লোকটা আস্ত জানলা

অভীক মজুমদার

লোকটা আসলে একটা জানলা। অন্যেরা তার মধ্যে দিয়ে দেখতে পায়, আছড়ে পড়ছে আর ফুঁসে উঠছে সমুদ্দুর, তার পাশেই গুল্মহীন মরুপ্রান্তরে ছুটে যাচ্ছে ঘোড়সওয়ার, তার পাশেই উদ্যত বন্দুকের সামনে আন্দোলন করছে আদিবাসীরা, যন্ত্রদানব নিয়ে মশগুল বৈজ্ঞানিক, দেখা যায় বরফের সামনে একলা হেঁটে যাচ্ছেন কোনও কবি, গমের খেত, ঈগল আর পাহাড়ি রাস্তায় প্রাচীন সভ্যতার শিলালিপি… লোকটা আসলে একটা জানলা। একশো ফুট বাই একশো ফুট!

একবার জিগ্যেস করেছিলাম — ‘টু হুম ইট মে কনসার্ন’-এর বাংলা কী করব? তৎক্ষণাৎ উত্তর — ‘লেখো, যার মাথাব্যথা’! আরেকদিন জিগ্যেস করলাম, ‘ফিডব্যাক’-এর কী বাংলা হবে? বললেন, শান্ত গলায় — ‘বমি খাওয়ানো’।

ইনি মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, বাংলা অনুবাদের একাই-একশো প্রবাদপুরুষ, যাঁর সঙ্গে থাকাটা রোমাঞ্চকর আর কৌতুকে উপভোগ্য — কথায় ‘পান’-এর ফুলঝুরি, পাশাপাশি, উদ্ভট বিবিধ-তত্ত্বের উদ্গাতা। (যার মধ্যে একটা হল, নামের আদ্যক্ষর আর পদবির আদ্যক্ষর যাঁদের এক, তাঁদের ‘রোখা যায় না’! দৃষ্টান্ত হিসেবে বলেছিলেন, বের্টোল্ড ব্রেখ্ট, মেরিলিন মনরো, তড়িৎ তোপদার, সুচিত্রা সেন, গর্ডন গ্রিনিজ, অনিল আম্বানি…

আমার মুখে হাসির ঝলক দেখে বললেন, বিশ্বাস হল না তো? আমার দিকে তাকাও।

আমি বললুম, মানে?

উনি বললেন, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের কথা ভাবো। স্রেফ বন্দ্যোপাধ্যায় বলে আমার কিছু হল না।)

কিছু অকল্পনীয় অনুমান (যার একটা: হেদুয়ার পাশ দিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে হঠাৎ নজরুল নাকি পেয়ে যান একটি কাব্যপঙ্ক্তি — ‘অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া জানে না সন্তরণ…’), আর বিশ্বের, একদম আক্ষরিক অর্থে, বিশ্বের সাহিত্য বিষয়ে প্রভূত প্রজ্ঞার অনাবিল ইশারা। আমার বোন, যে ওঁর সরাসরি ছাত্রী, একবার প্রশ্ন করেছিল, ‘স্যর, কেমন আছেন?’ মুচকি হেসে উত্তর, ‘তোমাকে কেন বলব? তুমি কি ডাক্তার?’

