দেহ-মনের এক নিঃশব্দ ঘাতক অবসাদ

সৌম্য সিংহ

অব্যক্ত অনুভূতি।স্বস্তির পথে একটা অদ্ভুত শূন্যতাবোধ। অকারণ দুঃখবোধ। কিছুই যেন ভালো লাগছে না। কিছুতেই যেন মন বসছে না। হ্যাঁ, এমন একটা অনুভূতি মাঝেমধ্যেই যেন পেয়ে বসে অনেককে। কিছুক্ষণের জন্য,কিংবা কয়েকটা দিনের জন্য। তারপরে আপনা থেকেই মিলিয়ে যায় তা। এর মধ্যে কিন্তু তেমন কোনও অস্বাভাবিকতা নেই, থাকার কথাও নয়। উদ্বেগটা ডেকে আনে তখনই, যখন এই অনুভূতির মেয়াদটা হতে থাকে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর। দৈনন্দিন জীবনে বা স্বাভাবিক কাজকর্ম আর আচরণে বিঘ্ন ঘটায় এই ধরণের অনুভূতি। বিঘ্নিত করে স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধি,সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কিংবা মেধাকে।আসলে হতে পারে ধীরে ধীরে, নিঃশব্দে মনের মধ্যে বাসা বাধতে শুরু করেছে অবসাদ। শুধু ইংরেজিতে নয়, বহু ভাষাতেই যা জায়গা করে নিয়েছে Depression নামে। মনস্তত্ত্ব বলছে ডিপ্রেসড মুড মাঝে মধ্যে গ্রাস করতেই পারে একজন মানুষকে। তবে তা সাময়িক। কিন্তু দীর্ঘ অবসাদ বা ডিপ্রেশন ধীরে ধীরে আত্মপ্রকাশ করতে পারে নিঃশব্দ ঘাতক হিসেবে। স্বাভাবিক কারণেই উদ্বিগ্ন বিশ্বমানব। এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ‘হু’ এর রিপোর্টে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে সামনের কয়েক বছরে এই ডিপ্রেশন বা অবসাদ দুনিয়া জুড়ে নিতে পারে দ্বিতীয় বৃহত্তম মহামারির আকার। সেই সঙ্গে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যদিও পুরুষ কিংবা মহিলার শৈশব, কৈশোর, যৌবন কিংবা বার্ধক্যের যে কোনও মুহূর্তেই থাবা বসাতে পারে এই অবসাদ, কিন্তু পুরুষদের তুলনায় সাধারণত মহিলারাই এতে আক্রান্ত হয়ে থাকেন বেশি।

আগমন-বার্তা

কী করে বুঝবেন যে চুপিসাড়ে আপনার অজান্তেই হৃদয়কে গ্রাস করছে অবসাদ? প্রাথমিক লক্ষণ হলো, ক্রমাগত শূন্যতাবোধ। দুঃখের অনুভূতির সঙ্গী হতে পারে উৎকন্ঠা আর উদ্বেগ। অবসাদ্‌গ্রস্ত মানুষের সুখ-দুঃখে প্রায় একই অনুভূতি। টিভি দেখা, খবরের কাগজ পড়া কিছুতেই যেন খুঁজে পাওয়া যায় না ভালোলাগা ব্যাপারটাকে। এভাবেই অতীতের অতি পছন্দের জিনিসও কেমন করে যেন চলে যায় অপছন্দের তালিকায়। ভালো না  লাগতে পারে পছন্দের মুভিও। বন্ধুবান্ধব, সামাজিক অনুষ্ঠান সব কিছু থেকেই যেন দূরে থাকতে ইচ্ছে করে। মানে নিজেকে কিছুটা গুটিয়ে নেওয়ার প্রবণতা। অতীতের অনেক ঘটনার জন্য নিজেকে দায়ী বলে মনে করে অনুতাপের আগুনে দগ্ধ হওয়া, কান্না পাওয়া এবং ভবিষ্যতের প্রশ্নে শুধুই নিরাশার অন্ধকারে ডুবে থাকার প্রবণতা মানসিক অবসাদের একটা বড় লক্ষণ। দৈহিক লক্ষণ কী হতে পারে? মাথায়, গা-হাত-পায়ে কেমন যেন একটা ব্যথা ব্যথা ভাব। রাতে ঘুম আসতে পারে দেরি করে, মাঝরাতে কিংবা ভোর রাতে ভেঙে যেতে পারে ঘুম। কিন্তু উঠতে ইচ্ছে করে না। পড়ে থাকতে ইচ্ছে করে বিছানা আঁকড়ে। পেয়ে বসতে পারে অনিদ্রা অথবা অতিনিদ্রা। ইচ্ছে জাগে না কাজে, মন লাগে না পড়াশোনায়। মাথা কাজ করে না, মনেও থাকে না অনেক কিছু। সারাদিনই কেমন যেন একটা ঘুম ঘুম অবসন্ন ভাব। হারিয়ে যায় যাবতীয় উৎসাহ। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে অবশ্য অদ্ভুত কান্ড। কখনও কিছুই রোচে না মুখে, কখনও বা আবার ইচ্ছে করে গান্ডেপিণ্ডে গিলতে। পরিণামে হজমে গণ্ডগোল। আচরণেও দেখা দিতে পারে কিছুটা অস্বাভাবিকতা। কখনও খিটখিটে মেজাজ, মাঝেমধ্যে আক্রমণাত্মক মনোভাব, কখনও আবার ডুকরে উঠে আসে কান্নাও। সব মিলিয়ে একটা অদ্ভুত অস্বস্তি।

