েমিই দায়ী শান্তি না হওয়ার জন্য

*** ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে যা লিখেছেন, ‘৮ই ফাল্গুনআজ অমর একুশে ফেব্রুয়ারি। ঠিক পনের বছর আগে সেদিন ছিল বাংলা ১৩৫৮ সালের ৮ই ফাল্গুন, বৃহষ্পতিবার, ইংরেজি ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করার জন্য শহীদ হয়েছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের কয়েকজন বীর সন্তান: ১। আব্দুস সালাম, ২। আবদুল জব্বার, ৩। আবুল বরকত, ৪। রফিকউদ্দিন। আহত হয়েছিলেন অনেকেই। ঠিক পনের বৎসর পূর্বে এইদিনে আমিও জেলে রাজবন্দি ছিলাম ফরিদপুর জেলে। ১৬ই ফেব্রুয়ারি থেকে অনশন ধর্মঘট করি। জানুয়ারি মাসে আমাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়। সেখানেই ছাত্র নেতৃবৃন্দের সাথে পরামর্শ করে ১৬ই ফেব্রুয়ারি অনশন করব আর ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলা দিবস পালন করা হবে বলে স্থির হয়। আমাকে আবার জেল হাসপাতালে নিয়ে আসা হলো চিকিৎসা না করে। ১৫ই ফেব্রুয়ারি আমাকে ও মহিউদ্দিনকে ফরিদপুর জেলে চালান দেওয়া হলো। মহিউদ্দিনও আমার সাথে অনশন করবে স্থির করে দরখাস্ত দিয়েছিল। আজ ঠিক পনের বৎসর পরেও এই দিনটিতে আমি কারাগারে বন্দি।প্রথম ভাষা আন্দোলন শুরু হয় ১১ই মার্চ ১৯৪৮ সালে। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ (এখন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ) ও তমদ্দুন মজলিসের নেতৃত্বে। ঐদিন ১০টায় আমি, জনাব শামসুল হক সাহেব সহ প্রায় ৭৫ জন ছাত্র গ্রেপ্তার হই এবং আব্দুল ওয়াদুদ-সহ অনেকেই ভীষণভাবে আহত হয়ে গ্রেপ্তার হয়। ১৫ই মার্চ জনাব নাজিমুদ্দীন (তখন পূর্ব পাকিস্তানের চীফ মিনিস্টার ছিলেন) সংগ্রাম পরিষদের সাথে আলাপ করে ঘোষণা করলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তান আইন সভা হতে প্রস্তাব পাশ করাইবেন বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করতে’। সকল বন্দিকে মুক্তি দিবেন এবং নিজেই পুলিশের অত্যাচারের তদন্ত করবেন। ঐদিন সন্ধ্যায় আমরা মুক্তি পাই’।

*** ৬ দফা দাবি কেন সরকারের মেনে নেওয়া উচিৎ তাঁর উপরই বক্তৃতা করেছিলাম। পূর্ব পাকিস্তানকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়া দরকার। দেশরক্ষা শক্তিশালী করা প্রয়োজন। গত পাক-ভারত যুদ্ধের সময় পূর্ব বাংলার সাথে পশ্চিম পাকিস্তানের বিশেষ করে কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো যোগাযোগ ছিল না।

২৬ সেল হাসপাতাল থেকে বন্ধু খোন্দকার মোশতাক আহমদও আমাকে ফুল পাঠাইয়াছিল। আমি ২৬ সেল থেকে নতুন বিশ সেলে হাজী দানেশ, সৈয়দ আলতাফ হোসেন, হাতেম আলি খান, সিরাজুল হোসেন খান ও মৌলানা সৈয়েদুর রহমান সাহেব, ১০ সেলে রফিক সাহেব, মিজানুর রহমান, মোল্লা জালালউদ্দিন, আবদুল মোমিন, ওবায়দুর রহমান, মহিউদ্দিন, সুলতান, সিরাজ এবং হাসপাতালে খোন্দকার মোশতাক সাহেবকে ফুল পাঠাইলাম নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে। শুধু পাঠাতে পারলাম না পুরানা হাজতে, যেখানে রণেশ দাশগুপ্ত, শেখ ফজলুল হক (মণি)-আমার ভাগনে, হালিম, আব্দুল মান্নান ও অন্যরা থাকে-এবং ১/২ খাতায় যেখানে শ্রমিক নেতারা, ওয়াপদার কর্মচারী ও কয়েকজন ছাত্র থাকে। তাঁদের মুখে খবর পাঠাইলাম আমার শুভেচ্ছা দিয়ে। জেলের ভিতর অনেক ছোট ছোট জেল; কারও সাথে কারও দেখা হয়না-বিশেষ করে রাজনৈতিক বন্দিদের বিভিন্ন জায়গায় রাখা হয়েছে। এরা তো ‘রাষ্ট্রের শত্রু’! বিকালে পুরানা বিশ সেলের সামনে নূরে আলম সিদ্দিকী, নূরুল ইসলাম ও হানিফ খান কম্বল বিছাইয়া এক জলসার বন্দোবস্ত করেছে। বাবু চিত্তরঞ্জন সুতার, শুধাংশু বিমল দত্ত, শাহ মোয়াজ্জেম আরও কয়েকজন ডিপিআর ও কয়েদি, বন্দি জমা হয়ে বসেছে। আমাকে যেতেই হবে সেখানে, আমার যাবার হুকুম নাই তবু আইন ভঙ্গ করে কিছু সময়ের জন্য বসলাম। কয়েকটা গান হলো, একজন সাধারণ কয়েদিও কয়েকটা গান করলো। চমৎকার গাইল।