এইসব লঘু-মুহূর্তের পুলকে কিন্তু ভুলে যাওয়া চলবে না, মহাদেশের পর মহাদেশ বাংলা অনুবাদে ঢুকে পড়েছে আমাদের সাহিত্য-তল্লাটে, তাঁর অকৃপণ উদ্যোগে ভর করে। পূর্ব ইউরোপের কবিতা, লাতিন আমেরিকার কথাসাহিত্য, আফ্রিকার গল্প, পাকিস্তানের আখ্যান, এডগার অ্যালেন পো-র রহস্যরোমাঞ্চ ঘুরে এডওয়ার্ড লিয়র, হান্স আন্ডেরসন, ভৈকম মুহম্মদ বশীর থেকে পেটার বিকসেল (সুইজারল্যান্ড) কিংবা পশ্চিম ইন্ডিজের মহাকবিতা থেকে জুল ভের্ন বা স্তানিসোয়াভ লেম-এর কল্পবিজ্ঞান… হ্যাঁ, একা হাতে বাংলায় একচ্ছত্র সাম্রাজ্য চালিয়ে গিয়েছেন মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। চালিয়ে যাচ্ছেন। চালিয়ে যাবেন। কে জানে, আগামীদিনে হয়তো গবেষণা হবে, তিনি বোধহয় একজন মানুষ ছিলেন না। আজ অবধি তাঁর শুধু অনুবাদ-গ্রন্থের সংখ্যা একশো পেরিয়ে গিয়েছে। বাংলা ভাষা-সাহিত্য তাঁর কাছে খুব বড় মাত্রায় ঋণী থেকে গেল। কেননা এই বিপুল অনুবাদব্রত আসলে ধারণক্ষমতা বাড়িয়ে দিয়েছে আমাদের ভাষার, তাকে পোক্ত আর স্বয়ম্ভর হয়ে উঠতে শিখিয়েছে, বানিয়ে দিয়েছে পরিভাষা, দিয়েছে সেসব অমোঘ ভাষাভঙ্গি যা দিয়ে যে কোনও পরিস্থিতি-সংস্কৃতি-পরিমিতির সাহিত্য আত্মস্থ করা যায়। খুলে দিয়েছে একটার পর একটা জানলা—যা দিয়ে ঢুকে পড়তে পারে রোদ জল হাওয়া মেঘ পর্বত, ফলে স্বাস্থ্যকর বিকাশ হতে পারে ঘরের বাসিন্দাদের।

তাঁর কাছাকাছি গেলেই মনে হয়, একক কাঁধে তিনি বাংলা অনুবাদ শব্দবন্ধটিতে যোজনা করেছেন সম্ভ্রম আর আত্মবিশ্বাস। জুড়ে দিয়েছেন হরেক রঙের ডানা। পাশাপাশি, সম্পাদনা করেছেন নানা কিসিমের অনুবাদ-গ্রন্থ। বন্ধুবান্ধব, ছাত্র-ছাত্রী, পরিচিতজনদের উসকে দিয়েছেন অনুবাদের কাজে। হ্যাঁ, খুব ভেবেচিন্তেই শব্দটা ব্যবহার করেছি—‘অনুবাদব্রত’। কী এক অপরিমেয় দায়বদ্ধতায় তিনি মত্ত, মগ্ন, মশগুল আছেন তর্জমায়। যুক্ত আছেন বিভিন্ন অনুবাদ-প্রকল্পে। একেকজন লেখককে তিনি অনুবাদ করেন আর সঙ্গে জুড়ে দেন সেই ভূগোল ভাষা সংস্কৃতি ইতিহাসের প্রেক্ষিত, পরিচিত করেন বাংলার পাঠকের কাছে। এ এক অভাবনীয় প্রকল্প!

তাঁর দু’টি অত্যাশ্চর্য গ্রন্থ, ‘আলেহো কার্পেন্তিয়ের-এর রচনাসংগ্রহ’ আর গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ-এর ‘কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে না’ পড়ে, তাঁর ভাষায় কুহকী বাস্তববাদ-নির্ভর একটি গল্প লেখার কথা ভেবেছিলাম। তাঁকে নিয়ে। ওই যেভাবে শুরু, লোকটা আসলে একটা জানলা। অন্যেরা তার মধ্যে দিয়ে দেখতে পায়, আছড়ে পড়ছে আর ফুঁসে উঠছে সমুদ্দুর…

