২১ আগস্টের ‘লাইট স্ন্যাক্স ফর শেখ হাসিনা’ অপারেশন

ড. মিল্টন বিশ্বাস

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের ত্রিশ বছর পরে সেই আগস্ট মাসেই আবারও গণহত্যার ঘটনা ঘটে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের পরিকল্পিত গ্রেনেড হামলা ছিল বিএনপি-জামায়াত জোট তথা খালেদা-নিজামীর নীল নকশা আর জঙ্গীবাদ উত্থানের ভয়ঙ্কর দৃষ্টান্ত। সেদিন বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ প্রায় তিন’শর বেশি নেতা-কর্মী গুরুতর আহত হন; নিহত হন আওয়ামী মহিলা লীগের নেতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতির সহধর্মিণী আইভি রহমানসহ ২৪ জন। বিশ্ব জুড়ে তোলপাড় করা গ্রেনেড হামলার সেই ঘটনার ভয়াবহতা আমাদের হতবাক করে দিয়েছিল। পরের বছর ঠিক একই মাসের ১৭ তারিখে দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে পাঁচ শতাধিক বোমা বিস্ফোরণ ও নিহত মানুষের স্বজনদের আর্তনাদ এবং আহত মানুষের কান্নায় আমাদের মনে ক্ষোভ ও ঘৃণা আরও তীব্র হয়ে উঠেছিল। কিন্তু বোমা হামলার ভয়ঙ্কর ঘটনাগুলো শুরু হয়েছিল তারও আগে থেকে। ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ যশোরের টাউন হল মাঠে উদীচীর সমাবেশে এক বোমা হামলায় নিহত হয় ১০ জন। একই বছর ৮ অক্টোবর খুলনার নিরালা এলাকায় অবস্থিত কাদিয়ানীদের উপাসনালয়ে বোমা বিস্ফোরণে ৮ জন নিহত হয়। ২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি ঢাকার পল্টন ময়দানে সিপিবির মহাসমাবেশে বোমা হামলায় ৬ জন নিহত ও অর্ধশতাধিক আহত হয়। ১৪ এপ্রিল রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ উৎসবে সংঘটিত বোমা বিস্ফোরণে নিহত হয় ১১ জন। ৩ জুন বোমা হামলায় গোপালগঞ্জের বানিয়ারচর গির্জায় সকালের প্রার্থনার সময় নিহত হয় ১০জন; আহত হয় ১৫ জন। সিলেটে একাধিক বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। তবে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এস এম কিবরিয়া নিহত হন গ্রেনেড হামলায়। ২০০৪ সালের ২১ মে হযরত শাহ জালাল(রহ;) মাজার পরিদর্শনে গেলে গ্রেনেড হামলায় আহত হন তৎকালীন ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত আনোয়ার হোসেন; যিনি সিলেটি বাংলাদেশীর সন্তান। এছাড়াও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সমাবেশে, অফিসে, নেতার গাড়িতে, সিনেমা হলে একাধিক বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। উল্লেখ্য, ১৯৯৯ থেকে ২০০৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সারাদেশে বোমা ও গ্রেনেড হামলায় নিহত হয়েছে শতাধিক ব্যক্তি। অথচ ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে বিএনপি-জামাত জোট এ ধরনের তৎপরতা বন্ধে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। হামলা প্রতিরোধ ও জঙ্গী দমনে তৎকালীন সরকারের নিষ্ক্রিয়তা জঙ্গীবাদ উত্থানে সহায়ক হয়ে উঠেছিল; বিচারের রায় ঘোষিত হওয়ায় ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় খালেদা-নিজামী সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা আরও স্পষ্ট হয়েছে।

২.

