সরকারি নির্দেশে কাউন্সেলিং আতঙ্কগ্রস্ত শ্রমজীবীদের

সৌম্য সিংহ

শুধুমাত্র করোনা থেকে সুরক্ষিত রাখা নয়, আটকে পড়া বাইরের শ্রমিক এবং তাঁদের পরিজনদের মানসিক ভারসাম্য যাতে কোনওভাবেই বিঘ্নিত না হয় তারজন্যও বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে রাজ্য সরকার। নবান্নের নির্দেশে ‘ইনস্টিটিউট অফ সাইকিয়াট্রি’র উদ্যোগে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং মনোবিদরা কলকাতা পুর এলাকার মোট ২৪টা ক্যাম্পে ঘুরে ঘুরে কাউন্সেলিং করছেন পরিযায়ী শ্রমজীবী মানুষদের। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিচ্ছেন, কী কী সাবধানতা নেওয়া জরুরি। মানসিক সমর্থন দিয়ে আতঙ্ক দূর করার চেষ্টা করছেন অসহায় মানুষজনের মন থেকে। গোটা বিষয়টা পরিচালনা করছেন ইনস্টিটিউটের অধিকর্তা ডা. প্রদীপ কুমার সাহা। এখানেই শেষ নয়, ভবিষ্যতে Post Traumatic Stress Disorder বা PTSD-র সমস্যা দেখা দিলে তার চিকিৎসার জন্যও নেওয়া হচ্ছে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি।

বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. প্রদীপ সাহার মুখ থেকেই জানা গেল, এখনও পর্যন্ত প্রথম পর্যায়ে মোট ৩ দিন এই কাউন্সেলিং অভিযান চালানো হয়েছে। কাজে নেমেছে মোট ৮টা গ্রুপ। প্রতি গ্রুপের সদস্য সংখ্যা ৩ থেকে ৭জন। সাইকিয়াট্রিস্ট, সাইকোলজিস্টদের সঙ্গে থাকছেন সমাজসেবীরাও। এগিয়ে আসছেন স্থানীয় কাউন্সিলররাও। যে সব রিলিফ ক্যাম্প, কমিউনিটি সেন্টার, নাইট শেল্টার এবং হোমে বাইরের শ্রমজীবী মানুষদের স্বাস্থ্যসম্মত আশ্রয় এবং খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে সেখানেই পৌঁছে যাচ্ছে কাউন্সেলিং টিম। সুরক্ষার ঘেরাটোপে থাকা মানুষজন, যাঁরা কার্যত আইসোলেশনে আছেন, তাঁদের বোঝানো হচ্ছে নোভেল করোনা ঠিক কী, এর বিপদটা কোথায়, কী কী সাবধানতা জরুরি, সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং কেন প্রয়োজন। যাঁরা নিজেদের কার্যত বন্দি মনে করে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন কিংবা প্রিয়জনদের অনেকদিন দেখতে না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছেন, মনে কষ্ট পাচ্ছেন, ভুগছেন একাকিত্বে, তাঁদের বুঝিয়ে বলা হচ্ছে, এটা খুবই সাময়িক ধাক্কা। তাঁদের সঙ্গে চলছে সমানুভূতি বিনিময়। করোনা নিয়ে অযথা আতঙ্ক দূর করে আশ্বস্ত করা হচ্ছে অসহায় মানুষদের। তাঁদের মধ্যে কাশ্মীরি শাল বিক্রেতারাও যেমন আছেন, রয়েছেন ভিনরাজ্যের শ্রমিকরাও। প্রত্যেকেরই মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যাপারে নেওয়া হচ্ছে বিশেষ যত্ন। বলা হচ্ছে, দুরত্ব বজায় রেখে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলুন। মনমরা হয়ে থাকবেন না।

এটা ঘটনা, করোনার আক্রমণে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন যেমন বহু মানুষ, তেমনি চিকিৎসায় সেরেও উঠছেন অনেকে। কিন্তু মুছে যাচ্ছে না আতঙ্ক। জন্ম নিচ্ছে ট্রমা। এর ফলে মাস ছয়েকের মধ্যে কিছু মানুষের মধ্যে দেখা দিতে পারে Post Traumatic Stress Disorder. ডা. সাহার মতে, গভীর মানসিক কষ্ট এবং  আতঙ্কের পরিণতিতে এমনটা হওয়া মোটেই বিচিত্র নয়। নেচার মেড এই ট্রমা মনের ফ্ল্যাশ ব্যাকে বারবার ফিরিয়ে আনতে পারে আতঙ্ক, দুঃস্বপ্ন। বাড়িতে বা  কর্মক্ষেত্রে ফিরে যাওয়ার পরেও আঘাত হানতে পারে মানসিক ভারসাম্যে। ডেকে আনতে পারে গভীর অবসাদ। জাগিয়ে তুলতে পারে আত্মহত্যার ইচ্ছেও। মনের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে তখন  দরকার জরুরি-ভিত্তিক চিকিৎসা। অবশ্য আতঙ্কের স্মৃতি মনকে অস্থির করে তুলতে পারে ৫/১০ বছর পরেও। ফ্ল্যাশব্যাকে, দুঃস্বপ্নে তখন মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ার সম্ভাবনাও প্রবল। কিন্তু  ততোদিনে হয়তো বদলে যাবে ব্যক্তিত্ব। বিষয়টা তখন দাঁড়াবে Catastrophic Trauma. তবে এর জন্যও প্রস্তুত ইনস্টিটিউট অফ সাইকিয়াট্রি। আশ্বাস অধিকর্তার।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*