কিন্তু, শুধুই কি এই বহুবিচিত্র অনুবাদ আর দুনিয়া কাঁপানো লেখকদের পরিচিতি-মূল্যায়ন রচনার জন্য মানবেন্দ্র অবিস্মরণীয়? আমার মনে হয়, সে-কথা আংশিক সত্য। তার পাশাপাশি, আসলে বাঙালি পাঠককে তিনি দিয়েছেন এক নয়া দিকনির্দেশ। তা হল, ‘অনুবাদের রাজনীতি’। আর সেখানেই তাঁর মহামহিম পূর্বসূরিদের, তথা সমসাময়িক বা অনুজদের তিনি পিছনে ফেলে দেন। মাইকেল, সত্যেন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ, সুধীন্দ্রনাথ, বিষ্ণু দে থেকে বুদ্ধদেব বসু, সমর সেন বা অরুণ মিত্র, অলোকরঞ্জন, শঙ্খ ঘোষ থেকে ভাস্কর চক্রবর্তী, লোকনাথ ভট্টাচার্য থেকে পুষ্কর দাশগুপ্ত প্রধানত অনুবাদে জোর দিতে চেয়েছেন ইউরোপ বা আমেরিকার সাহিত্য—অর্থাৎ নামীদামি উদযাপিত লেখকের চেনাবৃত্তটির ওপর। সে-কাজের গুরুত্বও সীমাহীন, সন্দেহ নেই। কিন্তু, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এই বৃত্তকে ভেঙেচুরে যেতে চেয়েছেন নতুন-নতুন পরিসরে, নয়া মহাদেশ বা অতিক্ষুদ্র দ্বীপে। উপরন্তু, অনুবাদগ্রন্থের অনবদ্য সব ভূমিকা বা পরিশিষ্টে তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন তাঁর পক্ষপাত, তাঁর নির্বাচনের নির্দিষ্ট রাজনীতি। এখানেই তাঁর অনন্যতা। সেই অবস্থান কারও অপছন্দ হতে পারে, কেউ সেখানে একপেশেমির উগ্রতা বা ‘মুক্তচিন্তা’-র অভাব লক্ষ করতে পারেন, কিন্তু মানবেন্দ্রকে এ-বিষয়ে ‘পথিকৃৎ’-এর স্বীকৃতি দিতেই হবে। প্রখ্যাত এক ঔপন্যাসিক একবার হাসতে-হাসতে বলেছিলেন, ‘মানব যাদের অনুবাদ করে, কস্মিনকালেও ওসব লেখকের অস্তিত্ব নেই। ভাসকো পোপা! ওসব বাড়িতে বসে মানব বানায়। শুধু অবাক কান্ড হল, কিছুদিন পরেই তারা দেখি নোবেল পুরস্কার পেয়ে যায়!’

এই যে অচেনা-অজানা লেখকদের নিরন্তর বাংলাভাষার পাদপ্রদীপের সামনে হাজির করানো, এ কি কাকতালীয়? না কি হ্যামলেট অনুষঙ্গে বলা চলে, এর মধ্যে একটি ‘মেথড ইন ম্যাডনেস’ আছে?

ক) সংক্ষেপে, এই তা হলে, উপনিবেশের মানুষের দু’টি সমান্তর ইতিহাস—এবং কীভাবে সেখানে উপনিবেশের মানুষ খুঁজেছে তাদের শিকড় ও সংজ্ঞার্থ—আর সেখানে কী ছিল শিল্পী সাহিত্যিক সংস্কৃতি-কর্মীর ভূমিকা।… আমরা অবশ্য আরও এক ধরনের উপনিবেশের মানুষের দশা বোঝবার চেষ্টা করব। যারা উপনিবেশবাদের জোয়াল থেকে সদ্য-সদ্য স্বাধীন হয়েছে অথবা স্বাধীন হওয়ার চেষ্টা করছে: যারা নিজেদের দেশেই থেকে গিয়েছে, কিন্তু তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তির অবলুপ্তির সঙ্গে-সঙ্গে সহ্য করেছে পশ্চিমের সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ যার প্রধান পরিচয় ফুটে ওঠে এ-সব দেশে প্রবর্তিত ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থায়। ম্যালকম মাগারিজকেও একবার স্বীকার করতে হয়েছিল যে, ‘লোকে একদিন হয়তো জালিয়ানওয়ালাবাগ ভুলে যাবে, সেনাবাহিনী ও সাম্রাজ্যের প্রতিনিধিরা একদিন হয়তো দেশ ছেড়ে চলে যাবে, কিন্তু থেকে যাবে গ্রাজুয়েটরা, অক্সফোর্ড বুক অব ইংলিশ ভার্স সমেত।’ ১৮৮৪-তে বার্লিনে এক টেবিলে বসে পশ্চিমের দেশগুলো ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়েছিল আস্ত আফ্রিকা, ঠিক করেছিল কে কোন দেশ দখল করবে—আর তারপর থেকে এই দেশগুলোকে জানা হবে ইউরোপের কোন ভাষা তার ওপর চাপানো হয়েছে, তার মাধ্যমেই—ইংরেজি, ফরাসি, পর্তুগিজ ইত্যাদি। লাতিন আমেরিকায় এই সর্বগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদ থেকে যারা বাঁচার চেষ্টা করছে, তাদের সরে যেতে হয়েছে দূরদুর্গম অরণ্যে বা রুক্ষ ঊষর পার্বত্যভূমিতে—যে কোনও সামাজিক সংস্কৃতির ইতিহাস বইতে যার বর্ণনা পাওয়া যাবে।… আফ্রিকা বা এশিয়ার যে বিশাল জনগোষ্ঠী এতদিন ধরে শোষিত ও নির্যাতিত হয়েছে, তারা ধীরে ধীরে আবিষ্কার করেছে কীভাবে তাদের সংস্কৃতি রীতিনীতি ধ্যানধারণা কেড়ে নিয়ে পুরোপুরি ধ্বংস করে ফেলার চেষ্টা হয়েছে, যেমন দেখিয়েছেন এনগুয়ি ওয়া থিয়ং’-ও তাঁর লেখায়: ‘The night of the sword and bullet (was) followed by the morning of the chalk and the black board.’ (‘স্তব্ধতার সংস্কৃতি’/ ভূমিকা)

