রবির স্নেহের কবি

তাপসকুমার কার্ফা

১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট রবিবার ভারতীয় সময় সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে ঢাকা প্রেসিডেন্সি জেনারেল হাসপাতালে কাজী নজরুল ইসলামের জীবনাবসান হয়। যদিও ১৯৪২ সালের ১০ জুলাই আকাশবাণীতে ছোটোদের একটি অনুষ্ঠান পরিচালনা করার সময় তাঁর কথা জড়িয়ে যায় এবং অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেই সময় স্বাধীনতা আন্দোলনে উত্তাল দেশ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতিতে নজরুলের মস্তিষ্কের বিরল এই অসুখের (পিকস ডিজিজ) সঠিক চিকিৎসা হয়নি, কারণ ভারতবর্ষে তখন এই ধরনের অসুখের চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল না। অথচ ঠিক এক বছর আগে অর্থাৎ ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট নজরুলের প্রিয় মানুষ রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণে দুপুরে তিনি লিখলেন ও আকাশবাণীতে আবৃত্তি করলেন বিখ্যাত সেই রবিহারা কবিতা:

দুপুরের রবি পড়িয়াছে ঢলে

অস্তপারের কোলে

শ্রাবণের মেঘ ছুটে এল দলে দলে

উদাস গগন তলে।

ওইদিন সন্ধ্যাবেলায় চোখের জলে রচনা করলেন:

ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিরে জাগায়োনা

সারা জীবন যে আলো দিল ডেকে তার ঘুম ভাঙায়োনা।

রবীন্দ্রনাথকে তিনি আন্তরিকভাবে শ্রদ্ধা করতেন। জীবনে চলার পথে রবীন্দ্রনাথের অকৃপণ ভালোবাসাও পেয়েছেন। নজরুলের রবীন্দ্র-অনুরাগ তাঁর ছাত্রজীবন থেকে। ১৯১৬ সালের ঘটনা। নজরুল তখন বর্ধমান জেলার (এখন পশ্চিম বর্ধমান) রাণীগঞ্জের নিকট সিয়ারসোল হাই স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্র। ওই বয়সেই বাংলা সাহিত্যের অনেক দিকপাল লেখকদের লেখার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন। সেই সূত্রে রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাঁর মনে অসীম ভক্তির জন্ম হয়। একবার খেলার মাঠে বন্ধুরা তাঁকে নিয়ে মজা করার জন্য রবীন্দ্রনাথের বিষয়ে কিছু অপ্রিয় কথা বলায় নজরুল রেগে গিয়ে বাঁশের গোলপোস্ট উপড়ে বন্ধু জগৎ রায়ের মাথায় এমন আঘাত করেছিলেন যে মাথা ফেটে রক্তপাত হয়েছিল।

১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি বিজলী কাগজে প্রকাশিত হ’ল নজরুলের সেই বিশ্ববিখ্যাত কবিতা ‘বিদ্রোহী’। মাত্র ২২ বছর ৭ মাস বয়সে লেখা সেই কবিতাটি তিনি স্বকণ্ঠে রবীন্দ্রনাথকে শোনানোর জন্য পৌঁছে গেলেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে। দৃপ্ত কণ্ঠস্বরে কবিকে শোনালেন তাঁর লেখা বিদ্রোহী কবিতার কিছু অংশ। রবীন্দ্রনাথ মুগ্ধ বিস্ময়ে তাঁর আবৃত্তি শোনার পর আশীর্বাদ করে বললেন,”তুমি একদিন তোমার কবিপ্রতিভায় বিশ্বজগৎ আলোকিত করবে।”

১৯২০-২১ সালে নজরুলের কয়েকটি কবিতা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কবিখ্যাতি বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। এই সময় রবীন্দ্র-প্রতিভা মধ্যগগনে। রবীন্দ্র-ভক্ত নজরুল শুধু যে রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করতেন ও তাঁর গান গাইতেন তা নয়। এমনকী তিনি তাঁর সম্পাদিত ‘নবযুগ’ পত্রিকার হেডিংয়ে পর্যন্ত রবীন্দ্র কবিতার পংক্তিবিশেষ ব্যবহার করতেন। যে কোনও সময় নজরুল কোনও খাতা ব্যবহার না করে শতাধিক রবীন্দ্রসংগীত গাইতে পারতেন। এটা ছিল বোধ হয় গুরুর প্রতি শিষ্যের অসীম শ্রদ্ধা।

