কাজলদীঘি

জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

১৯৯ নং কিস্তি

তারপর একদিন ওকে আমার বাড়িতে ডেকে পাঠালাম। এলো।

এসেই প্রথমে আমার মেয়েকে দেখতে চাইলো। ওকে কোলে নিল। আমি বেশ ভাল করে লক্ষ্য করেছি ওর সব কিছু কেমন যেন ঠিক সাধারণের মতো নয়।

মাঝে মাঝেই মেয়ের শরীর খারপ হয়।

নাজমা ওকে ডেকে পাঠায়।

মেয়ে দেখলাম ওর কোলে থাকলে খুব একটা কাঁদতো না। ও ওকে কোলে নিয়ে বিড় বিড় করতো। মোমবাতি কিংবা প্রদীপ জ্বালিয়ে পরিষ্কার একটা ন্যাকড়া গরম করে আগে নিজের কপালে ঠেকাত তারপর ওর পেটে সেঁক দিত।

ফাঁক পেলেই বিবেকানন্দ নিয়ে ওর সঙ্গে কথা বলতাম। আমার কাছে যা দুর্বোধ্য লাগত ও খুব সহজ ভাষায় আমাদের জীবন থেকে এক একটা উদাহরণ দিয়ে ও বুঝিয়ে দিত।

কখন যে আমি নাজমা ওর সঙ্গে মানসিকভাবে জড়িয়ে পরলাম বুঝতে পারি নি।

একদিন নিজেই অফার করলাম। তুই যদি কিছু করিস আমি সাহায্য করবো।

তখন বললো, নেপলা, সাগির, আবতারের জন্য কিছু করে দাও।

তখন ভাবলাম ব্যাটা আস্ত পাগল। নয় অত্যাধিক শেয়ানা।

মেয়ের আবার শরীর খারাপ হলো। ও রক্ত দিল। ওর দিদির সঙ্গে সাতদিন হাসপাতালে কাটাল। সেই সময় ওকে অনেক কাছ থেকে দেখলাম। এতদিন ভাবতাম ও অভিনয় করছে। সেদিন বুঝলাম ও অভিনয় করছে না। এটাই ওর স্বভাব, প্রকৃতি।

একদিন কথায় কথায় নেপলাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, অনির এরকম পোষাক কেন। তখন বলেছিল, অনিদার কাকা মারা গেছেন। আমাদের হিন্দু কাস্টমসে এরকম একটা নিয়ম আছে। ঘটনাটা ও বললো। মেয়েটা চলে গেল, আল্লাহ ওকে আমায় দিল। তখন বলতে পারেন ও আমাদের পরিবারের লাঠি। নাজমাও কেন জানি অনি বলতে পাগল হয়ে উঠলো।

ও ঘন ঘন আমাদের বাড়িতে যাওয়া আসা শুরু করলো।

ওর সম্বন্ধে জানতে পারলাম। কাকার কথা বললো। নিজের জীবনের কথা বললো। মিত্রার কথা বললো, তনুর কথা বললো। সুন্দরের কথা বললো। যত শুনি তত অবাক। কলকাতায় খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পারলাম ও একটাও মিথ্যে কথা বলে নি।

একদিন নিজে থেকেই ওকে বললাম তুই চেষ্টা করেছিলি আমার মেয়েটাকে বাঁচানর, আমার কপালে লেখা নেই তাই ও থাকে নি। সত্যি কথা বলতে কি দাদা, মেয়েটা ওর কোলে শুয়েই মারা গেছিল।

আফতাবভাই কিছুক্ষণ মাথা নীচু কর চুপ করে থাকল।

আমি একদৃষ্টে আফতাবভাই-এর মুখের দিকে তাকিয়ে আছি।

মুখ তুলে আমার দিকে তাকাল। ছল ছল চোখ।

দেখ আমি কাঁদছি না। বিশ্বাস কর।

দাদার দিকে তাকিয়ে ছল ছল চোখে বললো। মেয়েটার সঙ্গে অনির অনেক ছবি আছে। বুঁচকি যেতে ওকে দেখিয়েছি ও এক কপি করে নিয়ে এসেছে।

আফু আঙ্কেল তুমি আন্টির গায়ে হাত দিয়ে প্রমিস করেছিলে। অনিসা ধরা গলায় বলে উঠলো।

ঠিক আছে আর বলবো না।

এতগুলো মানুষ এই ঘরে দাঁড়িয়ে। কারুর মুখে কোনও কথা নেই। চারদিক নিস্তব্ধ।

আমাদেরকে ঘিরে সবাই দাঁড়িয়ে। সবাই কেমন থম মেরে বসে আছে। নড়াচড়া করার শক্তিটুকু যেন কারুর নেই।

তখন অনি আমাদের ঘরের ছেলে। বিজনেসের ব্যাপারে ওর সঙ্গে আলোচনা করি। ও যে পথটা বলতো মাঝে মাঝে এ্যাপ্লাই করে দেখতাম উপকার হচ্ছে। ওর আইকিউটা ভীষণ স্ট্রং। বিপদের গন্ধ ও আগে থেকে বুঝতে পারে। দেখলাম অনেক ঘটনা ও মিলিয়ে দিচ্ছে।

একদিন বললাম, আমি তোকে তোর মিশনে সাহায্য করতে চাই।

ও কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো। তারপর বললো।

আমাকে একটু সময় দাও।

তারপর যত দিন গেছে ওকে নতুন করে জেনেছি।

আন্টি, আঙ্কেল গল্প করতে বসলে সারাদিন লেগে যাবে। তোমাকে এই কদিনে অনেক গল্প বলেছি। চলো খিদে লেগেছে এবার চেঞ্জ করে নেবে চলো। শুভ ভিড় ঠেলে এগিয়ে এসে দিদির হাত শক্ত করে ধরেছে।

আফতাবভাই একবার শুভর দিকে তাকাল।

দাদু আসে নি?

