বন্ধ্যাত্ব আসতে পারে কিন্তু অচেনা পথ ধরেও

সৌম্য সিংহ

জানেন কি সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্তির পথ ধরে নিঃশব্দে এসে পড়তে পারে  বন্ধ্যাত্ব? হ্যাঁ, গবেষণা বলছে ফেসবুক কিংবা হোয়াটস অ্যাপে দিনরাত বুঁদ থাকার হয়ে থাকার মারাত্মক পরিণতি হতে পারে এই  বন্ধ্যাত্ব। কোলে ল্যাপটপ নিয়ে টানা অনেকক্ষণ কাজ করার অভ্যাসও আমন্ত্রণ জানাতে পারে বন্ধ্যাত্বকে। বেহিসেবী উচ্ছৃঙ্খল জীবনও অবরুদ্ধ করে দিতে পারে সন্তানলাভের পথ। মদের ফোয়ারা আর সিগারেটের  ধোঁয়ায় স্বচ্ছতা হারানো রাতজাগা পার্টি-কালচারেও হারিয়ে যেতে পারে বাবা-মা হওয়ার স্বপ্ন। শত্রুর ভূমিকা নিতে পারে অস্বাভাবিক ওজন তথা ওবেসিটিও। তাই সময় থাকতে সাবধান না হলেই বিপদ। 

এতো গেল আত্মসংযমের অনুশীলন কিংবা নিজেকে আমূল বদলে ফেলার প্রয়োজনীয়তার কথা,কিন্তু যা কিছু নিজেদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে? যেমন স্বামী বা স্ত্রী কারওরই শরীরে কোনও অসুবিধে নেই, আপাত নিখুঁত প্রজননতন্ত্র,তবুও সন্তান আসছে না- তা হলে? কী তার সমাধান? আর কোনও অসঙ্গতি যদিও বা থেকে থাকে এবং তা সন্তানলাভের পথে জটিলতা সৃষ্টি করে থাকে,তারই বা অবসান কোথায়? এমন বেশ কিছু জটিল সমস্যা মোকাবিলার পথ দেখালেন ডা.শিউলি মুখোপাধ্যায়। নিজে অবশ্য নামটা লেখেন ডা. শিউলী  মুখার্জ্জী।বয়সের বিচারে তাঁকে বলা যেতেই পারে তরুণী চিকিৎসক, তবে  ইনফার্টিলিটির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রশ্নে তাঁর শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতার গভীরতা কিন্তু নিরাশার অন্ধকারের বুকে জ্বালিয়ে চলেছে আশার আলো। তাঁর লেখা বই ‘মা হওয়া মুখের কথা’য় লক্ষ্য করা গেছে সেই আলোরই প্রতিফলন। সত্যিই সফল এই সানন্দা প্রয়াস।এই সূত্রেই আমরা কথা বলেছিলাম ডা. মুখোপাধ্যায়ের  সঙ্গে। দীর্ঘ আলাপচারিতার মধ্যে দিয়েই  উঠে এসেছিলো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর এবং মনে রাখার মতো তথ্য। তিনি বেশ সহজভাবে দিলেন কিছু বিকল্প পথের সন্ধানও। যা নিয়ে অবশ্য এতদিন অনেকেরই ধারণাটা ছিল বেশ অস্পষ্ট।   