১৯২২ সালের ১১ আগস্ট কলকাতার ৭ নম্বর প্রতাপ চাটুজ্যে লেন থেকে নজরুলের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় অর্ধসাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ধূমকেতু’। পত্রিকাটি প্রকাশের পূর্বে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে বাণী চেয়েছিলেন নজরুল। নিজ হস্তে আশীর্ব্বাদ বাণী লিখে পাঠালেন রবীন্দ্রনাথ। সেই হস্তলিপিই ধূমকেতুর প্রথম সংখ্যা থেকে প্রতিটি সংখ্যাতেই ছাপা হয়। কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু-

আয় চলে আয় রে ধূমকেতু

আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু

দুর্দিনের এই দূর্গশিরে

উড়িয়ে দে তোর বিজয়কেতন।

অলক্ষণের তিলকরেখা

রাতের ভালে হোক না লেখা,

জাগিয়ে দেরে চমক মেরে

আছে যারা অর্ধচেতন।

                  ২৪ শ্রাবণ, ১৩২৯।

এই আশীর্ব্বাদবাণী থেকে বোঝা যায় নজরুল প্রতিভার স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের উপলব্ধি। ১৯২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ধূমকেতু পত্রিকাটির দ্বাদশ সংখ্যায় ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটি প্রকাশিত হতেই কবির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। ওই কবিতায় নজরুল উদাত্ত কণ্ঠে মা দুর্গাকে ডাক দিয়ে বলেছিলেন,

আর কতকাল থাকবি বেটি মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল

স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি-চাঁড়াল

দেবশিশুদের মারছে চাবুক বীর যুবাদের দিচ্ছে ফাঁসী,

ভূভারত আজ কসাইখানা, – আসবি কখন সর্বনাশী।

সঙ্গত কারণেই ইংরেজ সরকারের পুলিশ এসে পত্রিকা দফতর থেকে যাবতীয় সামগ্রী বাজেয়াপ্ত করে। প্রায় দু মাস আত্মগোপন থাকার পর নভেম্বর মাসে কুমিল্লা থেকে কবিকে গ্রেফতার করে কলকাতার প্রেসিডেন্সি জেলে এনে আটক করা হয়। ১৯২৩ সালের ১৬ জানুয়ারি ম্যাজিস্ট্রেট সুইনহো সরকারবিরোধী কার্যকলাপের দায়ে নজরুলকে এক বছর কারাদন্ডের আদেশ দেন। বিচার শেষে তাঁকে প্রেসিডেন্সি জেল থেকে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে স্থানান্তরিত করা হয়। এই সংবাদ প্রকাশিত হতে নজরুল সমগ্র বাঙালি তথা দেশবাসীর কাছে আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। সেই সময় ১৯২৩ সালে ২২ ফেব্রুয়ারি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য নজরুলকে উৎসর্গ করে তাঁকে কবির সম্মানে ভূষিত করেন। গ্রন্থের একটি কপিতে নিজের নাম সই করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নজরুলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সবুজপত্রের সম্পাদক পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের হাতে দিয়ে তা নজরুলের কাছে জেলে পৌঁছে দিতে বলেন। জেলে বসে নজরুল এই বইটি পাওয়ার পর অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং রচনা করেন ‘আজ সৃষ্টিসুখের উল্লাসে’ অর্থাৎ প্রলয়োল্লাস কবিতা। নজরুলই প্রথম ঠাকুর পরিবারের বাইরে তরুণ কবি যাঁকে রবীন্দ্রনাথ কোনও বই উৎসর্গ করেন। এই উপলব্ধিই নজরুলকে কারাবাসের ক্লেশ তাৎক্ষণিক হলেও ভুলিয়ে দিয়েছিল।

