দেশভাগের রক্তের ছিটে যে স্বাধীনতায় তারই নাটক ‘হৃদিপাশ’

সুদেব সিংহ

দেখেছি আমারই হাতে হয়তো নিহত

ভাই বোন বন্ধু পরিজন পড়ে আছে ;

পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন ;

মানুষের জীবনে থিতু হওয়া একটা বড়ো প্রশ্ন। মানুষ স্বস্তিতে বাঁচতে চায়। কথায় বলে সুখের চেয়ে সোয়াস্তি ভালো। আমেরিকা, ইউরোপ-সহ প্রথম বিশ্বের দেশগুলিতে বাইরে থেকে আসা মানুষ নিয়ে ভীষণ সমস্যা। এশিয়া, আফ্রিকা, আরব বিশ্ব থেকে ইমিগ্রেন্সরা কেবলই প্রথম বিশ্বের দিকে ধেয়ে যাচ্ছেন। অস্ট্রেলিয়া, কানাডায় বিদেশিদের পিটিয়ে মারা হচ্ছে—এরকম ঘটনাও বিরল নয়। এই পরিস্থিতিতে ব্রাত্য বসুর নতুন নাটক ‘হৃদিপাশ’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাজার বছরের পুরোনো গ্রিক নাটক ‘ইডিপাশ’ সারা পৃথিবী জুড়ে নানা সময় মঞ্চস্থ হয়েছে। এই কলকাতায় শম্ভু মিত্রের প্রযোজনায় এই নাটক বিপুল সাফল্য পেয়েছে। কিন্তু ব্রাত্য বসু হৃদিপাশ নাটকটিতে ইডিপাশের কাহিনি নিয়ে এসেছেন একেবারে ভিন্ন মাত্রায়। স্বাধীনতা এবং দেশভাগে সেইসব অস্থির দিনগুলো যেন স্মরণ করিয়ে দেওয়া হলো দর্শককে। ইডিপাশের ট্র্যাজিডির কাহিনি আমরা সকলেই জানি। ইডিপাশ তাঁর পিতাকে হত্যা করেছিলেন এবং মাতৃগর্ভে সন্তান উৎপাদন করেছিলেন। এই মর্মান্তিক বিষয় ঘটে গিয়েছিল সবটাই তাঁর অজান্তে। তিনি যেন হয়ে উঠেছিলেন ভাগ্যতাড়িত এক ভবঘুরে।

সেই যন্ত্রণার কাহিনিকে নাট্যকার ব্রাত্য বসু জুড়ে দিলেন দেশভাগ এবং স্বাধীনতার প্রেক্ষাপটে। পরিচালক দেবাশিস যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে এই জটিল নাটক পরিচালনা করেছেন। নাটকের আখ্যান শুরু হয় পূর্ববঙ্গে। পুব বাংলার বাঙালি মুসলিমদের বিবাহরীতি ফের একবার আমরা মঞ্চে দেখার সুযোগ পেলাম। এই বিবাহবাসরের দৃশ্যটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লুচি, রসগোল্লা, পান্তুয়ার আবহে হঠাৎ ঢুকে পড়েন গান্ধী, নেহরু, জিন্না কিংবা বরিশালের যোগেন মণ্ডল। বাংলায় নিপীড়িত দলিত মানুষের রাজনীতিও স্থান করে নেয় এই বিবাহবাসরে। হিন্দু-মুসলমানের সহাবস্থানের নিপুণ ছবির পাশাপাশি হাজারও জটিলতার পরত নাট্যকার জুড়ে দিয়েছেন নাটকের আখ্যান ভাগে।

মুসলিম যুবক হৃদয় কুসুমের সঙ্গে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হতে চায়। বাতাস যেন তাঁকে বার্তা দেয় যে সে তাঁর পিতা-মাতার পালিত পুত্র। নিজের জন্মরহস্য জানতে সে ছুটে যায় গ্রামের দেবীর কাছে। দেবী তাঁকে জানান, সে হবে পিতৃ হত্যাকারী এবং মাতৃ ধর্ষণকারী। এই বাস্তবতাকে এড়াতে হৃদয় ছুটে পালায়। সীমান্ত পেরিয়ে হাজির হয় কলকাতা শহরে।

১৯৪৬ সালে ১৬ আগস্ট সেদিন ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে। ভয়ংকর দাঙ্গা চলছে কলকাতা শহরে। শ্যামবাজার মোড়ে তাঁর হাতে এক ব্যক্তি খুন হন। অথচ হৃদয়কে অস্ত্র ধরতে হয়েছিল নিতান্তই নিজের প্রাণ বাঁচাতে। এই ঘটনার পর হৃদয় পালিয়ে যান মানভূমের আদিবাসী অঞ্চলে। ওই অঞ্চলের এক বিপজ্জনক পরিস্থিতি নিজে হাতে সামাল দিয়ে সেখানকার আদিবাসী মানুষের মন জয় করেন তিনি। তাঁদের রাজা হন। তাঁর সঙ্গে বিবাহ হয় ওই গোষ্ঠীর রানির। যখন হৃদয় তিন পুত্র-কন্যার পিতা, জমি মাপার কাজে সেখানে উপস্থিত হয় তাঁর ছোটোবেলাকার এক কাকা। তাঁর কাছ থেকে জানা যায়, আসলে এই রানি এবং তাঁর পূর্বেকার প্রেমিকের পুত্র হৃদয়।

এই ভয়াবহ সত্য উদ্ঘাটিত হয়। বোঝা যায় ইডিপাশ কাহিনির বৃত্ত পুরো হলো।

এরই মধ্যে নাটকে এসেছে ভয়াবহ দাঙ্গা দেশভাগের মর্মান্তিক সব মুহূর্ত। দৃশ্য উপস্থাপন এবং কম্পোসিশনের নানা ব্যবহার ঘটিয়ে সেই সব অন্ধকারের দিনরাত্রিগুলি দারুণ উপস্থাপন করেছেন পরিচালক দেবাশিস। হৃদয়ের চরিত্রে সুমিতের অভিনয় দারুণ। সংগীত পরিচালনা শুভদীপ গুহ চমৎকার কাজ করেছেন। কোরাসে গাওয়া আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি… গানটি চমৎকার ব্যবহার করা হয়েছে। দেশ ভেঙে দু-টুকরো হচ্ছে, দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে চলছে প্রাণঘাতী হানাহানি। এরই মধ্যে ফিরে এসেছে রবীন্দ্রনাথের এই গানটি। সেই মুহূর্তে ‘পৃথিবীর পথে এই নিহত ভ্রাতার ভাই হয়ে ওঠে হৃদয়’— সে জানুক বা না জানুক তাঁর হাতে পিতৃহত্যা যেন অনিবার্য। সর্বস্ব হারানো মানুষের শেষ সম্বলটুকু কেড়ে নেওয়ার মুহূর্তে আরও কী কী ঘটেছিল আমরা সব জানি না। আমাদের কৌম-এর স্মৃতির ঝাঁপিতে যে অন্ধকার রয়েছে, তাঁর মধ্যে থেকে নাট্যকার হৃদিপাশ নাটকটিকে আহরণ করেছেন।

সংগ্রমী মা মাটি মানুষ পত্রিকা ১৮ আগস্ট ২০১৭ সংখ্যায় প্রকাশিত

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*