সেবাদর্শের প্রতীক মাদার টেরিজা

সুদেব সিংহ

মাদার টেরিজা ১৯১০ সালের ২৬ আগস্ট ম্যাসিডোনিয়ার রাজধানী স্কোপিয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তবে ২৬ অগস্ট জন্ম হলেও তিনি ২৭ অগস্ট তারিখটিকে তাঁর প্রকৃত জন্মদিন মনে করতেন, কারণ ওই তারিখেই তাঁর ব্যাপটিজম সম্পন্ন হয়েছিল। ১৯১৯ সালে মাত্র আট বছর বয়সে তাঁর পিতৃবিয়োগ হয়। পিতার মৃত্যুর পর তাঁর মা তাঁকে রোমান ক্যাথলিক আদর্শে লালনপালন করেন। ১২ বছর বয়সেই তিনি ধর্মীয় জীবন যাপনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। ১৮ বছর বয়সে তিনি গৃহত্যাগ করে এ মিশনারির সেবাব্রত নিয়ে ভারতের কলকাতায় আসেন এবং যোগ দেন সিস্টার্স অব লোরেটো সংস্থায়।

১৯২৯ সালে ভারতে এসে দার্জিলিংয়ে নবদীক্ষিত হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৩১ সালের ২৪ মে তিনি সন্ন্যাসিনী হিসেবে প্রথম শপথ গ্রহণ করেন। এই সময় তিনি মিশনারিদের পৃষ্ঠপোষক সন্ত-এর নামানুসারে টেরিজা নাম গ্রহণ করেন। ১৯৩৭ সালের ১৪ মে পূর্ব কলকাতায় লোরেটো কনভেন্ট স্কুলে পড়ানোর সময় তিনি চূড়ান্ত শপথ গ্রহণ করেন। স্কুলে পড়াতে তাঁর ভালো লাগলেও কলকাতার দারিদ্র্যে তিনি উত্তরোত্তর উদ্বিগ্ন হয়ে উঠতে লাগলেন। পঞ্চাশের মন্বন্তরে শহরে নেমে আসে অবর্ণনীয় দুঃখ আর মৃত্যুর ছায়া। ১৯৪৬ সালে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গাতেও বহু মানুষ মারা যান। এই সব ঘটনা টেরিজার মনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে।

১৯৪৮ সালে টেরিজা দীন, দুঃখী মানুষের মাঝে মিশনারির কাজ শুরু করেন। পোশাক হিসেবে পরিধান করেন নীল পাড়ের একটি সাধারণ সাদা সুতির বস্ত্র। এ সময়ই ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণ করে বস্তি এলাকায় কাজ শুরু করেন। প্রথমে মতিঝিলে একটি ছোটো স্কুলস্থাপনের মাধ্যমে শুরু করেছিলেন।  তিনি ১৯৫০ সালে একান্ত নিস্ব অবস্থায় শুরু করেছিলেন তাঁর প্রথম সেবাব্রতের কাজ। স্থাপন করেছিলেন তাঁর মিশনারি অব চ্যারিটি। কলকাতায় মাত্র ১৩ জন সদস্যের ছোট্ট অর্ডার হিসেবে চ্যারিটির যাত্রা শুরু হয়েছিল। বর্তমানে এর অধীনে ৪,০০০-এরও বেশি নান কাজ করছেন। চ্যারিটির অধীনে অনাথ আশ্রম ও এইড্‌স আক্রান্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্র পরিচালিত হয়। বিশ্বব্যাপী শরণার্থী, অন্ধ, পক্ষাঘাতগ্রস্ত, বয়স্ক, মাদকাসক্ত, দরিদ্র, বসতিহীন এবং বন্যা, দুর্ভিক্ষ বা মহামারিতে আক্রান্ত মানুষের সেবায় চ্যারিটির সবাই অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।

১৯৫২ সালে মাদার টেরিজা কলকাতা কর্পোরেশনের দেওয়া জমিতে মুমূর্ষুদের জন্য প্রথম আশ্রয় ও সেবা কেন্দ্র গড়ে তোলেন। ভারতীয় কর্মকর্তাদের সহায়তায় একটি পরিত্যক্ত হিন্দু মন্দিরকে কালিঘাট হোম ফর দ্য ডাইং-এ রূপান্তরিত করেন। এটি ছিল দরিদ্রদের জন্য নির্মিত দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্র। পরবর্তীতে এই কেন্দ্রের নাম পরিবর্তন করে রাখেন নির্মল হৃদয়। এর কিছুদিনের মধ্যেই টেরিজা কুষ্ঠরোগে আক্রান্তদের জন্য একটি সেবা কেন্দ্র খোলেন যার নাম দেয়া হয় শান্তি নগর। এ ছাড়া মিশনারিস অব চ্যারিটির উদ্যোগে কলকাতার বাইরে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বেশ কিছু কুষ্ঠরোগ চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। মিশনারিস অব চ্যারিটি মিশনারি শিশুদের লালনপালন করতো। একসময় শিশুর সংখ্যা অনেক বেড়ে যাওয়ায় টেরিজা তাদের জন্য একটি আলাদা হোম তৈরির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। এই অনুভূতি থেকেই ১৯৫৫ সালে নির্মল শিশু ভবন স্থাপন করেন।

১৯৬০-এর দশকের মধ্যে ভারতের সর্বত্র চ্যারিটির অর্থে ও পরিচালনায় প্রচুর দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্র, অনাথ আশ্রম ও আশ্রয় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ভারতের বাইরেও তৈরি হয় একাধিক প্রতিষ্ঠান। ১৯৭৯ সালে তিনি তাঁর সেবাকার্যের জন্য ‘নোবেল শান্তি পুরস্কার’ ও ১৯৮০ সালে ভারতের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ‘ভারতরত্ন’ লাভ করেন। ১৯৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃ্ত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৮৭ বছর। ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬ আনুষ্ঠানিকভাবে মাদার টেরিজাকে ‘সন্ত’ ঘোষণা করে ভ্যাটিকান সিটি। সেন্ট পিটার্স স্কোয়ারে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হন এই অনুষ্ঠানে। বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*