খ) ‘ঔপনিবেশিকতাবাদ চায় উপনিবেশের ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম—এমনকী স্বাতন্ত্র্যকেও ধ্বংস করে ফেলতে, সে উপনিবেশের মানুষের মধ্যে জাগিয়ে তোলে হীনম্মন্যতার বোধ, আত্মপীড়নের উৎকাঙ্ক্ষা। কিন্তু তবু, সব সর্বনাশের মধ্যেও, দেশীয় সংস্কৃতিগুলোর বোধহয় নিজেদের টিকিয়ে রাখার একটা প্রচন্ড কামনা ও চেষ্টা থাকে। লাতিন আমেরিকায় যেমন কোনকিস্তাদোরদের বসানো প্রলেপ আর আস্তর সরিয়ে ফেললে তথাকথিত চার্চগুলোর মধ্য থেকে বেরিয়ে আসে আসটেক, ইনকা ও মাইয়া মন্দিরগুলোর স্থাপত্য ও ভাস্কর্য, তেমনিভাবে ভারতবর্ষে, ১৮৩৫ সালে মেকলের সব বাণী সত্ত্বেও, বেঁচে থাকে—‘মরিয়াও মরে না’—ভারতীয় লোকসংস্কৃতির সব উপাদান ও মনোভঙ্গি।… এই যে দেনা-পাওনার ইতিহাস—ইউরোপ থেকে কিছু নেওয়া, আমাদের ঐতিহ্য থেকে কিছু বাঁচিয়ে রাখা—এটাই হয়তো ভারতীয় কথাসাহিত্যের চেহারাটি তৈরি করে দিয়েছে।’ (আধুনিক ভারতীয় গল্প ২/ ভূমিকা)

গ) ‘প্রশ্ন: তা হলে আপনার কাছে এইতির প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম ছিল নেগ্রিচুডের ধারণার এক সমর্থন, এক প্রত্যক্ষ প্রদর্শনী? সেজেয়ার: হ্যাঁ, সক্রিয় অবস্থায় নেগ্রিচুড। এইতি সেই দেশ যেখানে নিগ্রো মানুষ প্রথমবার মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল, একটা নতুন জগৎ একটা স্বাধীন জগৎকে স্পষ্ট আকার দেওয়ার প্রতিজ্ঞায় দ্ব্যর্থহীনভাবে নিশ্চিতভাবে ঘোষণা করেছিল।’ (‘দেশে ফেরার খাতা’/ এমে সেজেয়ার)

ঘ) ‘ক্রিকেট বা বিশ্বকাপ ফুটবলের সৌজন্যে আমরা যদি বা পশ্চিম ইনডিজ, জিম্বাবোয়ে, আফ্রিকার অন্য কোনও কোনও দেশ, ব্রাজিল, মেহিকো, আরহেনতিনার কথা সামান্য কিছু জানতেও পেরে থাকি, সেসব দেশ মহাদেশের সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে আজও আমাদের পরিচয় ধিক্কারজনকভাবে নগণ্য।’ (‘জানলা ১’/ ভূমিকা)

