সাইটোল বিষহরী

বিবেক সেন

এই প্রাচীন ভূখণ্ডের ধর্মাচরণ মানুষের নিত্যদিনের আনন্দ ও দুঃখের সাথে জড়িয়ে। কোনও অলীক স্বর্গের জন্য অন্যের সাথে দ্বন্দ্বের চেয়ে নিজের ছোটো গৃহকোণ, দু-চারটি প্রিয় মুখ, নিজের ছোট্ট গাঁয়ের মধ্যে প্রতিবেশী, স্বজনের সাথে সামান্য জীবনের ভিতর সহজ শান্তির জীবন চেয়েছেন বাঙালি। বিশ্বজয়ের চেয়ে গাঁয়ের ভিতর মায়ের মতো যে মাটি তাকেই পরম স্নেহে আঁকড়ে বাঁচতে চেয়েছে। এখানেই বাঙালির স্বর্গ। এই বাংলার সবটুকু একজীবনে জানা হয় না। দক্ষিণের শহরে থেকে পশ্চিমের মানুষ ও জীবন জানতে পারি না, উত্তর রয়ে যায় অজানা। তাও চাকরির সূত্রে এদিক-ওদিক ঘুরে কিছু মণিমাণিক্য সংগ্রহ হয়ে যায়। গত বৎসর উত্তরবঙ্গ সফরে জানার অভিজ্ঞতা হলো এক লোকায়ত উৎসব সাইটোল বিষহরীকে নিয়ে। কলকাতায় ফিরে দেখলাম একটি ভিডিও আর একটি বই থাকলেও কলকাতার মানুষ এ বিষয়ে কিছুই জানেন না। তাঁদের কাছে আজ আমার এই নিবেদন।

সাইটোল বিষহরী একটি দেবীর নাম নয়। সাইটোল ও বিষহরী। বিষহরী দেবী মনসা। কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে পূজিতা হওয়ার পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের রাজবংশী সমাজে তিনি যুগ্মভাবেও পূজিতা হন, সাইটোর বা সাইটোল মায়ের সাথে।

সাইটোর শব্দটি ষষ্ঠী শব্দের অপভ্রংশ। ষষ্ঠী>ষাট>ষাইট—এইভাবে শব্দটির জন্ম। দেবী ষষ্ঠীর মতো সাইটোর প্রজননের দেবী। বাড়িতে বিয়ে, নতুন শিশুর আগমন, অন্নপ্রাশন,  শিশুর কল্যাণে প্রান্তবঙ্গের রাজবংশী মানুষ, প্রান্তিক মানুষ, এমনকী মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ সাইটোল বিষহরী ব্রত করে থাকেন। এই ব্রত প্রধানত বিবাহিতা নারীদেরই একটি অনুষ্ঠান।

সাইটোলের কোনও মূর্তি নেই। জলাজমিতে হওয়া শোলাগাছের নরম কাঠ থেকে পাতলা শোলার কাগজ বানানো হয়। সেই কাগজ দিয়ে তৈরি হতো একটি সুদৃশ্য খাঁচা বা ডোল। এটির গায়ে আঁকা হয় অনেকটা পটচিত্রের আদলে এক দেবীমূর্তি। গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা বুড়িমার ছবি যাঁরা দেখেছেন তাঁরা সহজেই সাইটোলদেবীকে কল্পনা করতে পারবেন। প্রকৃতপক্ষে, এই বুড়িমা আর ষষ্ঠীই তো সাইটোল মা। এই ছবি সংবলিত ডোলের নীচে শোলার কদম ফুল বা বল ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। বিষহরীর ডোলটি পিরামিড আকৃতির। এটি একটি বিষ্ময়। সুদূর মিশরেও ছিল সর্পদেবতার আরাধনা। আর এই প্রান্তবাংলার জনজাতির মধ্যে সর্পদেবীর প্রতীক পিরামিড আকৃতির! এই ডোলের মধ্যেও আঁকা হয় দেবী বিষহরীর ছবি। এ ছাড়াও আরও কিছু শোলার সাজ, পুতুল থাকে পূজার বেদিতে। তুলসীমঞ্চের সামনে বাঁশের ডাল দিয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় ডোলগুলিকে।

