একলব্যের সাধনা : শঙ্করীপ্রসাদ বসু

লায়েক আলি খান

অনার্স শেষ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম ১৯৭৪ এর প্রায় শেষ দিকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিলম্বিতলয় এর কাজ কর্মের কারণে। বিভাগে এসে পেলাম আমার এতদিনের স্বপ্ন ও ধ্যানের মানুষটিকে।

এতদিনকার নিভৃত শ্রদ্ধা, কি করে আত্মনিবেদনে বদলে গেল সেই মনো বিশ্লেষণ আমার সাধ্যাতীত। শুধু এখনো, এই প্রৌঢ়ত্বের প্রান্তে পৌঁছেও, চোখ বুজলে ‘বন্ধু কেবল তোমায় দেখি’। শংকরীবাবুর ক্লাস। তাঁর আসা, আসন গ্রহণ, বসার ভঙ্গি, কথাবলা, পাঠ বিশ্লেষণ- সব মৌলিক। নিজস্ব। পন্ডিত নয়, বিদ্বান নয়, মুখস্থ বিদ্যার বাঁধা বুলির পুনরুচ্চারণ নয়। বিষয়ের ওপর অনায়াস আধিপত্য। শব্দের নির্বাচন, ব্যবহৃত শব্দের তাৎক্ষণিক বদল, সংশোধন — এক অপূর্ব শিল্পকর্ম। আর সেই উচ্চারণের উদাত্ততা!

সে ছিল এক কঠিন পরীক্ষা কাল। তাঁকে শোনা। তাঁর কথা লেখা আর তাঁকে দেখা- একসঙ্গে এর যে কোনো একটা থেকে সরে যাওয়া মানে ক্ষতি। সে যুগে হাতে হাতে রেকর্ডিং এর ব্যবস্থা ছিল না। জেরক্স সিস্টেম ছিলনা তখন। কিন্তু তবুও তাঁকে খাতায় টুকতাম, উল্লেখ্য পয়েন্ট, বাক্য আর দেখতাম মানুষটিকে সানন্দ গাম্ভীর্যে উচ্চারণ করছেন বাক্য। বিশ্লেষণ করছেন মানব-মানবীর চরিত্র। আনুপুঙ্খ। হোক তা মধ্যযুগের সাহিত্যের রাধিকা। কিংবা বঙ্কিমচন্দ্রের হাতের শ্রী বা সীতারাম। তাঁর ক্লাস মানে অভিজ্ঞতা । প্রতিটি ক্লাস ছিল অভিনব প্রাপ্তির বিস্ময়ে পরিপূর্ণ।

সেই সময়ই, মধ্যযুগের সাহিত্য ছাত্ররা পড়ছে না। সমস্ত সুন্দরী ও আধুনিক ছাত্র-ছাত্রীরা মধ্যযুগ ছেড়ে অন্যান্য বিষয় রাখছেন। আধুনিক কবিতা পড়াবার লোক নেই । অতএব অসিত বাবু , তখন বিভাগীয় প্রধান, আমার আবেদনের ভিত্তিতে ডেকে পাঠালেন তাঁর রুমে । শোনালেন আধুনিক বাংলা কবিতা এবছর কেউ নেই পড়াবার । অন্য কিছু নাও। তখন বিনা বিচারে লিখে দিলাম সেই আবেদনপত্রে – বৈষ্ণব সাহিত্য । কবিতা তো পড়বো। বৈষ্ণব কবিতা। আর পড়াবেন যিনি তিনি শঙ্করীপ্রসাদ বসু । বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন –

‘কবিতারে ভালোবেসে আরো ভালোবেসেছি নারীরে। নারীরে বানীরে তাই এক মনে হয়’।

আমার কাছে একটু বদলে গেছে তখন কথাটা। বিদ্যাপতি কে ভালোবেসেছি আমি যাঁর প্রেমে পড়ে, তিনি শঙ্করীপ্রসাদ বসু। চন্ডীদাস ও বিদ্যাপতি, মধ্যযুগের কবি ও কাব্য পড়ার আনন্দ একরকম। কিন্তু বিদ্যাপতি, গোবিন্দদাস, চন্ডীদাসের ক্লাসে তাঁকে শোনা আর এক অভিজ্ঞতা। তিনি আমাদের হাত ধরে সেই আনন্দলোকে নিয়ে যান অনায়াসে।