—এইভাবে, উপনিবেশের হাতে দলিত-বিপর্যস্ত দেশগুলোর লড়াকু কিন্তু ক্ষতবিক্ষত সাহিত্য—যার কেন্দ্রে আছে মাটিমানুষের আত্মপ্রতিষ্ঠার, আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ ইতিহাস—সেইদিকে বাংলা পাঠকের নজর একা হাতে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেন মানবেন্দ্র। এমনকী ঢুকে পড়লেন শিশু-কিশোর সাহিত্যের অঙ্গনে। ‘হরবোলা’ বা ‘জিয়নকাঠি’ তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। (এই দু’টিই কিশোরদের জন্য ‘তৃতীয় বিশ্বের গল্প সংগ্রহ’। সূচিপত্র দেখলে চমকে উঠতে হয়। তৃতীয় বিশ্বের অগ্রগণ্য লেখকদের চমকপ্রদ লেখালেখির সংকলন। অনুবাদ করেছেন বাংলার প্রথম সারির লেখক, কবি, প্রাবন্ধিকরা। মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে স্বনামে তো আছেনই তাঁদের মধ্যে, ছদ্মনাম ‘অধীর মজুমদার’ হিসেবেও আছেন। যৌথ-জমজমাট এই বই দু’টিকে বলা যায় এক সাহিত্য পরব। কিশোরদের ‘আধুনিক’ মন বুঝে নতুন বিষয়েরও উপস্থাপনা আছে। কিশোর সাহিত্যের নতুন জ্যামিতি!)

পাশাপাশি, হাহাকারের ভাষায় তিনি সতর্ক আর সচেতন করলেন আমাদের, ইউরো-কেন্দ্রিকতা ছেড়ে মুখ ফেরাতে শেখালেন উপেক্ষিত অথচ সমৃদ্ধ প্রান্তিকের দিকে: ‘কেন আমরা বাঁচতে দেবো না কাউকে তার ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য নিয়ে? কেন সবাইকে এক করে দিতে হবে আমাদের? এই বিপন্ন সময়ে কেন আমরা ভুলে যাবো যে,

বন্ধুতা হয় তার সঙ্গেই শুধু

আমার চাইতে অন্যরকম যেজন

নইলে ভাবো লক্ষ কোটি আমি

ছড়িয়ে আছি দেশের যোজন-যোজন!

তবে তা যে কী হতো দুঃসহ

সবখানেতেই আমারই বিগ্রহ!!’

(ভেদবিভেদ ২/ সম্পাদকের নিবেদন)

কীভাবে শুরু হল এই অনুবাদব্রত? আমাকে একদিন বলেছিলেন দু-একটি কথা। শুরু হয়েছিল ছাত্রাবস্থায়। বন্ধুরা যখন টিউশনি করতেন, তিনি বেছে নিয়েছিলেন অনুবাদ। ওই ছিল তাঁর রুটি-রুজি। এভাবেই চলেছে অনেক বছর। পুরনো কিশোরপাঠ্য অনুবাদগ্রন্থের পেছনের মলাটে আমিও দেখেছি বিজ্ঞাপন, মানবেন্দ্রমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে। কিন্তু কেন? ‘দ্যাখো, টিউশনি যদি করতাম, আমাকে পেত তো বড়লোকরা, সেসব ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আটকে যেতাম যারা অর্থনৈতিকভাবে বেশ সচ্ছল। অনুবাদ করলে কিছু টাকা পাওয়া যাবে, আর সেসব পড়তে পারবে অনেক ছেলেমেয়ে, সাধারণ যারা। সেসব ভেবেই অনুবাদে নেমে পড়লাম।’

পরবর্তী কালে তাঁর জীবনে এক্ষেত্রে বড় প্রভাব ফেলেছিলেন তাঁর মাস্টারমশাই বুদ্ধদেব বসু। পেয়েছেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সান্নিধ্যও। দূর থেকে আমাদের মনে হয়, অনুবাদব্রত আর রাজনীতির মিশেলে ওই দুই কিংবদন্তি যেন প্রতীকী ছায়া ফেললেন তাঁর কলমে।