শুধু মনে রেখো

মনে রাখা দরকার, ডায়াবেটিস বা ব্লাড সুগার এবং হাইপারটেনশন তথা হৃদরোগের সঙ্গে কিন্তু গভীর সম্পর্ক এই অবসাদের। চিকিৎসা-শাস্ত্র বলছে, অবসাদ থেকে জন্ম নিতে পারে ডায়াবেটিস কিংবা হৃদরোগ। আবার ডায়াবেটিস কিংবা হৃদযন্ত্রে গোলমালের পথ ধরে আসতে পারে অবসাদ।

সে আসে বহুরূপে

আসলে অবসাদ আসে নানা কারণে,নানা রূপে, নানা মুহূর্ত কিংবা সময়ে। যেমন প্রিয়জন বিয়োগ, প্রেমে আঘাত, দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছেদ কিংবা কর্মক্ষেত্রে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার। এক্ষেত্রে গভীর অবসাদের মেয়াদ তিন মাসের বেশি হলে অবশ্যই মনের চিকিৎসক এবং মনস্তাত্ত্বিক পরামর্শদাতার দ্বারস্থ হওয়া উচিত। এমনকী সাধারণ ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডারও যদি বছর দুয়েক ধরে চলে তাহলে দেখা দিতে পারে নার্ভ সংক্রান্ত রোগ ডিসথেমিয়া। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চোখের রেটিনাতেও বিপদ ডেকে আনতে পারে দীর্ঘ অবসাদ। থাবা বসাতে পারে বুদ্ধি আর স্মৃতিশক্তিতে। তরান্বিত করতে পারে ডিমেনশিয়া। উৎকন্ঠা-উদ্বেগের সঙ্গেও অবসাদের সম্পর্ক বেশ গভীর।

এবার দেখুন ঋতুচক্র কেমন করে প্রভাব বিস্তার করে অবসাদে। শীতকাল অনেকের মনে ডেকে আনে অবসাদ। সূর্যের আলো ম্লান হয়ে গেলে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে উইন্টার ব্লুস। আবার শীতের শেষে বসন্তেও দু’হাত বাড়িয়ে দিতে পারে অবসাদ। উৎসবের আনন্দের শেষে, এমনকী আনন্দের ঢেউয়ের মাঝেও অবসাদের হাতছানি অস্বাভাবিক নয়।

নারী-মনে তার পদচারণা

এবারে পা রাখা যাক মহিলা-জগতে।অবসাদের প্রশ্নে পুরুষদের থেকে বেশি স্পর্শকাতর কিন্তু মহিলারাই। প্রসবের পরে পোস্ট পার্টাম ডিপ্রেশন  হামেশাই দেখা দেয় মহিলাদের মধ্যে। অস্থিরতা, রীতিমতো অবসন্ন অবস্থা, অনিদ্রা, কান্না পাওয়া—এই সব লক্ষণ দেখা দেয় প্রায় ১৫ শতাংশ প্রসূতির ক্ষেত্রে। নিজের এবং সন্তানের অজানা ক্ষতির আশঙ্কায় এই সময়ে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলতে পারেন মায়েরা। কথায় আর কাজে অসঙ্গতি লক্ষ্য করা যেতে পারে তাঁদের মধ্যে। আবার অনেক সময় সন্তান প্রসবের জন্য যে মানসিক চাপের শিকার হন মহিলারা, তার ফলেও অবসাদ গ্রাস করতে পারে তাঁদের। এরই পাশাপাশি সদ্যোজাত সন্তানের মা হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব এবং কর্তব্যের তাড়না থেকেও আসতে পারে আনন্দে অনীহা এবং অকারণ একাকিত্ববোধ। এবং এর অনিবার্য পরিণতি হলো অবসাদ।