বেরিয়ে পরেছে, এবার এসে পরবে।

জানেন দাদা, শুভ নাজমার কোলে তিনসপ্তাহে কাটিয়ে এসেছে। ওর তখন এগার মাস বয়স।

আবার শুরু করেছো। অনিকা ঝাঁজিয়ে উঠলো।

তুমি থামবে। অনিসা বললো।

ঠিক আছে আর বলবো না। দাদা শুনতে চাইল।

সবাই শুনতে চাইবে।

বড়োমা অনিকার দিকে তাকিয়েছে।

অনিকা সামান্য হেসে বললো, তোমাকে পরে বলবো।

বড়োমার চোখ হাসছে।

সুরো পিসী। অনিকা চেঁচাল।

সুরো অনিকার দিকে তাকাল। চোখ মুখটা ভাল ঠেকল না।

বুঝেছি। তোমাকে দিতে হবে না।

ভালোদিদাই।

বল।

বৌদি রান্নাঘরের সামন থেকে সারা দিল।

তুমি রেডি করো।

করছি।

দাদা আমরা বাইরের বাগানে গিয়ে বসলে কেমন হয়? আফতাবভাই বললো।

খুব ভালোহয়, চলো।

দাদা উঠে দাঁড়াল।

ডাক্তারদাদা, আন্টি সবাই উঠে দাঁড়িয়েছে।

তনু।

মাসীমনির গলার শব্দ পেয়ে তাকালাম।

আমাকে একটু বাগানে নিয়ে চল।

তোমার অসুবিধে হবে না।

না।

ঘরের থিক থিকে ভিড়টা আস্তে আস্তে দালান তারপর সারা বাড়িতে ছড়িয়ে পরলো।

দুপুরের খাওয়া দাওয়া শেষে নীরুরা তাড়াহুড়ো করে নার্সিংহোমে গেল। কি জরুরি কাজ আছে। যাওয়ার আগে আমাকে বললো।

তুই কোথাও বেরচ্ছিস?

না।

বিকেলে মাসিমনিকে নিয়ে যাব।

কোথায়?

নার্সিংহোমে।

চেকআপ করবি?

হ্যাঁ।

আমি একটু নিজের বোনম্যারো টেস্ট করাব।

কনিষ্ক আমার মুখের দিকে তাকাল। একফালি হাসি ঠোঁটের কোনে প্রতিপদের চাঁদের মতো ভেসে উঠলো।

তুই কি এখনও পর্যন্ত টেস্ট করাস নি!

না। বলতে পারিস সেইভাবে ভাবি নি। যেটা ভেবেছিলাম অন্ততঃপক্ষে বিনয়দা তিয়ার সঙ্গে মিলে যেতে পারে। মেলে নি।

তোর সঙ্গে মিলেছে।

আমি কনিষ্কর দিকে অবাক হয়ে তাকালাম।

হ্যাঁরে। তোর শারীরিক সমস্ত ডকুমেন্টস আমার আর নীরুর কাছে আছে।

নীরু আমার হাতটা চেপে ধরলো।

হ্যাঁরে, সেইজন্য তোকে বলেছিলাম লড়বার একটা শেষ জায়গা তৈরি করেছি।

তোদের কি মনে হয়।

মাসিমনিকে এই কয়েকঘণ্টায় মানসিক দিক থেকে অনেকটা চাঙ্গা করেছি। অদ্ভূতভাবে আগের কিছু কিছু প্রবলেমও উধাও। এই ক্ষেত্রে যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

মসীমনি জানে।

স্যার বলেছেন। মাসীমনি তাতে যেন আরও বেশি মানসিক ভাবে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে।

রিকভার হবে।

যদি ঠিকঠাক অপারেসনটা করা যায়।

তোরা বলছিলি ডাক্তারদাদা কাদের ঠিক করেছে।

সব আন্টির রেকমেন্ডেসন। স্যার হেল্পার।

আন্টি সমস্ত কিছু দেখেছে?

হ্যাঁ।

ঝিমলি এতদিন দেখছিল।

জয়ন্তীকে সব জানিয়েছি।

দেখ একবার চেষ্টা করে। চেষ্টা ছাড়া আমরা কিছু করতে পারি না।

তুই মন খারাপ করিস না। দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। তোর শরীর ঠিক আছে।

নিজের বসে নেই, খালি ঘুম পেয়ে যাচ্ছে।

ঘুমো, কোনও অসুবিধে নেই।

ঠিক আছে তোরা যা।

কনিষ্ক, নীরু দুজনেই বেরিয়ে গেল। আমি ঘরে এলাম।

একা। গোটা কয়েক ফোন করে নিলাম।

খাওয়া দাওয়ার শেষ আফতাবভাই দিদিরা সব ডাক্তারদাদার বাড়িতে গেল।

মিত্রা, তনুরাও দেখলাম বেশ ব্যস্ত।

আসার পর মেয়েদের সঙ্গে ঠিকভাবে কথাই বলা হয়নি।

ওদের চলনে বলনে বুঝতে পারছি এই কদিনে ওরা বেশ স্বাবলম্বী হয়ে পড়েছে।

বসির শুভ-অনন্যদের সঙ্গে মিশে গেছে। বোঝাই যাচ্ছে না একে অপরের অপরিচিত ছিল।

চিকনারা কখন ফিরে গেল ঠিক বুঝতে পারছি না। হয়তো আমার ওঠার আগেই চলে গেছে।

মিত্রাকে যে জিজ্ঞাসা করবো সে ফুরসৎটুকু এখনও পাইনি।

অনিমেষদাদের একসঙ্গে আসার কথা ছিল। কেন এল না?

সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বার করে জানলার ধারে এলাম।

দু-চারটে টান মারার পরই মুখটা কেমন তেঁতো তেঁতো লাগল।

এটা একটা নতুন উপসর্গ। কয়েকদিন ধরে দেখছি এটা হচ্ছে।

ফেলে দিলাম।

আফতাবভাইরা কি আজ এ বাড়িতে থাকবে?

মিত্রার বাড়িতে থাকলে বরং ভাল হতো। ওর ওপর নিচের বেশ কয়েকটা ঘরে এসি লাগান।

গরমটা খুব একটা কম পরে নি। প্রায় মাঝে মাঝে বত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ ডিগ্রী উঠে যাচ্ছে। তবু এই বাড়ির চারদিকে এত গাছ আছে বলে ঠিক বোঝা যায় না।

আমি এত ভাবছি কেন?