কয়েকবার আমার সৌভাগ্য হয়েছে কয়েকটি কর্মশালায় তাঁর পাশের টেবিলে বসে অনুবাদের কাজ করার। লক্ষ করেছি, এত দীর্ঘ সাধনার অন্তেও কী একাগ্র দায়বোধ তাঁর। একটি লেখার, আমি প্রধানত দেখেছি কবিতার তর্জমা, কতগুলো খসড়া তিনি করে যান, কিছুতেই মন ভরে না। নিখুঁত অনুবাদের প্রতি তাঁর এই মরিয়া উদ্যম তরুণ অনুবাদকদের কাছে শিক্ষণীয়। তাঁর অনুবাদ হয়তো এ-কারণেই ব্যাপ্তি আর গভীরতায়, চিন্তনে আর সাবলীলতায় এত মসৃণ হয়ে উঠতে পারে।

জাগরণ

সবচেয়ে আগে

গলা ঝাড়ে পুরোনো প্রতিমা

তারপর ঝমঝম বেজে ওঠে উনুন

তারপর

কেৎলি কা-কা করে ওঠে

তারপর

লাগাম পরানো হয় টেবিলে

চেয়ারগুলো পা ঠোকে

আর ধোঁয়া তোলে কফি

আর এক নতুন দিন

খাপ থেকে খোলে তার ছুরি

(ইয়েশি হারাসিমোভিচ/ পোল্যান্ড)

হাতিয়ার

তোমার আছে বন্দুক

আর

আমার, ক্ষুধা।

তোমার আছে বন্দুক

কারণ

আমার আছে ক্ষুধা।

তোমার আছে বন্দুক

আর তাই

আমার আছে ক্ষুধা।

থাকুক তোমার বন্দুক

থাকুক তোমার হাজার বুলেট এমনকী আরও একহাজার

তুমি সব খরচ করে ফেলতে পারো আমার বেচারা শরীরে—

তুমি আমাকে খুন করতে পারো একবার দু-বার তিনবার

দু-হাজারবার সাতহাজারবার

কিন্তু শেষটায়

আমার কিন্তু চিরকাল তোমার চেয়ে বেশি হাতিয়ার থাকবে

যদি তোমার থাকে বন্দুক

আর আমার

কেবল ক্ষুধা।

(অটো রেনে কাস্তেইয়ো/ গুয়াতেমালা)

আমাদের কবিতাগুলো বর্ণহীন,

শব্দহীন, নখদন্তহীন।

যদি তুমি বাড়ি-বাড়ি চেরাগ নিয়ে ঘোরো,

আর সাধারণ লোকে যদি তাদের অর্থ না-বোঝে

তা হলে সবচেয়ে ভালো হয় যদি আমরা তাদের ছড়িয়ে দিই

হাওয়ায়

আর চিরকাল বাস করি নীরবতায়।

আহা! যদি একবার এই কবিতাগুলো হতো

কোনো মজুরের হাতের ছেনি আর বাটালি,

কোনো গেরিলা যোদ্ধার হাতের হাতবোমা,

শুধু যদি এই কবিতাগুলো,

শুধু যদি এই কবিতাগুলো হ’তো কোনো চাষীর হাতের

লাঙল…

(মাহমুদ দরবেশ/ প্যালেস্তাইন)

আমি হলফ করে বলতে পারি, সাম্প্রতিক বাংলা কবিতা সমকালের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এসব অনূদিত উচ্চারণ থেকে হামেশাই তার রসদ সংগ্রহ করে।

আশ্চর্য লাগে অন্য একটা ব্যাপারে। এত সযত্ন আয়াসে তিলে-তিলে গড়ে তোলা অনুবাদগুলো বিষয়ে তিনি উদাসীন। কখনও কখনও হঠাৎ মনে পড়ে একটা-দুটোর কথা, খোঁজ করেন এখানে-ওখানে, পাওয়া না-গেলে মুষড়ে পড়েন একটু, তারপর দ্রুত লেগে যান পরের অনুবাদে। কত পত্রিকায় কত সংকলনে পড়ে রয়েছে তাঁর কত গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদ, কত পরিচিতিমূলক নিবন্ধ। বইপাড়ায় আজ যা ছাপা রয়েছে, তা একেবারেই তাঁর পূর্ণাঙ্গ অনুবাদব্রতের ভগ্নাংশের ভগ্নাংশ। এসব সমগ্রতায় প্রকাশ হবে না?