আমি দক্ষিণ বঙ্গের একটি প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে গিয়েছি নগর কলকাতায়। ক্লাসের অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীই শহুরে হবার জন্য একান্ত প্রয়াসী। মাস্টার মহাশয়দের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা চলছে। দেখছি। চিরকালীন মুখচোরা স্বভাবের কারণে এসব হয়ে ওঠেনা। ‘ এত যাকে চাই ‘ তাঁকেও কোনদিন বলা হয়নি। কিন্তু চোখের কি কোন ভাষা থাকে (থাকে নিশ্চয়!) শরীরের সবচেয়ে সক্রিয় অংশ বুঝি চোখ. হয়তো সে ভাষার নিবেদন, প্রশংসা, স্তুতি তাঁর সংবাদী হৃদয় ধরতে পেরেছিল। সূত্রটা বোধহয় ক্লাসের কোন প্রশ্ন-উত্তরের ঘটনা।

একদিন বাংলা বিভাগের আধো আলোছায়া মাখা করিডোরে মুখোমুখি তাঁর। সেই সম্ভ্রান্ত আবির্ভাব। চিনে নিলেন মুহূর্তে । অনুষঙ্গ হীন হঠাৎ জিজ্ঞাসা : কী লেখাপড়া হচ্ছে ? কই কোনো লেখা পত্তর দেখাচ্ছ না তো! নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছি না । সারা শরীরে অসম্ভব উত্তেজনা। ঘাম ছি । কোনো রকমে উচ্চারণ করলাম : দেখাবো স্যার । তার পরক্ষণে দুজনে দু’ দিকে।

কয়েকদিনের মধ্যেই একটা লেখা জন্ম নিল। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য নিয়ে আমার প্রথম লেখা। ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন এর কৃষ্ণ কি গতকৃষ্ণ’। ‘মধ্যযুগের কবি ও কাব্য’ পাঠের প্রতিক্রিয়া। শঙ্করীপ্রসাদ বসু কে প্রতিবাদ করে কৃষ্ণ চরিত্রের কালিমা ক্ষালনের বালক সুলভ স্পর্ধা। বাংলা বিভাগের ওপরের সব বিভাগের স্যারেদের বিশ্রাম কক্ষ। শঙ্করীপ্রসাদ বসুর চেয়ারের পেছনে দাঁড়িয়ে, আমি স্যার কে ধরিয়ে দিয়েছি লেখা টি। স্যার দেখছেন। পৃষ্ঠা চারেক। খুদে খুদে অসমান লাইনে লেখা। বানান ভুলে ভরা ও উতল এলোমেলো। দুরু দুরু বক্ষে অপেক্ষমান এক তরুণ ভক্ত। নৈবেদ্য কি প্রত্যাখ্যাত হবে!

নোটটা পড়লেন। সাজানো যুক্তিগুলো স্বীকার করেই বলে উঠলেন : তুমি এরকম ভাবো? বেশ। লেখো।

অনার্স এ কত নম্বর পেয়েছিলে? — ভালো না। ভালো নম্বর পেতে চাও! — হুঁ। তবে হাতের লেখা বদলাও। জানি এম এ তে আর লেখা ভালো হবে না। কিন্তু বড় বড় চৌকো চৌকো করে লেখ। ‘চা লা কি’। শব্দ টা লিখে দিলেন খাতার পাশে। আমার লেখা থেকে শব্দ টা তুলে নিয়ে। আর বানানের দিকে নজর দাও।

আরেকটা ছবি আছে। এম এ র রেজাল্ট বেরোনোর সাথে সাথে ক্যানিংয়ের ডেভিড সেশুন হাইস্কুলে চাকরি পেয়েগেছি। এলএলবি শেষ পরীক্ষা দেওয়া হল না। বাড়ির অমতে শিক্ষকতা বেছে নিয়েছি। একদিন গবেষণার কাজে বাংলা বিভাগে গিয়েছি, সেই করিডোরে দেখা। প্রণাম করে উঠে দাঁড়াতেই বাম বাহু ধরে স্পষ্ট প্রশ্ন : কি করছো এখন? — মাস্টারি। শুনেই হাসি। এতদিন আমরা ছাত্রদের মাথা খেয়েছি। এবার তোমরা শুরু করলে। পড়াশোনা করছো না, মোটা হচ্ছো কেন? বোঝালেন পড়াশোনা না করলে মোটা হয়।