আফতাবভাই আমার গেস্ট, মানে সকলের গেস্ট। প্রত্যেকেরই অতিথির দেখভাল করার দায়িত্ব আছে। তাছাড়া আমার থেকেও অনিমেষদাদের স্বার্থ বেশি জড়িয়ে আছে।

সকাল থেকে প্রবীরদা, অনুপদা, রূপায়ণদা কারুর দেখা পায়নি। প্রবীরদা দিল্লী গেছে। অনুপদা, রূপায়ণদা গেল কোথায়?

দূর শালা যততো সব উল্টোপাল্টা চিন্তা।

বিছানায় এসে টান টান হয়ে শুলাম। মাথার ভেতরটা কেমন শূন্য শূন্য মনে হচ্ছে।

সুকান্তকে বলেছিলাম লাস্ট আপডেট কি হলো আমাকে জানাস। ব্যাটা একটা ফোন কিংবা ম্যাসেজ পর্যন্ত করেনি। হয়তো অনিমেষদা টিপে দিয়েছে।

কাগজের কি হাল তাও জানি না।

এ কথা সে কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমে চোখ জড়িয়ে এলো। ঘুমিয়ে পরলাম।

না আফতাবভাই, জীবনে অনেক মানুষ আপনি দেখেছেন, আমরাও দেখেছি। তবে আমাদের মানুষ দেখার সঙ্গে অনির মানুষ দেখার অনেক পার্থক্য।

আমরা মানুষ দেখেছি বা তাদের সঙ্গে কথা বলেছি নিজেদের স্বার্থে। তারা আমাদের কাছে এসেছে নিজেদের স্বার্থে কিংবা আমাদের স্বার্থে। সেখানে মানুষ চেনার জায়গা হচ্ছে স্বার্থ।

দু-পক্ষের কেউ না কেউ সেই স্বার্থের সঙ্গে জড়িত।

অনির মানুষ চেনার পরিধি সম্পূর্ণ অলাদা। ও নিঃস্বার্থভাবে মেশে।

ও নিজে থেকে আপনাকে একটা অবলিগেশনে ফেলে দেবে। তারপর সেখান থেকে বন্ধনের পথ রচনা করে। ওর এই বন্ধনটা মারাত্মক। এতো স্ট্রং আপনিও তাকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেন নি। আমরাও পারি নি।

তাই দেখুন আমরা সবাই এক ছাদের তলায় বসে।

আপনি রুমাকে জিজ্ঞাসা করুণ। সেই অর্থে অনির সঙ্গে একমাত্র রক্তের সম্পর্ক রুমার।

সেটাও রুমা জানল ওর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার প্রায় ছাব্বিশ বছর বাদে। এই তো দিন পাঁচেক আগে ছোট, সুতপাদের নিয়ে রুমাদের ওখানে গেছিল।

রুমার প্রতি ওর ব্যবহারটা ঠিক আর দশজনের মতো ওদের চোখে লাগেনি।

সুতপার সন্দেহ হতে চেপে ধরলো। স্পাই হিসেবে তনু, মিত্রাকে গুঁজে দিল তখন আমরা সব জানতে পারলাম।

বিধানদা থামলো। সবাই শ্রোতা।

আমি যেন কারুর কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে আছি। গতকাল আমাকে যেন ঘুমে পেয়েছিল। কারুর সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না। সবাই এসেছে দেখেছি। কারুর সঙ্গে কথা বলিনি। কোন প্রকারে নাকে চোখে মুখে দুটো গুঁজে এসে আবার ঘুমিয়ে পড়েছি।

কোথায় কি হচ্ছে কে কোথায় শুচ্ছে তার কোন খোঁজ খবর রাখিনি।

আমাকেও কেউ জিজ্ঞাসা করেনি। বড়োমা একবার বলেছিল তোর কি শরীরটা খারাপ।

কোন কথার উত্তর দিইনি।

রাতে তনু, মিত্রা কখন এসেছে তাও জানি না। বেশ মনে আছে রাতে দুবার বাথরুম করতে উঠে নিজের কাজ সেরেছি। তনু, মিত্রা তখন অঘরে ঘুমচ্ছে।

এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে এই ঘরে সবাই আছে। বিধানদার গলা পেলাম। মাসীমনির কথা উল্লেখ করলো। তারমানে মাসিমনিও আছে।

আমি মরার মতো চোখ বুঁজে পড়ে আছি। আমার মাথাটা মন হচ্ছে নয় বড়োমা নয় ছোটোমার কোলে রয়েছে।

অনি এবার ওঠ। দিদির গলা পেলাম। আমার কপালে হাত রেখেছে।

তারমানে আমার মাথাটা দিদির কোলে।

তুমি ওকে এখন চিমটি কেটেও ওঠাতে পারবে না। যখন ঘুমবে না তখন তিন চারদিন ঘুমবে না। আবার যখন ঘুমবে তখন তিন চারদিন টানা ঘুমবে। কুম্ভকর্ণের ঘুম। মিত্রার গলা।

তোরা কিছু করতে পারিস না। আফতাবভাই-এর গলা পেলাম।

তুমি কিছু করতে পেরেছো।

আফতাবভাই গলা ছেরে হাসতে শুরু করলো।

কিগো তোমরা সবাই দিব্যি গল্প করে যাচ্ছ, আর ও পরে পরে ঘুমচ্ছে। সুরোর গলা।

সুরো মনেহয় ছিল না। ঘরে ঢুকলো।

তুই ডাক। মিত্রার গলা।

সরো দেখি।

না থাক। ও বড়ো একটা ঘুময় না। বৌদির গলা পেলাম।

তোমরাই ওকে লায় দিয়ে মাথায় তুলেছ। সুরো খ্যার খ্যার করে উঠলো।

ঘরের সবাই হাসছে।

তোকে চায়ের কথা বললাম। আফতাবভাই বললো।

মিলিদি নিয়ে আসছে। অনিদা।

সুরো ষাঁড়ের মতো চেঁচিয়ে উঠলো।

আর কতক্ষণ ঘুমবে। এগারটা বাজে।

থাক না। বড়োমার গলা পেলাম।

এই তুমি শুরু করলে। ছোটোমা বললো।

সেই কাল বিকেল থেকে ঘুমিয়ে যাচ্ছে।

সুরো জোড়ে ঠেলা মারলো। একবার চোখটা খুলে আবার চোখ বুঁজলাম। একটু গুঁটি সুঁটি মেরে জড়িয়ে জড়িয়ে বললাম, ঝামেলা করিস না।