আবার বাইপোলার মুড ডিসঅর্ডারে অবসাদ আর হর্ষোন্মত্ততা আসে চক্রাকারে। কখনও নিমগ্ন রাখে গভীর অবসাদে, পরক্ষণেই হয়তো হাসি, গান, বেশি কথা, দারুণ উৎসাহ কাজে। বলা যেতে পারে একেবারে হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে থাকে ম্যানিয়া আর ডিপ্রেশন।

অবসাদের আরও এক ইন্টারেস্টিং মুখ হলো, স্মাইল ডিপ্রেশন। মনে গভীর দুঃখবোধ, শূন্যতা অথচ মুখভরা হাসি। এমনিতেই অবসাদকে চিহ্নিত করা কিন্তু খুব সহজ কাজ নয়। তার ওপরে হাসিমাখা মুখের আড়ালে সযত্নে লুকিয়ে রাখা অবসাদ কিন্তু মাঝে মধ্যেই কারণ হয়ে দাঁড়ায় বড় ধরনের  বিপদের।

আত্মহত্যার বাসনা

হ্যাঁ,অবসাদের পথ ধরেই অনেক সময় আসে আত্মহত্যার প্রবণতা। বিশেষ করে মনের গভীরে সদ্য জন্ম নেওয়া অবসাদ কিংবা অবসাদ থেকে মুক্তি পেয়ে সুস্থ জীবনে ফেরার পথও উস্কে দিতে পারে আত্মহত্যার  বাসনা। এই সময়টা কিন্তু বিশেষ সতর্কতার সময়। গবেষণা বলছে, আত্মহত্যার চেষ্টা মহিলাদের মধ্যে বেশি দেখা গেলেও আত্মহত্যার সংখ্যার বিচারে মহিলাদের থেকে কিন্তু প্রায় তিন গুণ এগিয়ে রয়েছেন পুরুষরাই।

সমস্যার নেপথ্যে

কিন্তু এই অবসাদের নেপথ্যে আসল রহস্যটা কী? মনস্তাত্ত্বিক কারণটাই মূলত কাজ করে এর পেছনে। তবে অবশ্যই দৈহিক কারণকে সঙ্গে নিয়েই। হর্মোন তথা মস্তিষ্কের রসায়নই নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায়। ভারসাম্যের অভাব হলেই বিপদ। এক্ষেত্রে নিউরোট্রান্সমিটার সেরোটোনিনের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন গবেষকরা। এর কার্যকারিতা কম হলেই থাবা বসাতে পারে অবসাদ। গাবা, ক্যাটেকোলামাইনের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। আবার পার্কিনসন্স বা অন্য কোনও রোগের ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ডোপামিনের মাত্রা বেড়ে গেলেও ভারসাম্য হারাতে পারে ব্রেন-কেমিস্ট্রি। এছাড়া জিনের প্রভাবেও বংশগতির ধারায় মিশে যেতে পারে অবসাদ। দীর্ঘ অসুস্থতা থেকেও জন্ম নিতে পারে ডিপ্রেশন। কিন্তু অবসাদের একটা বড় কারণ হলো স্ট্রেসফুল লাইফ ইভেন্ট। জীবনের কোনও বিশেষ ঘটনা, তিক্ত স্মৃতি, একাকিত্ব, পরাজয়, বিবাহিত জীবনে জটিলতা, বিচ্ছেদ, প্রেমে অপূর্ণতা, হতাশা, অতৃপ্ত বাসনা, যৌন অতৃপ্তি, অবদমিত কামনা, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, পরিবার কিংবা কর্মস্থলে অস্বস্তিকর পরিবেশ কিন্তু অবসাদকে সাদর আমন্ত্রণ জানানোর পক্ষে যথেষ্ট। উদ্বেগ-আতঙ্কেরও দোসর হতে পারে অবসাদ। মধ্যবয়সে ‘এম্পটি নেস্ট’-এর অনুভূতিও কিন্তু  গৃহবধূদের ডুবিয়ে দিচ্ছে বেশ গভীর অবসাদে।

মুক্তি কোথায়!