লাহোর প্রস্তাবে যে কথাগুলি ছিল আমি তুলে দিলাম-‘নিখিল ভারত মুসলিম লীগ তথা এ দেশের কয়েক কোটি মুসলমান দাবি করিতেছে যে সব এলাকা একান্তভাবেই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ, যেমন উত্তর পশ্চিম সীমান্ত এলাকা এবং ভারতের পূর্বাঞ্চল, প্রয়োজন অনুযায়ী সীমানার বদল করিয়া ঐ সকল এলাকাতে ভৌগোলিক দিক দিয়া এরূপভাবে পূনর্গঠিত করা হউক যাহাতে উহারা স্বাধীন ও স্বতন্ত্র স্টেটস-এর রূপ পরিগ্রহণ করিয়া সংশ্লিষ্ট ইউনিটদ্বয় সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌমত্বের মর্যাদা লাভ করিতে পারে। এই লাহোর প্রস্তাবের কথা বললে আজ অনেক তথাকথিত নেতারা ক্ষেপে যান এবং আমাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে শুধু গালি দেন বা কারাগারেও বৎসরের পর বৎসর বন্দি করে রাখেন। যে দিন লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র গঠন করা যাব সেইদিনই শেরে বাংলার প্রতি শ্রদ্ধা দেখান হবে এবং তার আত্মা শান্তি পাবে।

‘কারাগারে রোজনামচা’ লেখার সময় কালঃ

*** ১৯৬৮ সালের ১৭ জানুয়ারি রাত ১২ টার পর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দেয়া হয়। কারাগারের গেইট থেকে বাইরে এলে সেনাবাহিনীর লোকজন তাঁকে পুনরায় গ্রেপ্তার করে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে বন্দি করে রাখে। এসময় বাঙালির প্রাণপ্রিয় নেতা শেখ মুজিবের কোনো সংবাদ বাইরে প্রকাশ না হওয়ায় তিনি বেঁচে আছেন কিনা জনগণের মনে সে বিষয়ে সন্দেহ, সংশয় ও উদ্বেগ দেখা দেয়।তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৪ ডিভিশন হেডকোয়ার্টার কুর্মিটোলা অফিসার মেসের ১০ নং কক্ষে তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বন্দি অবস্থায় এই স্মৃতিকথা লেখা হয( কারাগারে রোজনামচা)!

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অবাঙালি সদস্যরা তাঁকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ও সর্বোচ্চ সতর্ক পাহারায় রেখেছিল।পাঁচ মাস পর দুঃসহ বন্দি জীবনযাপনের সময় এই খাতাটি বেগম মুজিব তাঁকে পাঠিয়েছিলেন। রয়েল স্টেশনারি সাপ্লাই হাউজের ৩২০ পৃষ্ঠার রুল টানা খাতাটির মাত্র ৫২ পৃষ্ঠা লেখার তিনি সুযোগ পান।

*** জেল জীবনের আরো কিছু স্মৃতি চারন—

পাঁচ-ছয়টি কাগজ পড়ার সুযোগ ছিল তখন তাঁর। তিনি পড়তেন ইত্তেফাক, সংবাদ, আজাদ, অবজারভার, মর্নিং নিউজ আর ডন।

*** এর বাইরে তিনি সাহিত্যও পড়তেন। যেমন শহীদুল্লাহ কায়সারের বিখ্যাত উপন্যাস ‘সংশপ্তক’। আবার পড়তেন ইংরেজি উপন্যাসও। তাঁর লেখায় আমরা জানতে পারি সে কথা—‘‘ঘরে এসে বই পড়তে আরম্ভ করলাম। এমিল জোলার লেখা ‘তেরেসা রেকুইন’ (ঞযবৎবংব জধয়ঁরহব) পড়ছিলাম। সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনটা চরিত্র- জোলা তাঁর লেখার ভেতর দিয়ে। এই বইয়ের মধ্যে কাটাইয়া দিলাম দুই-তিন ঘণ্টা সময়—

‘এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, তিনি জেলখানার লাইব্রেরি থেকে বই এনে পড়তেন। আবার তাঁর নিজের কিছু বইও ছিল।