তুমি কি আমাকে বৌদি পেয়েছো।

সুরো কাতাকুতু দিতে শুরু করেছে।

বিরক্তি ভড়া চোখে ওর দিকে তাকালাম।

দেখলাম দিদি নিচু হয়ে আমার মুখটা দেখছে।

হেসে ফেললাম।

ঘরের চারদিকটা একবার লক্ষ্য করলাম সবাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।

অনিমেষদা হাসছে।

সুরোর দিকে তাকালাম।

কাঁচা ঘুমটা ভাঙালি এর ফল কি হবে জানিস।

জানা আছে। অংশু বাড়িতে নেই।

তনু, মিত্রা জোড়ে হেসে উঠলো।

আমি সুরোর দিকে হাসি হাসি চোখে তাকিয়ে দিদির কোলে মুখটা গুঁজে উপুর হয়ে শুলাম।

মাথাটা টেপো তো, অনেকদিন টেপো নি।

ও কি তোমাকেও এরকম করতো। বৌদির গলা পেলাম।

দিদি হাসছে। তখন ওর মাথায় জটা ছিল।

সবাই হাসছে।

দিদি মাথায় হাত রেখেছে।

আমি দিদির শরীরের ওমে স্নাত। আষ্টে-পৃষ্ঠে জাপ্টে ধরে শুয়ে আছি।

ওরা ওদের মতো কথা বলছে।

হঠাৎ সবাই কেমন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আমার ঘারে ফোঁটা ফোঁটা জল পরলো।

ডাক্তারদাদা চেঁচিয়ে উঠলো। এই নাজমা এ কি করছো?

আমি একটু কাত হয়ে দিদির মুখের দিকে তাকালাম।

কারুর মুখে কোনও কথা নেই।

দিদির গাল বেয়ে জলের ধারা। চোখ দুটো ছল ছলে।

উঠে বসলাম। দিদির গলাটা জড়িয়ে ধরলাম।

ধরা গলায় বলে উঠলো।

কালকে অতটো দেখিনি। তোর মাথাটা এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত কাটা।

আফতাবভাই-এর মুখের দিকে তাকালাম। হঠাৎ কেমন মুখটা থম থমে হয়ে গেল।

নিস্তব্ধ ঘর।

সব ডাক্তারদাদা। বুঝলে। তিনটে মাস আমাকে নিয়ে শুধু এক্সপিরিমেন্ট করে গেল। সুস্থ হয়ে রাগের চোটে আন্টিকে গুঁজে দিলাম।

এমনভাবে কথাটা বললাম, দিদি কান্নাভেঁজা চোখেও হেসে ফললো।

চিবুকটা ধরে দিদির দিকে তাকিয়ে বললাম, বলো ডাক্তারদাদাকে কেমন শাস্তি দিলাম।

সবাই হেসে ফেলেছে।

ডাক্তারদাও মুচকি মুচকি হাসছে।

আন্টি রাজরাণীর মতো সোফায় ঠেসান দিয়ে বসে। ঠোঁটের কোনে হাসির ঝিলিক।

ভ্রু নাচিয়ে বললাম, আন্টির মুখটা দেখছো।

জব্বর শাস্তি। দাদা বলে উঠলো।

দমবন্ধ হওয়া পরিস্থিতি থেকে ঘরের সমস্ত মানুষ মুক্ত হলো।

একবার মিত্রা, তনুর দিকে তাকালাম।

ওরা এক দৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে।

সুরোও কেমন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে।

অংশুকে বলিস একমাসের মাইনে কমিশন হিসাবে দিতে। না হলে চাকরি নট।

সুরো হেসে ফেললো। আফতাবভাইও হাসছে।

তুই কিছু বললি না। আফতাবভাই বললো।

আমার বিয়ের দিন বাইরের ওই ফুটপাথে বসে কমিশন নিয়ে গেছে। আবার ছেলে হওয়ার দিন রাত দেড়টার সময় আমার সঙ্গে দেখা করতে এসে কমিশন নিয়েছে। সারাজীবন ওকে দিয়ে গেলেও ওর কমিশন শোধ করতে পারব না।

আমার কাছ থেকেও চায় বুঝলি। আফতাবভাই বললো।

এবার অনিমেষদা, বিধানদা দুজনেই জোরে হেসে উঠলো।

হ্যাঁ অনিমেষবাবু। ওর কমিশনটা বড় বিটকেল।

কালকে শুভর দাদু কি বললো শুনলেন। দিদি বললো।

কি বলেছে ? বৌদি তাকালো দিদির দিকে।

ও তুমি সেই মুহূর্তে ছিলে না। অনিমেষদা বললো।

রুমাদির সঙ্গে কি কথা হচ্ছিল। হাসতে হাসতে শুভর দাদু বললেন, একদিন কথা প্রসঙ্গে অনি বলেছে। শুভর টাইটেলটা আপনার। শুভ আমার। ওকে নিয়ে বেশি ভাববেন না। দিদি বললো।

তুমি একবার ভাবো সুতপা। কি সাধারণভাবে কথাটা ও বলে দিয়েছে।

অনিমেষদা, বিধানদা হেসেই চলেছে।

মিকি, মাম্পিকেও চেয়েছে। সুরো বলে উঠলো।

আমি সুরোর দিকে তাকিয়ে হাসছি।

ওই জন্য আমিও এখন ওর মতো কমিশন চাইতে শিখেছি। আফতাবভই চেঁচিয়ে উঠলো।

এবার দেখলাম দিদি খুব জোড় হেসে উঠলো। চোখের জল শুকিয়ে এসেছে।

আমি দিদির দিকে তাকালাম।

কিগো মনে হচ্ছে কেশ জন্ডিস।

তোকে জানতে হবে না।

আমি উঠে দাঁড়ালাম।

তুই বড়োমার ঘরের বাথরুমে যা। মিত্রা বললো।

কেন?