সাইটোল বিষহরী পূজায় কোনও ব্রাহ্মণ পুরোহিত নেই। যাঁর বাড়িতে পুজো হয় তাকে বলা হয় মারেয়া। থাকে কয়েক জন সহকারী বৈরাতি। পূজার উপাচার একটি ডালি বা কুলোয় কলাপাতার ওপর সাজানো কলার ছড়া, হাঁসের ডিম, পায়রা, পলাশের পাতা, পদ্ম-পাতা, পান-সুপারি, কাঁচা দুধ, চিনি, বাতাসা, চিঁড়ে, খই, দই। এ ছাড়া থাকে প্রদীপ, যাকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ভগা। সাধারণ মাটির প্রদীপ, তাতে ঘিয়ে ভেজানো তুলো বা কাপড়, এই প্রদীপ দিয়েই দেবীর অর্চনা করা হয়।

কোনও শাস্ত্রোক্ত মন্ত্র নেই দেবীর। গৃহিণীমহলে প্রচলিত ছড়াই বন্দনা। প্রথমে গণপতি ও পঞ্চদেবতার বন্দনা, তাতে স্থান রয়েছে অবৈদিক ধর্মঠাকুরেরও, রয়েছে বসুমতী। আর এই লোকায়ত মন্ত্রোচ্চারণ পর্বের পর আসে সাইটোল বিষহরী বন্দনার মূল আকর্ষণ, গিদালী গান।

গীত থেকেই গিদালী শব্দের উৎপত্তি। উত্তরবঙ্গের এই গিদাল-গিদালীরা লৌকিক ব্রত, পূজা, পালায় গান করেন, তাঁদের গান ধর্ম ও দেব দেবীনির্ভর, একই সাথে তাঁদের গানে ও কথকতায় মিশে যায় মানুষের জীবনের আনন্দ ও দুঃখ,  প্রেম আর বিরহ। গিদালীদের স্থান মেয়েমহলে, ব্রত ও পালায়। তাই তাঁদের গানে মেয়েদের স্বাভাবিক যে লৌকিক জীবন তার সমস্যাই উঠে আসে বারবার। হয়তো এক মেয়ের যোগ্য পাত্র জোটে না, আরেক জনের শাশুড়ির গঞ্জনা আর অক্লান্ত পরিশ্রমে কাটে দিন, কেউ কষ্ট পায় সন্তান না থাকার, আরেক জনের স্বামী পরদেশে, ফিরে এসে অভাব আর শূন্যতা মেটায় না অভাগিনীর। এইসব গান গায় গিদালীরা। অধিকাংশই বৃদ্ধা, শ্বেতাম্বর বিধবা। তাঁদের জড়ানো, স্থানীয় বাংলা উপভাষা স্পষ্টভাবে আমাদের কানে আসে না, খালি প্রান্তজীবনের বেদনার সুর বাতাসে ঘুরে বেড়ায়, ঘুরে বেড়ায় আধিদৈবিক শক্তির কাছে সুদিনের প্রার্থনা।