২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা ছিল বাংলাদেশের মাটিতে সবচেয়ে ন্যক্কারজনক সন্ত্রাসী হামলার একটি। এটি ছিল সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও নৃশংস হামলা, কারণ রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের নির্মূল করার জন্যই এটি চালানো হয়। গ্রেনেড হামলায় আহতদের মধ্যে অনেকেরই জীবন এখনো দুর্বিষহ। তখনকার বিরোধী দলীয় নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেতাদের মানব ঢালের ফলে আক্রমণ থেকে রক্ষা পেলেও, কানে আঘাত পান, যার প্রভাবে আজ পর্যন্ত তিনি ভুগছেন। আসলে শেখ হাসিনাকে হত্যা করে দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে নির্মূল করাই ছিল আক্রমণের মূল লক্ষ্য। হামলাটি চালায় হরকাতুল জিহাদ নামে একটি জঙ্গি সংগঠন (হুজি)। তার সঙ্গে বিএনপির তৎকালীন যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান, সরকারের তৎকালীন মন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, বিএনপির উপ-শিক্ষামন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, জামায়াতে ইসলামের সমাজকল্যাণমন্ত্রী আলী আহসান মুজাহিদ, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিস চৌধুরী, গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই এবং এনএসআইয়ের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা এবং আইন প্রণয়নকারীরাও সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল। এছাড়া, কাশ্মিরভিত্তিক বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন, হিজবুল মুজাহিদিন, তেহরিক জিহাদ-ই ইসলাম, লস্কর-ই-তৈয়বা এবং মিয়ানমার ভিত্তিক রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) সহ বেশ কয়েকটি বিদেশি গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছিল। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশে দুটি জঙ্গীগোষ্ঠীর উত্থান হয়। একটি হচ্ছে কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক হরকাতুল জিহাদ (হুজি), যার নেতৃত্বে ছিল আফগান ফেরত কয়েকযোদ্ধা। অপরটি মধ্যপ্রাচ্যপন্থী জেএমবি। উভয় দলের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব থাকলেও পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের কারণে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করে জামায়াত। শিবিরের সাবেক ক্যাডাররা যুক্ত হয়েছিল এসব দলে। 

চার্জশিট, বাদীদের সাক্ষ্যপ্রমাণ, হরকাতুল জিহাদের (হুজি) প্রধান মুফতি হান্নান এবং খালেদা জিয়ার ভাগ্নে ও তৎকালীন এপিএস-১ সাইফুল ইসলাম ডিউকের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, এটি পরিষ্কার যে এই আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল এরকমÑ খালেদা জিয়ার ছেলে ও বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রধান তারেক রহমান, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করে। এই কাজের জন্য হুজি সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করা হয়। অবশ্য, হুজিদের বিকৃত মতাদর্শের কারণে তাদের খুব বেশি অনুরোধ করতে হয়নি। কারণ ধর্মনিরপেক্ষ নেতৃত্বের জন্য শেখ হাসিনাকে তারা ইসলামের শত্রু বলে বিবেচিত করত। হামলার কয়েকদিন আগেই গুলশানে হাওয়া ভবন নামে পরিচিত তারেক রহমানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে হামলার চূড়ান্ত পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছিলো। অবশ্য ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারি ও জুন মাসে সিঙ্গাপুরে দাউদ ইব্রাহিম এবং আইএসআইয়ের সঙ্গে তারেক রহমানের অনুষ্ঠিত বৈঠকে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনা হয় বলে বিভিন্ন কলাম লেখকের উপস্থাপিত তথ্য থেকে জানা যায়। ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও জঙ্গীগোষ্ঠীকে সহায়তা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে শেখ হাসিনাকে মূল বাধা হিসেবে উল্লেখ করে তারেক রহমান। আর এর পরিপ্রেক্ষিতেই ২১ আগস্ট হামলার পরিকল্পনা করা হয়। জিয়া পরিবারের পাচারকৃত অর্থ বিনিয়োগের জন্য বিদেশে তৈরি দুটি কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমেই ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার অর্থ লেনদেন হয়। আর আর্জেস গ্রেনেডও সংগৃহীত হয় এই অর্থের মাধ্যমে।আর্জেস-৮৪ গ্রেনেড অস্ট্রিয়ায় এবং অস্ট্রিয়ার লাইসেন্সের ভিত্তিতে পাকিস্তানে তৈরি হয়। এ উপমহাদেশে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ছাড়া কেউ এ গ্রেনেড ব্যবহার করে না। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ব্যবহৃত গ্রেনেড হচ্ছে আর্জেস-৭২। ওই আর্জেস-৮৪ গ্রেনেড ভারতে লস্করে তৈয়বা কর্তৃক ১৯৯৩ সালে মুম্বাই হামলায় ব্যবহার করা হয়েছিল। একই গ্রেনেড ব্যবহার করা হয় সিলেট হামলায় ও শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডে।