আমরা এখন এখান থেকে কেউ উঠবো না।

বেশ পাটি পেরে বসেছিসি মনে হচ্ছে।

আফতাবভাই আবার জোড়ে হসলো।

সুরোর মুখের দিকে তাকালাম।

এ ঘরে ঢুকবো চায়ের কাপটা টেবিলে থাকবে মনে রাখিস।

হুঁ।

আমি ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।

একটু তাড়াতাড়ি করিস। অনিমেষদা পেছন থেকে কথাটা ছুঁড়ে দিল।

বারান্দায় এলাম। দেখলাম বাগান শুনশান।

গেটের বাইরে পুলিস পোস্টিং হয়েছে। একটা বড়ো ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে।

এ ঘরে এসে ঢুকলাম।

দেখলাম ইসি, মিলি রান্নাঘরে গোঁতাগুঁতি করছে। আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।

ঘুম ভাঙলো। ইসি বললো।

তুই কখন এলি।

তোর চোখে নেবা হয়েছে। কাল থেকে আছি।

আচ্ছা তুমি যে এই কথাটা বললে, কোনও রিপার্কেসন পাবে।

মিলির দিকে তাকিয়ে হাসলাম।

কনিষ্ক বেরিয়ে গেছে?

মিলি হাসলো। সব জমা হচ্ছে মনে রাখবে।

পর্দা সরিয়ে আমি বড়োমার ঘরে ঢুকে পড়লাম।

ফাঁকা ঘর বিছানার ওপর টান টান করে চাদর পাতা।

আমি বাথরুমে ঢুকলাম।

কাল রাতে শোয়ার আগে অর্জুনকে ফোন করেছিলাম। ব্যাটা ত ত করছিল। কাজটা এখনও করতে পারেনি।

শ্যামেরা এসেছিল, মাসীমনির সঙ্গে দেখা করে চলে গেছে। ওদের সঙ্গে কথা বলতে পারি নি। সুকান্তর ব্যাপারে বললো। ও ঘন ঘন এখন শ্যামেদের সঙ্গে বসছে। ব্যাপারটা অনেকটা পজিটিভ।

অনাদি, সাগরের লাস্ট আপডেট সুকান্তর দেওয়ার কথা ছিল। ব্যাপারটা কতদূর গড়াল কিছুই বুঝতে পারছি না।

ওরা কখনই ছেড়ে কথা বলবে না।

ওদের পেছনেও একটা ভাল লবি কাজ করছে। লবির মাথাটা ভেঙে ফেলতে হবে।

নম্রতাকে অনেকটা স্বাভাবিক দেখছি। কাজের মধ্যে রাখতে হবে। ও কথা দিয়েছে পিকুকে ও সামলে নেবে। কিন্তু নয়না আমার এই সব কাজ কর্ম মেনে নেবে? যতই হোক নিজের স্বামী।

বড়ো মুস্কিল।

বাবা।

অনিসা দরজা ধাক্কাতে শুরু করেছে।

তোমার কাছে তো ফোন নেই। তাহলে এত দেরি কেন?

নিজের মনে নিজে হাসলাম। তারমানে সেদিনের ঘটনা বৌদি ওদের বলেছে।

যাচ্ছি দাঁড়া, হয়ে এসেছে। আর একটু।

তুমি এখুনি বেরবে।

তোরা বড়ো বিরক্ত করিস।

তাড়াতাড়ি গা মুছে বেরলাম।

দেখলাম অনিকা সোফায় বসে আমার দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে।

বেশ সুন্দর একটা শালোয়াড় কামিজ পরেছে। এখন ওকে খুব সাধারণ মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে কোনও রাইস ঘরের মেয়ে। শালোয়াড়ের রংটা এতো সুন্দর ওর শরীরের রং যেন ফেটে বেরচ্ছে।

বোন মামার চোখটা দেখেছিস?

দেখতে দাও।

চোখটা নামিয়ে নিয়ে হাসলাম।

কিগো তুমি টাওয়েল পরে দাঁড়িয়ে থাকবে নাকি।

মার কাছ থেকে একটা পাজামা পাঞ্জাবী নিয়ে আয়।

নিয়ে এসেছি।

দে। তোরা একটু বাইরে যা।

কেন আমাদের সামনে পরতে তোমার লজ্জা করছে?

খুব কথা শিখেছিস।

মেয়ের গালটা ধরে একটু টিপে দিলাম।

পোষাকটা কোথা থেকে জোগাড় করলি?

অনিকার দিকে তাকালাম।

ঝাক্কাস পোষাক, না লাগালে লোকে পাত্তা দেবে না।

আমাকে?

তোমার কথা আলাদা। তুমি এ্যাবসোলুইট ন্যাচারাল। বিজ্ঞান কখনও প্রকৃতির সঙ্গে পেড়ে উঠেছে। ক্ষণিকের জন্য তাকে বাঁধতে পেরেছে। তুমি প্রকৃতি তুমি তোমার আপন খেয়ালে চলো। আমরা তোমার সৌন্দর্য উপভোগ করি।

আমি অনিকার দিকে তাকিয়ে হাসছি।

একটু বলো, তোমার কথার ঠিক ঠিক উত্তর দিলাম কিনা।

আমি গেঞ্জীটা গলিয়ে পাজামাটা গলাতে গেলাম।

মেয়ে হাতটা চেপে ধরলো।

কিগো ড্রয়ারটা পরবে না!

এখন তো কোথাও বেরব না।

তা বলে!

দূর পাছু গরম হয়ে যাবে।

অনিকা খিল খিল করে হেসে উঠলো।

সত্যি তোমাকে এতো লোকে কেন যে….।

তুমি দেখো দিদি মা, ছোটোমা কেন ফেডআপ এখন বুঝি।

আমি হাসছি।

ঠিক আছে তুই যখন বলছিস দে পরছি।

না পরতে হবে না। বিকেলে লোকজন আসবে তখন পরবে।

আবার কে আসবে!