বাংলার অন্যান্য কবি-অনুবাদকদের সঙ্গে তাঁর আরেকটা বড় পার্থক্য আছে। বুদ্ধদেব বসু তো জানিয়েই দিয়েছিলেন, যখন লিখতে পারেন না নিজের কবিতা, চলে যান পৃথিবীর অন্যান্য কবির সান্নিধ্যে। কবিদের প্রায় সবাই তাই করেন বলে অনুমান করি। মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, আমার মনে হয়, কাব্যচর্চা করেন উল্টো কারণে, তাঁর অনুবাদগুলো যাতে আরও মজবুত আর নিশ্ছিদ্র হয়। অন্যদের ক্ষেত্রে কেন্দ্রে থাকে কবিতা, পরিধিতে থাকে অনুবাদ। তাঁর ক্ষেত্রে অনুবাদব্রত কেন্দ্রে, পরিধিতে অন্যান্য সাহিত্যচর্চা। এমন এক অনলস তর্জমাকারী যে কোনও ভাষার শ্লাঘা, যে কোনও ভাষার বুনিয়াদি নির্মাতা।

মাঝে-মাঝে মনে হয়, তাঁর কোনও যোগ্য উত্তরসূরি যে তৈরি হল না বাংলায়, সে আমাদের দুর্ভাগ্য। ভাবুন, এখনও কত দেশের কত সাহিত্য আমাদের কাছে অজানা রয়ে গিয়েছে, কত নতুন উচ্চারণ আর পরীক্ষা-নিরীক্ষার কোনও হদিশই জানতে পারিনি আমরা। জানতে পারিনি এই ভারতবর্ষের নানা প্রান্তে কত জোরালো দুর্দান্ত লেখার রূপরেখা। মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন একদিন, ‘এই যে কামু-র আউটসাইডার, টলস্টয়-এর ওয়ার অ্যান্ড পিস কিংবা বোদলেয়র-এর দ্য ফ্লাওয়ার্স অফ ইভিল—এভাবে বলা তো ভুল। ওগুলো তো ইংরেজি অনুবাদের নাম। মার্কস-লেনিন থেকে গার্সিয়া মার্কেজ, নেরুদা থেকে দেরিদা—কেউ ইংরেজিতে লেখেন না। এসব নাম এত জনপ্রিয় কেন জানো, দ্রুত নির্ভরযোগ্য অনুবাদ করে ফেলে ওরা।’ একথা শুনে কষ্টে ভরে উঠেছিল মুখ, হাল্কা করতে বললেন, ‘ভেবো না, ভেবো না, ওদের আছে বাখ্তিন আর আমাদের আছে চার্বাক, স্কোর—চার-তিন! জিত আমাদের।’

এই সূত্রেই একটা স্বপ্ন আমি দেখি। তৈরি হয়েছে এক অনুবাদ আকাদেমি, যার মধ্যমণি মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর নেতৃত্বে আর উদ্যমে তৈরি হচ্ছেন এক যোগ্য অনুবাদকমন্ডলী, বাংলায় অজস্র তর্জমার মাধ্যমে তাঁরা গড়ে তুলছেন অত্যাশ্চর্য জ্ঞানভান্ডার। সেই কর্মযজ্ঞে সামিল হতে তরুণদের মধ্যে উদ্দীপনার জোয়ার!

এসব স্বপ্ন অবশ্য স্বপ্নই। কার কাছে আর বলি, কার কাছেই বা পাঠাই! একটা ঠিকানা অবশ্য আছে। খামের ওপর লিখব—‘যার মাথাব্যথা’!

পুনশ্চ: লোকটা আসলে একটা জানলা। অন্যেরা তার মধ্যে দিয়ে দেখতে পায়, আছড়ে পড়ছে আর ফুঁসে উঠছে সমুদ্দুর…

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*