তারেক রহমান এবং তার অন্যান্য সহযোগীদের সঙ্গে হুজি সন্ত্রাসীরা হাওয়া ভবনে সাক্ষাৎ করে নির্দেশনা নেয় এবং সার্বিক প্রশাসনিক সহায়তা নিশ্চিত করে। এই সহযোগীদের মধ্যে রয়েছেÑ তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিস চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামীর মহাসচিব ও তৎকালীন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, এনএসআই এর মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুর রহিম ও ডিজিএফআই এর পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী। মুফতি হান্নানের স্বীকারোক্তিমূলক বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী মেজর নূর চৌধুরীও সেই হামলার ঘটনায় সক্রিয় অংশগ্রহণকারী ছিল। বঙ্গবন্ধুর আরেক খুনি মেজর ডালিম সেসময় ঢাকায় এসেছিল বলে জানা গেছে। তারেক রহমানের রাজনৈতিক কার্যালয় হাওয়া ভবনে বিএনপির সংসদ সদস্য শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ হুজি আক্রমণকারীদের এবং বিএনপি-জামায়াতের পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে বৈঠকের ব্যবস্থা করে। হাওয়া ভবনে ছাড়াও মোহাম্মদপুরের হুজির আস্তানায় এবং ধানমন্ডিতে বিএনপির উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর বাসভবনে অন্যান্য পরিকল্পনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সময় তাজউদ্দীন নামের একজন হুজি সদস্য হত্যাকারীদের কাছে গ্রেনেড সরবরাহ করে। এই হামলায় আরো একজন অভিযুক্ত আসামি পাকিস্তানী সন্ত্রাসী আবু ইউসুফ এক স্বীকারোক্তিমূলক বিবৃতিতে বলেছে, পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-জিহাদি (টিজেআই) এর নেতা মুজফফর শাহ গ্রেনেডগুলো তাজউদ্দিকে সরবরাহ করে। কিভাবে হুজিরা বিএনপি সরকারের উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুর থেকে সমর্থন নিশ্চিত করেছিল সে বিষয়েও এই ব্যক্তি কথা বলে। গ্রেনেডের উৎস সম্পর্কে আরো জানা যায়, খালেদা জিয়া সরকারের নির্দেশ মোতাবেক পাকিস্তান থেকে কলকাতার জঙ্গী গ্রুপ আসিফ রেজা কমান্ডো কোম্পানির জন্য আনা ৮ প্যাকেট আর্জেস-৮৪ গ্রেনেড থেকে দুটি প্যাকেট রেখে দেয়া হয় বাংলাদেশে ব্যবহারের জন্য। প্রতি প্যাকেটে গ্রেনেড থাকে ২৪টি। তৎকালে উলফা ও আসিফ রেজা কোম্পানির মাধ্যমে ইন্ডিয়ান মুজাহিদীন, লস্করে তৈয়বাসহ বিভিন্ন জঙ্গী সংগঠনের কাছে পাকিস্তান থেকে আনা অস্ত্র সরবরাহ করা হতো।