গিদালী গানের সাথে থাকে একজন মূল গায়িকা, ঢাঁকী, কাঁসি ও কয়েক জন দোহার, যাঁরা গানে ধুঁয়ো ধরেন। আর থাকে কয়েকটি কমবয়েসি মেয়ে, লোকায়ত ঢংয়ের নাচের মাধ্যমে তাঁরা গানের নাট্যরূপ দেয়। এঁদের পরনে থাকে নতুন লালপেড়ে হলুদশাড়ি, ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে আদিবাসী নৃত্যের অন্যতম জনপ্রিয় পোষাক, নাচের রীতিও কিছুটা সাঁওতালি বা ওঁরাও নৃত্যের কাছাকাছি, যদিও কিছু ব্যতিক্রমও আছে। যেখানে বাংলার অন্য কোনও জেলাতেই বাঙালি মেয়েদের নাচের কোনও রীতি নেই, সেখানে এই গিদালী নাচ সম্ভবত এক ব্যতিক্রম। সাইটোল বিষহরী পালাগানের মাঝে মাঝে গাওয়া হয় খোসা গান। মূল কাহিনির সাথে এর কোনওই সম্পর্ক নেই। মূলত, চটকদার গান, রাধাকৃষ্ণের প্রেম, রঙ্গ থেকে শুরু করে শিব-নারদের কথোপকথন অনেক কিছুই খোসা গানের বিষয় হতে পারে। খোসা গানের সময় গিদালী দলের নর্তকীদের চলনও হয়ে ওঠে কিছু চপল।

সাইটোল বিষহরীর গল্পটি মঙ্গলকাব্যের ধাঁচের। সাইটোল বিষহরী দেবীর আশীর্বাদে মা হয়। কিন্তু সন্তানের বিয়ের সময় নিজেই বিষহরীর পূজা দিতে ভুলে যান। বিষহরীর অভিশাপে সেই সন্তান প্রাণ হারায়। নিজের ভুল বুঝতে পেরে সাইটোল সর্পদেবীর বন্দনা করলে সন্তান প্রাণ ফিরে পায়। তাই সাইটোলের সাথে বিষহরীর পূজাও বাধ্যতামূলক।

আইধন সাধুর সাত ছেলে। ছ-জন ছেলের পাত্রী পাওয়া গেলেও সপ্তম পুত্র মণিহারের জন্য আর পাত্রী পাওয়া যায় না। শেষে রাজার মেয়ে নীলা বা লীলার সাথে মণিহারের বিবাহ হয়। বছর যায়। ছয় বউ গর্ভবতী হয়, কিন্তু লীলার কোল খালি। তাই সবাই নির্যাতন করে লীলার ওপর। গঞ্জনা দেয়, সমস্ত কাজের বোঝা তার ওপর চাপায়। শেষে একদিন সাইটোলের আশীর্বাদে লীলার গর্ভে সন্তান আসে। এদিকে মণিহারও বাণিজ্য করতে রওনা দেয় দেশান্তরে। লীলা যথাসময়ে দুই পুত্রের জন্ম দেয়। কিন্তু শাশুড়ি ষড়যন্ত্র করে দুই নাতিকে মাটির হাঁড়িতে করে জলে ভাসিয়ে দেয় আর জ্ঞান ফিরলে লীলাকে দেখানো হয় দুটি কুকুরশাবক। লীলা মনের দুঃখে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। এদিকে এক মালি নদীতে ভাসমান হাঁড়িতে দুটি পুত্রসন্তান দেখে তাদের বাড়িতে নিয়ে এসে মানুষ করতে থাকে। সাইটোলের করুণায় লীলাও ক্রীতদাসী হিসেবে সেই দুটি শিশুর পালিকা হিসেবে মালির বাড়িতে ঠাঁই পায়। ছেলেরা যখন বড়ো হয় সাইটোল ছদ্মবেশে তাদের জানায় প্রকৃত পিতৃমাতৃপরিচয়। তারা তাদের মাকে নিয়ে জঙ্গলের মধ্যে সাধারণ শ্রমিকের জীবনযাপন করতে থাকে। এদিকে মণিহার স্বপ্নাদেশে জানতে পারে সকল সত্য। সে এসে স্ত্রী-পুত্রকে উদ্ধার করে ঘরে নিয়ে আসে। স্ত্রী-পুত্রকে লুকিয়ে রেখে মায়ের কাছে জানতে চায় স্ত্রী কোথায়। মা মিথ্যে কথা বলে যে লীলাকে বাঘে খেয়েছে। মণিহার তখন মা ও বৌদিদের জীবন্ত কবর দিয়ে লীলা ও পুত্রদের ঘরে নিয়ে আসে।