আফু আঙ্কেল কোথাও যাবে না। আবু আঙ্কেলকে বলেছে। যা কিছু করার এ বাড়িতে। বিকেলে সব মন্ত্রী আমলারা আসবে।

ও সব তোদের ব্যাপার।

রাঘুআঙ্কেল বিকেলের ফ্লাইটে আসছে।

কেন!

সেন্ট্রালের হয়ে রিপ্রেজেন্ট করবে।

ও।

তুমি জানো না যেন?

আমি কি অপারেট করছি যে জানবো।

তুমি লাস্ট ডেটাটা পেলে কোথা থেকে?

মেয়ের মুখের দিকে তাকালাম।

বলো না। আমি জানি আমাদের থেকেও তুমি শুভকে ভীষণ ট্রাস্ট করো। ও বারতি একটা কথাও বলে না।

মেয়ের গাল আপেল রংয়া।

যতটুকু প্রশ্ন ততটুকু উত্তর। কথা তো নয় যেন মাখনের ভেতর ছুড়ি চালাচ্ছে।

তুই শুভকে জিজ্ঞাসা কর।

এই ব্যাপার নিয়ে আমার সঙ্গে কোনও কথা বলে না।

কেন?

ওটা আমার থেকে তুমি ভালো জান।

তুইও সব সময় ওকে ঠিক ঠিক বলিস না। তাই ও বলে না।

আমি সব সময় ওকে কো-অপারেট করি ও করে না।

নিশ্চই তোর মধ্যে কোন ফাঁক-ফোকর আছে।

অনিসা মাথা নীচু করে রইল।

অনিকা উঠে এলো।

বলো না মামা। লাস্ট ডেটাটা না পেলে ওই জায়গায় প্রজেক্ট হতো না। ওদের লবিটা ভীষণ স্ট্রং ছিল।

তোদের আগে জানা উচিত ছিল।

এতো ঘটনার পরেও এটা হতে পারে বিশ্বাস করতে পারিনি।

শুভকে জিজ্ঞাসা করিস।

বলবে নাকি। সাত চরে রা করে না।

আমি বড়োমার ড্রেসিন টেবিল থেকে চিরুনিটা নিয়ে মাথায় দিলাম। আয়না দিয়ে দেখতে পাচ্ছি দুজনেই স্থির দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে।

কিরে তোর বাপকে….।

পেছন ফিরে তাকালাম।

সুরো বড়োমার ঘরের গেটের মুখে দাঁড়িয়ে।

দু-বার চা করলাম দু-বার জুড়িয়ে গেল।

আমি রেডি।

দেখতেই পাচ্ছি।

ভদ্র লাগছে না অভদ্র লাগছে।

সুরো মুচকি মুচকি হাসছে।

পিসী মামা ভেতরে কিছু পরেনি। অনিকা বললো।

উত্তর পেলে।

আমি অনিকার দিকে তাকালাম।

তোদের ঘর থেকে বেরতে বলেছিলাম।

এ্যাঃ লজ্জাবতী লতা। সুরো ফর ফর করছে।

বাবা আমার কথার উত্তর দিলে না।

পেয়ে যাবি, অপেক্ষা কর।

আবার কি হলো! সুরো বললো।

ওই যে তোমাকে তখন বলছিলাম।

তোর পিসেমশাই কয়েকদিন আগেও বাড়ি ফিরে সারাদিনের হিসাব দিত। এই করলাম সেই করলাম। গত তিন-চারদিন স্পিকটি নট। কিছু জিজ্ঞাসা করলে বলে। কিছু হলে তো বলবো।

মেয়ে মুখ টিপে হাসলো।

ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।

রান্না ঘরে মাসিকে দেখলাম। আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।

এই হাসির অন্তর্নিহিত অর্থ আছে।

মিলি, ইসি টেবিলে খাবার গোছাচ্ছে।

টানা ঘুমিয়ে শরীর ঠিক করলি। তিন চারদিন ঘুমবি না। আবার যুদ্ধে লেগে পড়তে হবে।

মসি গড় গড় করে উঠলো।

আমি মাসির দিকে তাকিয়ে হাসলাম।

মেয়ে, অনিকা কিছু যেন আঁচ করতে পারল। আমার মুখের দিকে তাকাল।

তোর সৈন্য সামন্তরা টেরও পায় না তুই কি করছিস। এ্যাসিস্টেনটা ভাল জোগাড় করেছিস। একবারে তোর মতো। বোকা-সোকা কিছু বোঝে না। নিজের সম্বন্ধে কেআরলেস। কিছু বললে বোকার মতো হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। এরিমধ্যে ডিটো তোকে নকল করতে শিখে গেছে।

সুরো একবার আমার মুখের দিকে তাকায় একবার মাসির মুখের দিকে।

তোমার কথা কিছু বুঝছি না মাসি। সুরো বললো।

ভাবছিস ও ঘুমিয়ে আছে বলে সব ঘুমিয়ে আছে।

খালি বাজে বক বক। আমি বললাম।

হ্যাঁ, মাসি তো বক বক করে। আমি যা খবর পেয়েছি দিদিকে ডেকে সব বলছি।

দিদির থেকেও বড়ো বস চলে এসেছে।

দাদাকে তুই ঠুঁটো জগন্নাথ বানিয়ে দিয়েছিস।

যাঃ কতো কটিটাকার মালিক জানো?