এতো গেল সমস্যার কথা। কিন্তু সমাধানের পথটা কী? অবসাদের সঙ্গে আপোসহীন লড়াইটা চালাবেন কী ভাবে? সুস্থভাবে বাঁচতে হলে এর থেকে তো মুক্তি পেতেই হবে।তাই এখনই শুরু করে দিন লড়াইটা।

  • কল্পনার জগতে নয়,পা রাখুন কঠিন বাস্তবের মাটিতে। প্রতিটি বিষয়কে বিশ্লেষণ করুন সেখানে দাঁড়িয়েই। স্থির করুন লক্ষ্য। সচেতন থাকুন নিজের সীমা সম্পর্কে। অযথা নিজেকে যন্ত্রণা দেবেন না।
  • বড় কাজগুলিকে ছোট ছোট করে ভাগ করুন। ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ করুন।
  • নিজেকে সব কিছু থেকে গুটিয়ে নেবেন না। একজন মনের মতো বিশ্বাসযোগ্য এমন বন্ধু খুঁজে বের করুন যিনি আপনার দুর্বলতার সুযোগ নেবেন না। অকপটে তাঁর সঙ্গে শেয়ার করুন সুখ-দুঃখের অনুভূতি।
  • মাঝেমধ্যেই সময় কাটান সিনেমা হলে কিংবা নাট্যমঞ্চে। চুটিয়ে উপভোগ করুন তা।অংশ নিন আলোচনায়, ভাগ করে নিন আনন্দাভূতি।
  • বই, ম্যাগাজিন পড়ুন। সৃজনশীলতার অনুশীলন করুন। 
  • প্রশ্রয় দেবেন না একাকিত্বকে।
  • মাঝে মধ্যেই একাকার হয়ে যান প্রকৃতির বুকে। লং ড্রাইভ কিংবা শর্ট ট্রিপ। চাইলে দূরে কোথাও। সবুজের বুকে। পাহাড় কিংবা সমুদ্রের পথে।
  • আড্ডা দিন চুটিয়ে। তবে দূরে থাকুন ফাস্ট ফুড কিংবা নেশা থেকে। জড়াবেন না তর্কে। নিজেকে আরও ডুবিয়ে দেবেন না অবসাদের গভীরে।
  • নেতিবাচক চিন্তা ঝেড়ে ফেলুন। অভ্যাস করুন ইতিবাচক চিন্তাধারা।
  • গান শুনুন, গাইতেও পারেন। মিউজিক থেরাপির কোনও বিকল্প নেই।
  • বসে বসে আকাশ-পাতাল ভাববেন না। যে কোনও কাজে ব্যস্ত রাখুন নিজেকে। সমস্যা এলে সমাধানের উপায় খুঁজুন। সময় কাটান শিশুদের মাঝে। মন দিন সমাজসেবায়।
  • মন চাইলে হবিকে সঙ্গী করুন। কেজ-বার্ড, নানা রঙের মাছ, নিদেন পক্ষে পোষা কুকুরকে সময় দিন।
  • সকালে অথবা বিকেলে অন্তত ৪৫ মিনিট হাঁটুন। সঙ্গে ফ্রি হ্যান্ড হাল্কা ব্যায়াম, ধ্যান, প্রাণায়াম। গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের অভ্যাস কিন্তু অবসাদের পয়লা নম্বর দুশমন।
  • গভীর প্রেমও কিন্তু দূরে সরিয়ে দিতে পারে অবসাদের যন্ত্রণাকে।

মনের ইচ্ছেটাই আপনার হাতিয়ার

আর হ্যাঁ,পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই হাজির হোন মনের চিকিৎসক, মনের পরামর্শদাতা তথা মনোবিদের কাছে। ওষুধ কিংবা সাইকোথেরাপি বা কাউন্সেলিং—যাই হোক না কেন, ভুলে যাবেন না, আপনার মনের ইচ্ছেটাই কিন্তু অবসাদমুক্তির সেরা হাতিয়ার।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*