হামলার একদিন আগে, ২০ আগস্ট হুজি হত্যাকারীরা, কাজল এবং আবু জান্দাল বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে হামলার স্থান পরিদর্শন করে। অপারেশনটির নাম ছিল ‘লাইট স্ন্যাক্স ফর শেখ হাসিনা’ (শেখ হাসিনাকে নাশতা করানো)। ২১ আগস্ট তারা বাড্ডায় একটি পূর্বনির্ধারিত বাড়িতে সাক্ষাৎ করে। সেখানে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে হামলাকারী কাজল ও আবু জান্দালের নেতৃত্বাধীন মোট ১২ জন ওই ঘটনায় অংশ নেবে। তারপর তারা একসঙ্গে নামাজ পড়বে এবং মধ্যাহ্ন ভোজ করবে। চূড়ান্ত বৈঠকের পর মাওলানা সাঈদ জিহাদ সম্পর্কে বক্তৃতা দেয়। এরপর মুফতি হান্নান ১২ জন হামলাকারীর কাছে ১৫টি গ্রেনেড হস্তান্তর করে। আলোচনা অনুযায়ী আসরের নামাজের পর তারা সবাই গোলাপ শাহ মাজারের কাছে উপস্থিত হয়। এরপর তারা ট্রাকের চারপাশে অবস্থান নেয় যেখানে আওয়ামী লীগ নেতারা সমাবেশে বক্তব্য রাখছিলেন। শেখ হাসিনার বক্তব্য শুরু হলে আবু জান্দাল প্রথম গ্রেনেডটি নিক্ষেপ করে। তারপর, প্রত্যেকে নিজের গ্রেনেড নিক্ষেপ করে ওই স্থান ত্যাগ করে। আগে থেকেই নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সহায়তা পাওয়ায় হামলাকারীরা দিবালোকে অপরাধ করে পালিয়ে যেতে পারে। তবে ১৪ বছর পরে হলেও এই অপরাধীদের বিচারের রায় ঘোষিত হয়েছে। ২০০৮ সালের ১১ জুন সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু, হরকাতুল জিহাদের শীর্ষ নেতা মুফতি হান্নানসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে আদালতে প্রথম চার্জশিট দাখিল করে সিআইডি। এরপর বিচারে ২০০৮ সালের ২৯ অক্টোবর থেকে ২০০৯ সালের ৯ জুন পর্যন্ত ৬১ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। ২০০৯ সালের ৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। ২০১১ সালের ৩ জুলাই অধিকতর তদন্ত শেষে তারেক রহমানসহ আরও ৩০ জনের বিরুদ্ধে সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করে সিআইডি। ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর এই মামলায় ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ এসেছে।

৩.