জানুন সত্যটাকে

এটা সত্যিই লজ্জার বিষয় যে এত প্রগতিশীল চিন্তাধারার মধ্যেও সন্তানহীনতার জন্য আজও অনেক জায়গাতেই আঙুল তোলা হয় মেয়েদের দিকেই। অথচ এটা পরীক্ষিত সত্য যে বহুক্ষেত্রেই অক্ষমতার দায়টা মোটেই স্ত্রীর নয়,আসল সমস্যাটা লুকিয়ে রয়েছে স্বামীরই মনে কিংবা শরীরে। অথবা এমনও হতে পারে,আপাতভাবে দু’জনের মধ্যেই কোনও সমস্যা নেই তবুও অধরা সন্তানলাভের স্বপ্ন। ডা. মুখোপাধ্যায় কিন্তু তুলে ধরেছেন সত্যটাকে। ব্যাখ্যা করেছেন গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর হাত ধরে  কীভাবে অস্বাভাবিকতা দেখা দিচ্ছে শুক্রাণুর মধ্যে। পুরুষের লাইফস্টাইলের পরিবর্তনের ফলে কেমন করে কমে যাচ্ছে স্পার্ম কাউন্ট। শুধু কি তাই,নেমে যাচ্ছে শুক্রাণুর গুনগত মানও। আবার সুনির্দিষ্ট গতিশীলতা না থাকার ফলেও তা হারিয়ে ফেলছে কর্মক্ষমতা।সমস্যাকে জটিল করছে এর অস্বাভাবিক আকৃতিও। ফলে বন্ধ্যাত্ব বেড়ে চলেছে পুরুষের মধ্যেও। এখানেই শেষ নয়,ডায়াবিটিস কিংবা হাইপারটেনশন যেমন যথাযথ চিকিৎসার অভাবে পুরুষত্বহীনতার কারণ হতে পারে,স্ট্রেস ম্যানেজমেন্টের অভাবেও তেমনি দেখা দিতে পারে ইনফার্টিলিটি।বিশেষ কিছু ওষুধ কিংবা রাসায়নিকের দাপটে কিংবা অন্য কোনও আঘাতে ক্ষমতা কমে যেতে পারে টেস্টিসের।সমস্যা তৈরি করতে পারে অত্যধিক পরিশ্রম,অনিদ্রা কিংবা মেয়েদের মেয়েদের মেনোপজের মতো ছেলেদের অ্যান্ড্রোপজ। পিটুইটারি বা থাইরয়েডের সমস্যাও উৎসাহ জোগাতে পারে বন্ধ্যাত্বকে। মনে রাখা দরকার,ল্যাপটপ কোলের ওপরে রেখে টানা কাজ করলেও কমে যেতে পারে স্পার্ম কাউন্ট। তবে না, এ সবের জন্য নিরাশ হওয়ার কিছু  নেই। ধন্যবাদ অত্যাধুনিক প্রযুক্তিকে। সঙ্গে আছে অ্যাসিস্টেড রিপ্রোডাক্টিভ টেকনিক। বাবা হওয়ার পথ দেখাতে পারে আই ভি এফ। স্পার্মের সংখ্যা তলানিতে ঠেকলেও বাবা হওয়ার সাধ পূরণ করতে পারে ইকসি নামের এক প্রযুক্তি। তবে পুরুষের সেক্সুয়াল ডিসফাংশন থাকলে দেখা দরকার মানসিক দিকটাও।