১৯২৩ সালের ১৪ এপ্রিল নজরুলকে আলিপুর সেন্ট্রাল জেল থেকে হুগলি জেলে স্থানান্তরিত করা হয়। শোনা যায় যে, তাঁর কোমরে দড়ি বেঁধে আনা হয় অর্থাৎ তরুণ কবিকে ইংরেজ সরকার বিন্দুমাত্র সৌজন্য বা সম্মান দেখানোর প্রয়োজন মনে করেনি। হুগলি জেলের সুপার মিস্টার থাসচিন রাজবন্দিদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও অত্যাচার করতেন। নিত্যনতুন অত্যাচারে কয়েদিদের বিশেষ করে যাঁরা সরকারদ্রোহিতার অভিযোগে অভিযুক্ত তাঁদের অস্থির করে তুলতেন। খাবার দেওয়া হতো অতি নিম্নমানের। রাজবন্দিদের উপর এরূপ অত্যাচারের প্রতিবাদে নজরুল অনশন শুরু করেন। অনশনরত তরুণ কবির উপর অত্যাচারের মাত্রা বাড়ল বৈ কমল না। মুমূর্ষু কবিকে বাঁচানোর লক্ষ্যে নজরুলের হিতাকাঙ্ক্ষী বন্ধুরা বিভিন্ন প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত শিলংয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে চিঠি লেখেন। কারণ, তাঁরা জানতেন ওই একজন মানুষের কথা নজরুল অস্বীকার করবেন না। অনশনের সংবাদে বিচলিত রবীন্দ্রনাথ তাঁকে টেলিগ্রাম করেন, “give up hunger strike, our literature claims you.” অত্যন্ত বিস্ময়ের বিষয় জেল কর্তৃপক্ষ রবীন্দ্রনাথের টেলিগ্রাম নজরুলকে না পাঠিয়ে রবীন্দ্রনাথকে লিখে পাঠালেন, “Addressee not found.” কারণ নজরুলকে প্রেসিডেন্সি জেল থেকে আলিপুর সেন্ট্রাল জেল, সেখান থেকে হুগলি জেলে স্থানান্তরের কথা রবীন্দ্রনাথের জ্ঞাত ছিল না। তাই তিনি প্রেসিডেন্সি জেলে টেলিগ্রামটি পাঠান। জেলের নিয়ম অনুসারে টেলিগ্রামটি হুগলি জেলে আসার কথা। টেলিগ্রাম ফেরত পেয়েই রবীন্দ্রনাথ বুঝলেন এটি সাম্রাজ্যবাদীদের চক্রান্ত ও হীনম্মন্যতা। তিনি পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে লিখলেন: কল্যাণীয়েষু রথী, নজরুল ইসলামকে প্রেসিডেন্সি জেলের ঠিকানায় টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলাম, “give up hunger strike, our literature claims you.” জেল থেকে memo এসেছে “Addressee not found.” অর্থাৎ ওরা আমার message দিতে চায় না, কেন না নজরুল প্রেসিডেন্সি জেলে না থাকলে ওরা নিশ্চয়ই জানতো যে কোথায় আছে। অর্থাৎ নজরুল ইসলামের আত্মহত্যায় ওরা বাধা দিতে চায় না।

শেষ পর্যন্ত চল্লিশ দিনের মাথায় নজরুলের মাতৃসমা বিরজাসুন্দরী দেবী (ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তর স্ত্রী, পরবর্তীকালে ১৯২৪ সালে ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তর ভাইয়ের মেয়েকে নজরুল বিবাহ করেন।) কুমিল্লা থেকে এসে মায়ের অধিকার প্রয়োগ করে তাঁকে বকে ঝকে অনশন ভাঙতে বাধ্য করেন।

১৯৩৮ সালে দেবদত্ত ফিল্মস রবীন্দ্রনাথের গোরা উপন্যাসের ছায়াছবি তৈরি করেছিল পরিচালক নরেশ মিত্রের পরিচালনায়। সংগীত পরিচালক ছিলেন নজরুল ইসলাম। কবির সমস্ত কাজ শেষ হওয়ার পর বিশ্বভারতীর সংগীত বিভাগের অনুমতি না নেওয়ার জন্য পর্যবেক্ষক দল ছবি থেকে গানগুলিকে বাতিল করে দেন। নজরুল ফিল্মের প্রিন্ট এবং প্রযোজক ও পরিচালককে নিয়ে সোজা শান্তিনিকেতনে গুরুদেবের কাছে গেলেন। সমস্যার কথা শুনে রবীন্দ্রনাথ অনুমতি স্বাক্ষর করলেন। আসলে নজরুলের সংগীতবোধের প্রতি রবীন্দ্রনাথের ছিল চরম আস্থা। সবশেষে তীর্থ পথিক কবিতার কয়েকটি লাইন লিখে রবীন্দ্রনাথের প্রতি নজরুলের শ্রদ্ধার কথা বলব:

বিজ্ঞান বলে, বলুক, রবির কমিয়া আসিছে আয়ু,

রবি রবে, রবে যতদিন এই ক্ষিতি-অপ-তেজ-বায়ু।

মহাশূন্যের বক্ষ জুড়িয়া বিরাজে যে ভাস্কর

তার আছে ক্ষয়, এত প্রত্যয় করিবে কোন্ সে নর?

…….

প্রার্থনা মোর যদি আরবার জন্মি এ ধরণীতে

পারি যেন শুধু গাহন করিতে তোমার কাব্য-গীতে।।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*