২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনা রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার দেশ পরিচালনায় চ্যালেঞ্জসমূহকে সামনে এনেছে; স্পষ্টভাবে চেনা গেছে তাঁর ও এ দেশের শত্রুদের।২০১৯ সালের জুলাই মাসে বিএনপির আমলে ১৯৯৪ সালে ঈশ্বরদীতে শেখ হাসিনা হত্যা চেষ্টা মামলার রায়ে ৯ জনের ফাঁসির দণ্ড ঘোষিত হয়েছে। উপরন্তু ২৫ জনের যাবজ্জীবন, ১৩ জনের ১০ বছর কারাদণ্ড হয়েছে।২১ আগস্ট ভয়াল গ্রেনেড হামলার মতোই ১৯৯৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধুর কন্যা ও তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্য দিবালোকে প্রাণনাশের চেষ্টা করেছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি সন্ত্রাসীরা। ওই হামলায়ও অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মতো পাবনার ঈশ্বরদীতে ট্রেন বহরে হামলার ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার। কিন্তু অপরাধীরা পার পায়নি। ২৫ বছর পর হলেও ১৯৯৪ সালের সবচেয়ে বহুল আলোচিত চাঞ্চল্যকর এই হামলা মামলার রায় ঘোষিত হয়েছে। উল্লেখ্য, শেখ হাসিনাকে ১৯ বার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। আর যারা সেই চেষ্টা করেছিল তাদের কাউকে হত্যার চেষ্টা করা হয়নি।এখানেই বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতির সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতির পার্থক্য। ১৯ বার হত্যা চেষ্টার মধ্যে ১৪টি ঘটনায় মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কেবল চারটি মামলার রায় ঘোষণা হয়েছে। এসব হামলার ঘটনায় এ পর্যন্ত ৬০ জন দলীয় নেতাকর্মী নিহত হওয়ার হিসাব আছে; আহত হয়েছেন কয়েক হাজার। এসব ঘটনার মামলার নিষ্পত্তি না হওয়ায় যাদের প্রাণহানি ঘটেছে সেই পরিবারগুলো বিচার পায়নি এখনো। শেখ হাসিনাকে যতবার হত্যাচেষ্টা করা হয় তার অনেক ঘটনায় মামলাও হয়নি।এমনকি হামলার পর উল্টো আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলার নজিরও আছে। যেসব ঘটনায় মামলা হয়েছিল, তার প্রতিটিরই বিচারে সময় লেগেছে এক যুগের বেশি। কোনো কোনোটির ২০ থেকে ২৫ বছর। আবার বিচারিক আদালতে রায় এলেও উচ্চ আদালতে একটিরও মীমাংসা হয়নি এখনো। ১৯৮৯ সালে ধানমন্ডিতে হত্যা চেষ্টার রায় আসে ২০১৭ সালে। সময় লাগে ২৮ বছর। ১৯৯৪ সালে পাবনা ঈশ্বরদীতে হত্যা চেষ্টার মামলায় রায় এলো চলতি বছর; সময় লেগেছে ২৫ বছর। ২০০১ সালে গোপালগঞ্জে হত্যা চেষ্টার মামলায় রায় আসে ২০১৭ সালে। সময় গেছে ১৬ বছর। ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলায় হত্যা চেষ্টার রায় আসে ২০১৮ সালে। সময় লেগেছে ১৪ বছর। জার্মানিতে অবস্থান করার কারণে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক ঘটনা থেকে বেঁচে ১৯৮১ সালের ১৭ মে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা। ১৫ আগস্ট শেখ হাসিনাকে স্পর্শ করতে না পারলেও বুলেট তাঁর পিছু ছাড়েনি। দেশে ফেরার পর পিতার মতো তাঁকেও হত্যার চেষ্টা হয়েছে বারবার। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রপতি থাকাকালে দুটি (১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি, ১৯৮৯ সালের ১০ আগস্ট), ১৯৯১ থেকে ৯৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারের আমলে চারটি(১৯৯১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, ৯৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর, ৯৫ সালের ৭ মার্চ, ১৯৯৬ সালের ৭ মার্চ), ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে চারটি (২০০০ সালের ২২ জুলাই, ২০০১ সালের ৩০ মে, ২০০১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর), ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে চারটি (২০০২ সালের ৪ মার্চ, ২০০২ সালের ২৬ আগস্ট, ২০০৪ সালে ২ এপ্রিল, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট), সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে একটি (২০০৭ সালে ১/১১ পরবর্তী সময় কারাবন্দি থাকা অবস্থায় খাবারে বিষ প্রয়োগ করে শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়) এবং আওয়ামী লীগের বর্তমান আমলে চারটি হত্যা চেষ্টার কথা জানা যায়(২০১১ সালে শ্রীলংকার একটি সন্ত্রাসবাদী দলের প্রচেষ্টা নস্যাৎ হয়)। বঙ্গবন্ধুর খুনি মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামি শরিফুল হক ডালিম এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৬ জন অবসরপ্রাপ্ত ও কর্মরত সদস্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য সামরিক অভ্যুত্থানের চক্রান্ত করে। ২০১৪ সালের শেষদিকে প্রশিক্ষিত নারী জঙ্গিদের মাধ্যমে মানববোমায় তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে।২০১৫ সালের ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় যোগ দিতে যাওয়ার পথে কারওয়ানবাজার এলাকায় তাঁর গাড়িবহরে বোমা হামলার চেষ্টা চালায় জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) সদস্যরা। তবে ২০১৭ সালের ১২ এপ্রিল ব্রিটিশ হাইকমিশনারের ওপর গ্রেনেড হামলা মামলায় ফাঁসি কার্যকর হওয়া জঙ্গিনেতা মুফতি হান্নান শেখ হাসিনাকে বারবার হত্যার চেষ্টা করেছে। গোপালগঞ্জে ২০ জুলাই ২০০০, খুলনায় ৩০ মে ২০০১, সিলেটে ২৫ সেপ্টেম্বর ২০০১ এবং ঢাকায় ২১ আগস্ট ২০০৪ সালের চেষ্টা ছিল অন্যতম। আফগানিস্তানের যুদ্ধ শেষে দেশে ফিরে জঙ্গি তৎপরতায় যুক্ত হয় মুফতি হান্নান। একপর্যায়ে সে এদেশে ধর্মভিত্তিক উগ্রপন্থার সূচনাকারী হুজি-বির অন্যতম শীর্ষ নেতায় পরিণত হয়। তার নেতৃত্বে এ দেশে হুজি-বি প্রথম বোমা হামলা চালায় ১৯৯৯ সালে যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে। এরপর সাত বছরে অন্তত ১৩টি নাশকতামূলক ঘটনা ঘটায় তারা। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১০১, আহত হয়েছেন ৬০৯ জন।

৪.