অসম্ভব নয় সমাধান    

অন্যদিকে মেয়েদের সন্তানহীনতার এখন অতি পরিচিত কারণ পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম। সন্তানধারণের সময়ে,তার আগে কিংবা পরে অনেক সময়ই আজকাল সমস্যা তৈরি করছে ইউটেরাইন ফাইব্রয়েড। জটিলতার কারণ হতে পারে ইউটেরাস বা জরায়ুর টিউমারও।পলিসিস্টিক ওভারির সমস্যার শুরু মূলত বয়সসন্ধিতে। ইঙ্গিত অনিয়মিত পিরিয়ড। দেহের ওজনবৃদ্ধি উৎসাহিত করে এই সমস্যাকে। বিপদ আসতে পারে বংশগতির ধারাতেও। ইস্ট্রোজেন হর্মোনের ভারসাম্যের অভাবে কিছুটা ঘাটতি দেখা দিতে পারে নারীর কোমলতায়।আবার ইউটেরাসের ফাইব্রয়েডও এখন রীতিমতো আলোচনার বিষয়। অনেকে একে টিউমার বললেও ব্যাপারটা একটু অন্যরকম। জরায়ুতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে পারে নানা আকারের ফাইব্রয়েড।ইস্ট্রোজেনের মাত্রার হ্রাসবৃদ্ধির ওপরে নির্ভর করে এর হ্রাসবৃদ্ধি। কিন্তু এই ফাইব্রয়েডই অনেক সময় কারণ হতে পারে মিসক্যারেজের। গর্ভধারণের পরে সন্তান বেরিয়ে আসতে পারে মাঝপথেই। প্রথম তিনমাস তাই ঝুঁকিটা একটু বেশিই।ইস্ট্রোজেন- প্রজেস্টেরনের প্রভাবে বাড়তে পারে ফাইব্রয়েডের আকার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব বলছে দুনিয়াজুড়ে প্রায় ২২৩৫ মিলিয়ন মহিলা এখন ইউটেরাইন ফাইব্রয়েডের শিকার।একটু বেশি মোটা হয়ে গেলে তো আর কথাই নেই। তবে মেনোপজের পরে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে গেলে ফাইব্রয়েডের আকার ক্রমশ কমতে কমতে সাধারণত মিলিয়ে যায়।ডা. মুখোপাধ্যায় স্পষ্ট জানিয়েছেন ফাইব্রয়েড কিন্তু ক্যানসারে পরিণত হয় না। অবশ্য ক্যানসারযুক্ত টিউমার হলে অন্য কথা। ১০০০জনের মধ্যে মাত্র  একজনের তা হতে পারে। তবে অতিরিক্ত রক্তপাত বা তেমন কোনও অসুবিধে হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি।সচেতনতা গড়ে উঠলে বিশেষজ্ঞের সহায়তায় পলিসিস্টিক ওভারি বা ইউটেরাইন ফাইব্রয়েড সামলেও মা হওয়া যায়।তবে এন্ডোমেট্রিওসিস না্মে এক ধরনের জটিলতার কারণে রক্তে পরিপূর্ণ চকোলেট সিস্ট তৈরি হলে ল্যাপ্রোস্কোপির সাহায্যে তা নির্মূল করে ফেলা উচিত। শুরুতে কন্ট্রাসেপ্টিভ পিলও বেশ ফলপ্রসূ হতে পারে। পরে আর্টিফিশিয়াল রিপ্রোডাক্টিভ টেকনিকের সাহায্যে দ্রুত গর্ভসঞ্চার সম্ভব। মনে রাখা দরকার পলিসিস্টিক ওভারি হোক কিংবা ইউটেরাইন ফাইব্রয়েডই হোক, সমস্যা মোকাবিলার পথ কিন্তু দেখাতে পারে সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং পরিবর্তিত জীবনযাত্রা।

তবুও কেন?    

অনেক সময়ই দেখা যায় স্বামী-স্ত্রী দু’জনেরই সবকিছু স্বাভাবিক,তবুও সন্তান আসছে না স্ত্রীর গর্ভে। স্বামীর স্পার্ম-কাউন্ট,স্ত্রীর ডিম্বানু নিঃসরণ,জরায়ু,ডিম্বাশয়,ফ্যালোপিয়ান টিউব,দম্পতির হর্মোন –সব ঠিকঠাক,তবুও সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে না গর্ভধারণের। এটাকে আনএক্সপ্লেন্ড ইনফার্টিলিটি হিসেবে বর্ণনা করা হলেও এর নেপথ্যেও আছে যুক্তিসঙ্গত  কারণ এবং ব্যাখ্যা। অনেক সময় দেখা যায় ফ্যালোপিয়ান টিউব ওভারি নিঃসৃত ডিম্বানুকে না পারছে ঠিকমতো লুফে নিতে,না পারছে শুক্রাণুকে ডিম্বানুর দিকে ঠিকমতো ঠেলে দিতে।ফলে তৈরি হচ্ছে না ভ্রূণ।স্ত্রীর জননতন্ত্রে টিবি থাকলে,অ্যান্টিস্পার্ম অ্যান্টিবডি থাকলে কিংবা স্বামীর শুক্রাণু গতি হারালে সমস্যা টের পাওয়া মুশকিল। অবশ্য হতাশ হওয়ার কিছু নেই,কিছু না হলে শেষে আই ভি এফ পদ্ধতিই পথ দেখাবে সন্তানলাভের।

1 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*