এই কাহিনির ফাঁকে ফাঁকে রয়েছে নানা উপকাহিনি, জীবনের হাসিঠাট্টা, অভিজ্ঞ চোখের নানা উপলব্ধি। স্থানান্তরে রূপভেদ ঘটেছে গল্পে, এসেছে নানান গল্প, মাঝির অভিজ্ঞতা, নন্দগোয়ালা আর তার নাতি জয়ধর,  দেবীমাহাত্ম্য, কিন্তু বাংলার চর্যাগান, মঙ্গলকাব্য, পাঁচালির রীতিটি স্পষ্ট, স্থানভেদে গল্পের থেকে শাখাপ্রশাখা বেরিয়ে আরও গল্পের জন্ম, এ-ও তো মঙ্গলকাব্যেরই বৈশিষ্ট্য।  বৈদিক হিন্দু ধর্মের বাইরে প্রান্তমানুষের মধ্যে ধর্ম কঠোর কোনও শাস্ত্র নয় আর, শুভাশুভের ভিতর থেকে এক লৌকিক বিশ্বাস ও আশ্রয় খুঁজে নেওয়া। সেখানে দাম্পত্যজীবন, নতুন সংসারে নতুন সম্পর্ক, দায়িত্ব, কর্তব্যের শিক্ষা আর দেব-দেবীর উপস্থিতি এক হয়ে যায়। শাস্ত্রের নীতিনিয়মের থেকেও মানবিক সত্য এইসব ব্রতকথার ভিতর বেশি ফুটে ওঠে।

অথচ হারিয়ে যেতে বসেছে এইসব পালাগান, গিদালী সম্প্রদায়।  সর্বজনপ্রিয় যে দুজন গিদালীর কথা জানতে পারি, হিদ্দেশ্বরী গিদালী আর ফুলটি গিদালী—একজন আশি অতিক্রান্ত, অন্য জন একশো। এঁদের চলে যাওয়ার পর গিদালীর রীতিটিই সম্পূর্ণ বিলোপ পেয়ে যাওয়ার ভয় রয়েছে। শাস্ত্রীয় হিন্দু ধর্মের কৌলিন্যে, বিপুল অর্থব্যয়ের পূজার আড়ালে লৌকিক সাইটোল বিষহরী হয়তো তাঁদের দৈবশক্তি প্রয়োগ করেও বেঁচে থাকতে পারবেন না। সেদিন বাংলার জন্য বড়ো সুখের নয়।

গিদালী গানের শেষে বিষহরীর ডোলটিকে কোনও জলাশয়ে বা নদীতে বিসর্জন দেওয়া হয়, সাইটোলকে নিয়ে যাওয়া হয় ঘরে। রাজবংশী মা এমন স্থানে ডোলটিকে ঝুলিয়ে দেন যেখান থেকে সাইটোল মা-ও ঘরের শিশুগুলিকে চোখে চোখে রাখতে পারেন, যেন বিপদ-আপদ, অশুভ শক্তির প্রভাবের বাইরে থেকে বড়ো হয়ে ওঠে শিশু, মানুষ হয়ে ওঠে।

আমরাও তাই চাই।

ঝেচুয়া করে ঝিলিমিলি

কুকিলায় করে রাও।

শ্বেত কাউয়ার বচনে রঞ্জনী

পোয়াও পোয়াও।।

কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ  দড়িচা ফাউন্ডেশন

ষাইটোরী মাও—সুচন্দ্রা ভট্টাচার্য, প্রকাশক আনন্দ পাবলিশার্স  

সংগ্রামী মা মাটি মানুষ পত্রিকা ২০১৮ পূজা সংখ্যায় প্রকাশিত

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*