২০০৪ সালের ২১ আগস্টের ঘটনার পর সেসময় খালেদা-নিজামী জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবরের তত্ত্বাবধানে একটি তদন্ত কমিটি করে ‘জজ মিয়া’ নাটক সাজানো হয়েছিল; নষ্ট করা হয়েছিল গ্রেনেড হামলার সকল আলামত। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে জজ মিয়াদের কোন দোষ খুঁজে পায়নি। বরং ২০১১ সালের ৩ জুলাই ৫২ জনকে আসামি করে সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করা হলে প্রকৃত অপরাধীদের মুখোশ উন্মোচিত হয়। প্রধান আসামিদের তালিকায় নাম রয়েছে- বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার ভাগ্নে সাইফুল ইসলাম ডিউক, জোট সরকারের প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবর,  জামায়াত নেতা আলী আহসান মুজাহিদ, সাবেক উপমন্ত্রী পিন্টু, জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নান প্রভৃতি। এদের ভাই ও সঙ্গীদের অনেকেসহ হুজি নেতাদের সংশি¬ষ্টতা এখন প্রমাণিত সত্য। অর্থাৎ একদিকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গ্রেনেড হামলা অন্যদিকে জঙ্গিদের সঙ্গে তৎকালীন জোট সরকারের সুসম্পর্ক অর্থাৎ বর্তমানের বিএনপি-জামায়াত নামক তথাকথিত বিরোধীদের রাজনীতির ভয়ানক চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপিত হচ্ছে। খালেদা-নিজামীরা যে খেলায় মেতেছিল সেই পরিস্থিতি পাল্টে গেছে বর্তমান সরকারের আমলে। মানুষের আস্থা বেড়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর। আর এজন্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এদেশ সফরে এসে সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের অবস্থানের প্রশংসা করে গেছেন। তবে দেশের মধ্যে জঙ্গী গোষ্ঠীর তৎপরতা এখনও অব্যাহত রয়েছে। জঙ্গী সংগঠনগুলোর রয়েছে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক। আল-কায়দা, লস্কর-ই-তৈয়বা, ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ফ্রন্টসহ পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের সম্পর্ক বহুদিনের। পৃথিবীব্যাপি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত সংগঠনগুলো এদেশকে একটি নিরাপদ চারণভূমি মনে করে। কারণ জামায়াত-শিবিরসহ অনেক জঙ্গীসংগঠন তাদের পক্ষে রয়েছে।