১৯৬৬ সালের ১৮ জুনের রোজনামচায় বঙ্গবন্ধু তাঁর জেল-জীবনের একটি মূল্যবান তথ্য দিয়েছেন। তাঁর কথায় আমরা জানতে পারি : ‘রাত কেটে গেল। এমনি অনেক রাত কেটে গেছে আমার। প্রায় ছয় বছর জেলে কাটিয়েছি। বোধহয় দুই হাজার রাতের কম হবে না, বেশি হতে পারে। আরো কত রাত কাটবে কে জানে?’ অর্থাৎ ১৯৪৯ থেকে ১৯৬৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত তাঁর কারাজীবনের একটি হিসাব তিনি দিয়েছেন এখানে।

জেলখানার মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা-সহমর্মিতার অনেক ঘটনার কথা জানা যায় তাঁর লেখায়। তিনি লিখেছেন, ‘২৬ সেল থেকে আমার জন্য কুমড়ার ডগা, ঝিঙ্গা, কাঁকরোল পাঠিয়েছেন। তাদের বাগানে হয়েছে। আমাকে রেখে খায় কেমন করে! আমার কাছে পাঠাতে হলে পাঁচটি সেল অতিক্রম করে আসতে হয়, দূরও কম না। বোধহয় বলে-কয়ে পাঠিয়েছেন। তারা যে আমার কথা মনে করেন আর আমার কথা চিন্তা করেন, এতেই মনটা আনন্দে ভরে গেল।

এরা ত্যাগী রাজবন্দী দেশের জন্য বহু কিছু ত্যাগ করেছেন। জীবনের সবকিছু দিয়ে গেলেন এই নিষ্ঠুর কারাগারে। আমি তাদের সালাম পাঠালাম। তারা জানেন, আমাকে একলা রেখেছে, খুবই কষ্ট হয়, তাই বোধহয় তাদের এই সহানুভূতি।’

*** তিনি রোজনামচায় ৪ জুলাই, ১৯৬৬ তারিখে লিখেছেন, ‘তিন হাজার কয়েদির মধ্যে দুইশ’ কয়েদি মশারি পায়। রাজবন্দী আর যারা ডিভিশন পায় তারাই মশারি পায়।

*** তিনি ১৩ জুলাই, ১৯৬৬ লিখেছেন, ‘ভারতবর্ষে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালাইয়া আটজনকে হত্যা করছে।…. কংগ্রেস নেতারা সারাজীবন জেল খেটেছিলেন। গুলির আঘাত নিজেরাও সহ্য করেছেন। আজ স্বাধীনতা পাওয়ার পরে তারাই আবার জনগণের ওপর গুলি করতে একটুও কার্পণ্য করেন না। আমরা দুইটা রাষ্ট্র পাশাপাশি। অত্যাচার আর গুলি করতে কেউ কারো চেয়ে কম নয়। গুলি করে গ্রেফতার করে সমস্যার সমাধান হবে না। ভারতের উচিত ছিল গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মিরের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার মেনে নিয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তি করে নেয়া। …. ভারত যখন গণতন্ত্রের পূজারী বলে নিজেকে মনে করে তখন কাশ্মিরের জনগণের মতামত নিতে কেন আপত্তি করছে?

এই ছিলেন সেদিনের অকুতোভয় সংগ্রামী নেতা শেখ মুজিবুর রহমান।

সসাম্প্রতিক, বাংলাদেশ দূতাবাস জানায়, নেপালের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন শীর্ষ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান নেপাল একাডেমির সহযোগিতায় দূতাবাস ‘কারাগারের রোজনামচা’ নেপালি ভাষায় অনুবাদ করার উদ্যোগ নিয়েছেন!

*** দীর্ঘ জেল জীবনের চোখের জলের আত্মকথা আর ব্যাথার ইতিহাস, আক্ষেপের আত্মদহন নিরবে লিপিবদ্ধ করেন! তার সমস্ত জীবন সংগ্রামের পথে উৎসর্গ করেন!  নিজের ব্যাক্তিগত সুখ কিংবা পারিবারিক সুখ তিনি ভোগ করতে পারেন নি। এবং তার স্ত্রী ও তার পাশে থেকে সমস্ত জীবন ত্যাগের মধ্যে থেকে ঘর সংসার সমলেছেন। তাকে কোনরূপ ভাবতে হয় নি তার সন্তান ও পরিবার নিয়ে।

আমার নেতা, জাতির নেতার এই আত্মকথা সকলের জানা ও পড়া উচিত, যেন ভবিষ্যতে প্রজন্ম তার রক্তক্ষয়ী জীবন যুদ্ধের কথা জানতে পারে, তার ত্যাগী জীবনের মহিমান্বিত ব্যাথার ইতিহাস যা বাংলার পূরন জনম ঘটিয়েছেন।

মহান নেতার এই (১৫ আগষ্ট) মহাপ্রয়াণ দিনে গভীর শোক ও বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করি!  প্রভু যেন তার শুদ্ধ আত্মার শান্তি প্রেরন করেন!

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*