আমার জানা হয়েগেছে। পেটে ধরিনি বলে কি তোর চালচলনের কোনও গন্ধ পাই না ভেবেছিস। ওই তল্লাটে ষাট-ষাটটা বছর কাটিয়ে দিলাম।

তোমাকে নিয়ে আর পারা যাবে না। চা এ ঘরে দেবে, না ও ঘরে।

হেসে কথাটা উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করলাম।

ও ঘরে যা, নিয়ে যাচ্ছি।

ইসি, মিলি, সুরো, অনিকা, অনিসা এতক্ষণ মাসির কথা শোনে আর আমার মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। ওরা ঠিক ঠাহর করতে পারে না।

আমি ঘর থেকে বাইরের বারান্দায় এলাম। দেখলাম বাগানে নেপলারা সকলে গোল হয়ে বসে আছে। সাগির, অবতারও আছে। ওদের দিকে তাকিয়ে হাসলাম।

তোদের সঙ্গে একটু পড়ে বসছি।

ওরা হাত নারলো।

অনিকা, অনিসা আমার দু-পাশে।

আমি এ ঘরে এসে ঢুকলাম। দেখলাম ওরা সবাই খাচ্ছে। ঘরোয়া খাবার। আমাকে দেখেই সবাই হেসে উঠলো।

হাসছো যে।

আমি সবার দিকে তাকিয়ে কথাট ছুঁড়ে দিলাম।

পায়ে পায়ে খাটের একটা কোনায় দিদির পাশে গিয়ে বসলাম।

ছোটোমা একবার অনিকা, অনিসার মুখের দিকে তাকাল। চোখ দেখে মনে হল কিছু যেন একটা আঁচ করার চেষ্টা করছে। মুখে কিছু বললো না।

কাল রাতে কেমন ঘুম হলো। আফতাবভাই-এর দিকে তাকালাম।

দারুণ।

কোথায় শুলে, বুঁচকির ঘরে?

না। ডাক্তারবাবুর বাড়িতে।

অসুবিধে হলো।

তোকে বলতে গেছি।

মিত্রা, তনু দুজনেই ফিক করে হেসে উঠলো।

ইসি, মিলি, সুরো, দামিনীমাসি ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকলো।

ওরা চায়ের ট্রে টেবিলে রাখলো, দামিনীমাসি কচুরীর প্লেটটা আমার দিকে এগিয়ে দিল।

আমার চোখে চোখ রেখেছে। অনিমেষদা, বিধানদা এক দৃষ্টে মাসির দিকে তাকিয়ে।

দাদা আপনারা ওকে কিছু করতে পারবেন না। নাজমা তুমি ওকে আটকাও।

দামিনীমাসি বড়োমার দিকে তাকাল।

তুমি, আমি, ছোটো, সুতপা ওকে কিছু করতে পারব না।

কি হয়েছে মাসি?

দিদি তাকাল দামিনীমাসির দিকে।

তোমায় কাল একটা কথা বলেছিলাম।

হ্যাঁ। আমি ফোন করে দিয়েছিলাম।

ওটা ও টোপ ফেলেছিল। সাদাচোখে আমরা ওটাই বুঝব। আসলটা আজ ইসলাম ফোন করলো। তবু ও বললো এটাও ফলস মনে হচ্ছে মাসি। থার্ড লাইনটা খুঁজে পাচ্ছি না।

সবাই মাসির মুখের দিকে তাকিয়ে।

দিদি আমার মুখের দিকে তাকাল।

আমি পরিতৃপ্ত সহকারে কচুরী চিবচ্ছি।

মাসীমনি আমার মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে।

বাসন্তীর খোঁজ পেয়েছো। দিদি বললো।

আজ সকালে ফিরে এসেছে। ওর পেট থেকে কিছু বার করতে পারিনি। মনে হচ্ছে ও কাউকে দায়িত্ব দিয়ে এসেছে।

দিদি আফতাবভাই-এর দিকে তাকাল।

তোমর সঙ্গে অর্জুনের শেষ কথা কখন হয়েছে?

ঘণ্টা-দুয়েক আগে। কেন!

মিত্রা আমার ফোনটা টেবিলে আছে একটু নিয়ে আয়।

দিদি মিত্রার দিকে তাকাল।

তুমি ওকে জিজ্ঞাসা করো, শুভ অংশুকে ও কোথায় পাঠিয়েছে। কাল রাতে দুজনে এক সঙ্গে খেয়ে এ বাড়ি ছেড়ে গেছে। সকাল থেকে দুজনের টিকি পাওয়া গেছে? নম্রতা কোথায়?

মাসি আমার দিকে কট কট করে তাকিয়ে। যেন প্রতিশোধ নিচ্ছে।

সুরোকে জিজ্ঞাসা করো সকাল থেকে অংশুর ফোন অফ। সুরো ওর শ্বশুর মশাইকে ফোন করেছিল, বললো দু-তিনবার অংশুর সঙ্গে কথা হয়েছে।

আমি খুব স্বাভাবিক গলায় বললাম, মাসি এবার চা দাও। কচুরীটা গরম হলে বেশ ভালোলাগতো।

সবাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।

মিত্রা ফোনটা নিয়ে এসে দিদির হাতে দিল।

তুমি কাকে ফোন করবে। আফতাবভাই বললো।

দাঁড়াও বলছি। দিদি ফোনের বটম টিপতে শুরু করেছে।

আমি কথা বলেছি। আফতাবভাই বললো।

কি বললো?

সব ঠিক আছে।

না ঠিক নেই।

দিদি অনিমেষদার মুখের দিকে তাকাল।

দাদা অনাদি, দেবার লাস্ট আপডেট আমাকে একটু দেবেন।

ওখানে কোন গণ্ডগোল হওয়ার কথা নয়। হাই সিকুরিটি প্রোভাইড করা হয়েছে।

ওই সিকুরিটির মধ্যে অনির লোক রয়েছে।

অনিমেষদা কেমন হতাশ দৃষ্টিতে দিদির মুখের দিকে তাকাল। ফোনটা হাতে তুলে নিল।

আপনি একটু পরে ফোন করবেন আমি আগে কথা বলে নিই।

কিরে তুই চুপচাপ বসে আছিস কেন। বড়োমা গড় গড় করে উঠলো।

মিনু তুমি কোনও কথা বলবে না। মাসীমনি বলে উঠলো।

নাজমা তুমি আর কিছুক্ষণ পর ফোন করো।

দিদি হাঁ করে মাসীমনির মুখের দিকে তাকাল।

মাসীমনি, বিধানদার দিকে তাকাল।

তুমি একবার প্রজেক্টটা যেখানে হবে সেখানকার জোনাল কিংবা ব্রাঞ্চে ফোন করে দেখো কোন গণ্ডগোল হয়েছে কিনা।

প্রবীরকে ফোন করলেই জানতে পারব।

প্রবীরের কাছে খবর আসবে না। যখন আসবে তখন কাজ শেষ হয়ে যাবে।

ওই জোনটা কে দেখে অনিমেষ। বিধানদা বললো।

কিছুটা রূপায়ণ, বাকিটা অনুজ।

তুমি রূপায়ণকে একটা ফোন করো। মাসীমনি অনিমেষদার দিকে তাকাল।

অনিমেষদা পকেট থেকে ফোন বার করে রূপায়ণদাকে ফোনে ধরলো।

নিস্তব্ধ ঘর আমি চায়ে চুমুক দিয়েছি। দাদা, ডাক্তরদাদা আমার মুখে দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে।

হ্যালো….হ্যাঁ আমাদের সামনে বসে আছে…. কেন?