অধ্যাপক আবুল বারকাতের লেখা বাংলাদেশে মৌলবাদের রাজনৈতিক অর্থনীতি প্রবন্ধ এবং জঙ্গীবাদের উত্থান সম্পর্কিত আরও কয়েকটি গ্রন্থ পাঠ করে দেশের মধ্যে ২০০৪ সালের ভয়াবহ গ্রেনেড ও ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সিরিজ বোমা হামলার নেপথ্যের চক্রান্ত ও সন্ত্রাসী রাজনীতির পূর্বাপর ইতিহাস আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে যে পাকিস্তানবাদী প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির তৎপরতা শুরু হয়েছিল তারই অনিবার্য ফল হচ্ছে জামায়ত-শিবিরের উত্থান।পরবর্তীকালে রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় মৌলবাদী রাজনৈতিক সংগঠনের অপরাজনীতি শেকড় গেড়ে বসে। উল্লেখ্য, ক্ষমতা গ্রহণের পর সাবেক রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়া ১৯৭৬ সালে জামাত-শিবিরের রাজনীতি উন্মুক্ত করতে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন(বিশেষ অধ্যাদেশ ৪ মে ১৯৭৬ এবং বাংলাদেশ সংবিধান, ৫ম সংশোধনী, ২২ এপ্রিল ১৯৭৭)। সে অনুযায়ী বাংলাদেশের স্বাধীনতাপূর্ব জামাতের রাজনীতি শুরু হয় এবং ইসলামী ছাত্র সংঘের কতিপয় নেতা ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৭ সালে ঢাকায় সমবেত হয়ে পরিবর্তিত নাম ইসলামী ছাত্র শিবির ধারণ করে নতুনভাবে কর্মকাণ্ড শুরু করে। এদের মূল উদ্দেশ্য ছিল আফগানিস্তানে তালেবান শাসনের মতো বাংলাদেশকে পরিচালনা করে। এলক্ষ্যে শিবির দেশের ছাত্র ও যুব সমাজের মধ্যে গভীরভাবে প্রবেশের পরিকল্পনা করে। ১৯৮০-এর দশকে আফগান-সোভিয়েত যুদ্ধে আমেরিকা ও পাকিস্তান আফগানিস্তানকে সহায়তা করে। আফগানিস্তানের পক্ষে শিবিরের সদস্যসহ বেশ কিছু বাংলাদেশী যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে।এরা পাকিস্তানে আইএসআই-এর অধীনে এবং আফগানিস্তানে তালেবানদের অধীনে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিল। পরবর্তীতে এদের মধ্যে কিছু সংখ্যক বাংলাদেশী প্যালেস্টাইন ও চেচনিয়া যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেছে। এরা প্রায় সকলেই বাংলাদেশে ফিরে আসে। এসব যুদ্ধ ফেরত সদস্যরাই পরবর্তীতে বাংলাদেশে আইএসআই/তালেবান ও আল-কায়দার স্থানীয় সদস্য হিসেবে এদেশে আইএসআই/এলইটির (লস্কর-ই-তৈয়বা) এজেন্ট হিসেবে গণ্য হয়। এভাবে আশির দশকের পর জামাতসহ মৌলবাদী সংগঠন ও তালেবানপন্থী গোষ্ঠী সংগঠিত হয়ে রাজনীতির আড়ালে ও ইসলামের নামে জঙ্গী সন্ত্রাসী কর্মকা-সহ বাংলাদেশকে মৌলবাদী ও তালেবান রাষ্ট্র বানানোর একই অভীষ্ট লক্ষ্যে কাজ শুরু করে। ১৯৯১-এ জামাতের সমর্থনসহ বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণ করার পর ১৯৯২ সালে জামাতের সহযোগিতায় ইসলামী জঙ্গী সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আত্মপ্রকাশ করে প্রকাশ্যে জিহাদের ঘোষণা দেয়। পরবর্তীতে কথিত জিহাদের মাধ্যমে বাংলাদেশে ইসলামী শাসন চালুর অভিন্ন আদর্শে জামাত ও ইসলামী জঙ্গী সংগঠনসমূহ একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ শুরু করে।

এরই ধারাবাহিকতায় তাদের কার্যক্রম গোপনে চলতে থাকে ১৯৯৬-২০০১ পর্যন্ত শেখ হাসিনার শাসনামলেও। কিন্তু বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায় আসার পরে ২০০৬ পর্যন্ত সারা দেশ জুড়ে জঙ্গীবাদের বিস্ময়কর উত্থান বিশ্ববাসীকে হতবাক করে দেয়। কারণ জোট প্রশাসন জঙ্গীদের প্রত্যক্ষ সুযোগ-সুবিধা দিয়েছিল। ২০০৫ সালে সারা দেশ ব্যাপী বোমা বিস্ফোরণের কথা আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি। সে সময় বিদেশি পত্রিকা থেকে আমরা জেনেছিলাম লাদেন এদেশে এসেছিল। শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলার কথা এ সূত্রে মনে রাখা দরকার। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২৯ মার্চ ২০০৭ সালে যে শীর্ষ জঙ্গীদের ফাঁসি কার্যকর করে তাদের সকলেরই জামাত-শিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়।শায়খ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাই অতীতে জামাত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল। ১৫ জুন ২০০৭ সালে দৈনিক পত্রিকা থেকে জানা যায়, গ্রেফতারকৃত কয়েকজন জেএমবি সদস্য অতীতে জামাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করেছে। ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় গ্রেফতারকৃত হরকাতুল জিহাদের প্রধান মুফতি হান্নান তার ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে হামলার সাথে বিএনপি নেতা আবদুস সালাম পিন্টু, লুৎফজ্জামান বাবর এবং ইসলামী ঐক্য জোট নেতা মুফতী শহিদুল ইসলামের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে।ইসলামী সমাজ, আল্লাহর দল বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গী সংগঠন। জামায়াতে ইসলামের একাংশ বের হয়ে তৈরি হয়েছিল ইসলামী সমাজ আর আল্লাহর দলের প্রতিষ্ঠাতা ছিল ছাত্রশিবিরের কর্মী। শীর্ষ নেতৃবৃন্দ যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচারে ফাঁসিতে ঝোলায় প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য ভিন্ন পন্থার অনুসন্ধান চলছে জামায়াত-শিবিরের ভেতর। তারা এখন হিযবুত তাহরীর উল্লাইয়াহ বাংলাদেশ, হরকাতুল জিহাদ আল-ইসলামী বাংলাদেশ (হুজি)সহ আরও অনেক জঙ্গী সংগঠনকে তাদের পতাকাতলে একত্রিত করেছে। অবশ্য কয়েক বছর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসলামি মৌলবাদী দল হিসেবে চিহ্নিত করেছে জামায়াত ইসলামকে।অন্যদিকে বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংক ও স্যোসাল ইসলামী ব্যাংকের বিরুদ্ধে অবৈধ অর্থের লেনদেন ও সন্ত্রাসবাদে অর্থের জোগানে সহযোগিতা দেওয়ার মতো অপরাধের সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়।