মাঝে আর যোগাযোগ ছিল না।

১৯৭৮-এ ‘বিবেকানন্দ সমকালীন ভারতবর্ষ’ যখন সাহিত্য আকাডেমী পেল — ভাবলাম একটা চিঠি লিখব। স্বভাব ভীরুতার সংকোচে লেখা হলো না। যোগাযোগ না থাকলেও স্যারের খবরও লেখাপত্র নিয়মিত আমার নজরে, সংগ্রহে জমে উঠছে। যে খেলা আমি বুঝি না, সে বিষয়ে তাঁর লেখাগুলো পড়ছি। কেবল তাঁর নামের মন্ত্রগুণে। আর কি চমৎকার তাঁর লেখার নামকরণ — ‘ক্রিকেট সুন্দর ক্রিকেট’, ‘বল পড়ে ব্যাট নড়ে’, ‘ইডেনে শীতের দুপুর’, ‘নিবেদিতা লোকমাতা’, ‘সুভাষচন্দ্র ন্যাশনাল প্ল্যানিং’, ‘কবি ভারতচন্দ্র’, ‘সুর নৃত্যের উর্বশী’, ‘রসসাগর বিদ্যাসাগর’, ‘বিবেকানন্দে উদ্ভাসিত সুভাষচন্দ্র’ কেবল তথ্যের আকর নয়। এসব গ্রন্থে একটি মানুষের অসাধারণ ভাষা- শিল্প সাধনার শীলমোহর আঁকা হয়ে আছে।

স্যারের সঙ্গে আমার শেষ দেখা হলো বিশ্ববিদ্যালয় কর্মজীবনের শেষ অধ্যায়ে। প্রফেসর পদের জন্য সাক্ষাৎকারের টেবিলে। অফিস প্রবল গোপনীয়তা রক্ষা করে ইন্টারভিউর ব্যবস্থা করেছে কলকাতায়। কাকে এক্সপার্ট আনা হবে আমায় জানায় নি। জানার কোন আগ্রহ ছিল না আমার।

বোর্ডে ঢুকেই চমকে গেলাম। সেই আনন্দময় মূর্তি! আমার জীবন জুড়ানো হাসি। ‘তৃপ্তি আমার অতৃপ্তি মোর’। কী গভীর স্নেহে অভ্যর্থনা। আমার ডি.লিট গবেষণার কাজ যত্ন করে দেখলেন। অরবিন্দ রবীন্দ্র প্রসঙ্গের অংশটা খুঁজে নিয়ে পড়ে নিলেন এক ঝলক। মুখে তৃপ্তির হাসি। ভালো কাজ করছো, কোন টুকরো লেখালেখিতে মন দিও না। কাজটা শেষ করো। মানে আমার কাজটা

‘রবীন্দ্র প্রবন্ধ সমীক্ষা’ (প্রাক নোবেল পর্ব)। অর্থাৎ ১৯১৩ অবধি। তাতেই রবীন্দ্র প্রবন্ধের প্রায় ৬০০ অধিক প্রবন্ধ কালানুক্রমে আলোচিত হয়েছে। পরবর্তী কাজ করে চলেছি এখনো। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমি যদি শেষ করি একদিন, স্যারকে তো দেখাতে পারবো না….। যাইহোক। ইন্টারভিউ শেষে স্যার বললেন, চলে যেও না। একসঙ্গে চা খেয়ে যাবো। গোপন ভাবে যাঁরা এক্সপার্ট ডেকেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, গুরু-শিষ্যের এই সাক্ষাৎকারে আশ্চর্য ও বিস্মিত। আর আমি কর্তৃপক্ষের কাছে আজও কৃতজ্ঞ, সাক্ষাৎকারটা তাঁরা ঘটিয়ে দিয়েছিলেন বলে।

তাঁর বড় ছেলে সুদীপের কাছে শুনলাম — বাড়িতে পড়ে গিয়ে কোমরে আঘাত পেয়ে শয্যাশায়ী স্যার। খুব কষ্ট পেয়ে চলে গেছেন অসাধারণ জীবন রসিক ও বিদগ্ধ মানুষটি। জ্ঞান ও জীবনচর্চার বহুমুখী বিস্তার ছিল তাঁর প্রতিটি রচনায়। তা হতে পারে মধ্যযুগের সাহিত্য, জীবনী রচনা, খেলা-সাহিত্য বা রস-সাহিত্য, সর্বত্রই তিনি ছিলেন মৌলিক ও মুখ্য। মানে অথরিটি। আমার ‘প্রসঙ্গ বৈষ্ণব সাহিত্য’ বইটি আমার প্রিয় স্যারকে উৎসর্গ করেছি — একলব্যের সাধনায়।

1 Comment

  1. লায়েক আলী খান সাহেবের গুরু – তর্পণ পড়ে মুগ্ধ হলাম। আদর্শ শিক্ষাগুরুর সার্থক শিষ্য তিনি। অধ্যাপক বসুকে শুধুমাত্র বিবেকানন্দ গবেষক বলে একটি গন্ডী র মধ্যে আটকে রাখা ঠিক নয়, বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*