অনিমেষদার মুখটা হঠাৎ কেমন থমথমে হয়ে গলে গলার স্বর গম্ভীর।

….ঠিক আছে লাস্ট আপডেট নিয়ে আমাকে দাও।….হ্যাঁ হ্যাঁ বিধানবাবু আছেন। আমরাও সেরকম একটা আঁচ পেয়েছি।

অনিমেষদা বৌদির মুখের দিকে তাকাল।

…. কে আবার মাসি বললো।….হ্যাঁ হ্যাঁ রুমাদি ব্যাপারটা ধরতে পেরেছে।….না প্রবীরকে ফোন করি নি।….না অনুজের এগেনস্টে ড্রস্ট্রিক এ্যাকসন এই মুহূর্তে নেওয়া যাবে না।….ওর সঙ্গে তাহলে বসতে হবে।….কি বললে, বিনোদ ?

অনিমেষদা আমার মুখের দিকে তাকাল।

এই নামটা নতুন শুনছি। আগে কখনও শুনি নি।….ঠিক আছে তুমি লাস্ট আপডেট দাও, তারপর দেখছি।….হ্যাঁ হ্যাঁ বিকেলে মিটিং অবশ্যই হবে।

অনিমেষদা ফোনটা পকেটে রাখতে রাখতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। রেগেগেলে অনিমেষদার চোখ দুটো কেমন ছোট ছোট লাগে। বুঝলাম ভেতর ভেতর আমার ওপর ভীষণ রেগে আছে।

আফতাবভাই-এর দিকে তাকিয়ে ইংরাজীতে ফোনে যা কথা হলো সব বললো।

বিনোদ!

কথাটা বলেই আফতাবভাই আমার দিকে তাকাল। চোখর ভাষা বদলেগেছে।

মিত্রা অনির ফোনটা কোথায়?

টেবিলে।

নিয়ে আয়।

আফতাবভাই অনিকার দিকে তাকাল।

তোর কাছে লাস্ট আপডেট কি আছে?

অর্জুন ভাইয়ার সঙ্গে বিনোদ নিজে কথা বলেছে।

কেন?

বলেছে আমি অনিদার নুন খেয়েছি তুই এই কাজটা আমাকে করতে দে।

তুই তো জানিষ বিনোদ আমাদের এ্যান্টি। অর্জুনকে পেলে ও ছাড়বে না।

অর্জুন ভাইয়া সে কথা আমাদের বলেছে। শুভ অর্জুন ভাইয়াকে মামার নাম করে ম্যাসেজ করে সব জানিয়েছে। শুভকে যে ডেটা দিয়েছে তাদেরকে মারার জন্য বিনোদকে ঠিক করা হয়েছিল।

ওরা এখন কোথায়?

কলকাতার একটা হোটেলে আছে। কোথায় আছে জানতে পারিনি। আবু আঙ্কেলকে পাঠিয়েছি। শুভ ওদের সঙ্গে আছে। বিনোদ সকালে হোটেলে এসে শুভর সঙ্গে দেখা করে গেছে।

তোকে কে বললো?

অর্জুন ভাইয়া।

অর্জুন কিছু করে নি!

মামার লোক খবর পৌঁছে দিয়েছে এখন কিছু করবি না। বিনোদ অর্জুন ভাইয়া একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে।

কেন!

মামা দুজনকে কিছু একটা নিশ্চই বলেছে। অর্জুনভাইয়াও একটু অবাক হয়েছে। অর্জুনভাইয়াকে বিনদ বলেছে তুই এদিকটা সামলা, আমি ওইদিকটা সামলে নিচ্ছি। এটা অনিদার ইজ্জত কা সাওয়াল। আমরা থাকতে অনিদাকে কোনওদিন হারতে দেব না। এটা আমাদের পেট।

আমার মাথায় ঠিক ঢুকছে না!

খবরটা পাওয়ার পর আমিও ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। তুমি ওখানে যে ভাবে বললে।

তোকে কে খবর দিল?

সকালে নয়না আন্টির কাছে একটা ফোন আসে। পরিচয় দেয় সে বিনোদ। মামার নাম করে বলে আপনি সাগরকে রাখতে চান না সরিয়ে দিতে চান।

নয়না আন্টি কেঁদে ফেলে।

তারপর বিনদ বলে, আপনার উত্তর পেয়ে গেছি। অনিদা আপনার পার্মিসন নিয়ে কাজটা করতে বলেছিল। আপনি নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন বিনোদ থাকতে সাগরের গায়ে কেউ হাত লাগাতে পারবে না।

তুই কি গল্প বলছিস!

তুমি বিশ্বাস করো। নয়না আন্টিকে তুমি জিজ্ঞাসা করো। সেই সময় শুভ নয়না আন্টিকে ফোন করে। অনিমামার মনের ইচ্ছে কি জানায়। নয়না আন্টি আমাদের কিছু বলে নি।

নম্রতা কোথায়?

সকালে ছিল। আমাদের সঙ্গে কাজ করেছে। তারপর একটা ম্যাসেজ এলো। বললো পিকু ডাকছে। পরে পিকুই ফোন করে অনিসার কাছে নম্রতাকে চায়। বলে নম্রতার ফোনের স্যুইচ অফ। ওকে একটু দে।

(আবার আগামীকাল)

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*