৫.

২১ আগস্টেও গ্রেনেড হামলার ঘটনায় মনে রাখতে হবে বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলে রাষ্ট্রযন্ত্রকে পুরোপুরি ব্যবহার করা হয়েছিল আইএসআইয়ের সক্রিয় সহযোগী হিসেবে। দল, প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় সদস্য এ সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে ভূমিকা পালন করে। আইএসআইয়ের অস্ত্র চোরাচালান চক্রের অন্যতম সদস্য ছিল পাকিস্তানি জঙ্গী ইউসুফ ভাট ও মাওলানা তাজউদ্দীন। ২০০৩ সালে দাউদ ইব্রাহিম ও সোনা চোরাকারবারি আব্দুর রহমান ইয়াকুবের এআরওয়াই টিভি বাংলাদেশে শুধু অস্ত্র পাচারের জন্য এআরওয়াই বাংলা নামে একটি টিভি চ্যানেল করার উদ্যোগ নিয়েছিল। তৎকালীন এনএসআইয়ের ডিজি আব্দুর রহীমের স্ত্রী উক্ত চ্যানেলের চেয়ারম্যান হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই ষড়যন্ত্র সমূলে উৎপাটিত হয়েছে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ায়। আসলে ঐতিহাসিকভাবে এ দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য ইসলামী রাষ্ট্রের পার্থক্য রয়েছে।এখানকার ইসলাম ধর্মানুসারীরা উদার ও মানবিক। হাজার বছর ধরে অন্যান্য ধর্ম বিশ্বাসীরা এখানে নির্বিঘেœ বাস করে আসছে। এজন্যই আমরা মনে করি, ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক জঙ্গীরা জোর করে ক্ষমতা দখল করতে পারবে না। উগ্রপন্থীরা ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালিয়ে বঙ্গবন্ধুর উত্তরসূরি শেখ হাসিনা তথা এদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার নেতৃত্বকে নিঃশেষ করতে চেয়েছিল। তাদের সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। পরের বছর সিরিজ বোমা হামলার মাধ্যমে দেশকে তালেবান রাষ্ট্র বানানোর ষড়যন্ত্রও নস্যাৎ হয়েছে। বর্তমান সরকারের জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাস বিরোধী অবস্থান ইতোমধ্যে প্রশংসা কুড়িয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র ধর্ম বিশ্বাসীরাও নিরাপদে এদেশে বসবাসের নিশ্চয়তা পাবে। সাম্প্রদায়িক ও অনগ্রসর-পশ্চাৎপদ দৃষ্টিভঙ্গির চূড়ান্ত পরিণতির নাম জঙ্গীবাদ। দেশ থেকে এ ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতা চিরতরে বন্ধ হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ৫২ আসামির মধ্যে ৩৩ জন কারাগারে; পলাতক ১২ জনের মধ্যে তারেক রহমান লন্ডনে, হারিছ চৌধুরী আসামে, কেউ কেউ আছেন কানাডা, ব্যাংকক, আমেরিকায়; হুজির শীর্ষ নেতারা পাকিস্তানে পালিয়েছে। এদের সকলকে অবিলম্বে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের রায় কার্যকর করার দাবি জানাচ্ছি আমরা।

(লেখক : ড. মিল্টন বিশ্বাস,  বিশিষ্ট লেখক, কবি, কলামিস্ট, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম, নির্বাহী কমিটির সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ এবং অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়,  email-drmiltonbiswas1971@gmail.com)

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*