করোনা ভাইরাসের ইতিহাস এবং জনসাধারণের দায়িত্ববোধ

ডা. গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়

(বিভাগীয় প্রধান, বাঙ্গুর ইনস্টিটিউট অফ নিউরোসায়েন্সেস)

নতুন রোগ। বিশ্বজুড়ে অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জ। মহামারীর আচমকা আক্রমণ। আতঙ্কে  থরথর আমজনতা। কিছুটা যুক্তিসঙ্গত হলেও অনেকটাই অমূলক ভয়। নোভেল করোনাকে ঘিরে পাল্লা দিয়ে বেড়েই চলেছে কৌতুহল আর সংশয়। উঠছে নানা প্রশ্ন। বেশিরভাগেরই মিলছে না সঠিক বা স্পষ্ট উত্তর। জন্ম নিচ্ছে নিত্যনতুন ধারণা,যার নেপথ্যে এখনও কোনও সুনির্দিষ্ট প্রমাণই নেই। এইভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, মানবদেহের নার্ভাস সিস্টেম বা স্নায়ুতন্ত্রে এই ভাইরাস আদৌ কোনও ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলতে পারে কি? চিন এবং আমেরিকা থেকে দু’একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনার রিপোর্ট এই প্রশ্নটাকে সামনে এনে দিলেও উত্তর একটাই, এব্যাপারে শেষ কথা বলার সময় আসেনি এখনও। তবে বিভিন্ন ভাইরাল এনকেফেলাইটিস কিংবা স্নায়ুতন্ত্রের অন্যান্য অংশে ভাইরাসের  আক্রমণের যে সম্ভাবনা থাকে তা এক্ষেত্রে হবে না এমন কথা এখনই বলা যাচ্ছে না। পরিণতিতে অন্যান্য ভাইরাসের আক্রমণের মতোই স্নায়ুতন্ত্রের সংক্রমণ, প্রদাহ এমনকী ক্ষয়ের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কয়েকটা বিষয়ে ইতিমধ্যেই আলোকপাত করেছেন গবেষকরা। তবে ভবিষ্যতে আরও গবেষণাই দিতে পারবে এর সঠিক উত্তর,সঠিক দিশা। তাই এখনই অযথা আতঙ্কের কোনও কারণ  নেই। আসলে যেহেতু মাত্র কয়েক মাস হলো ভয়ঙ্করভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে এই ভাইরাস, দুনিয়াজুড়ে মহামারীর চেহারা নিয়েছে, তাই জোর দিয়ে কোনও কিছুই বলা যাচ্ছে না এখন। তবে নার্ভাস সিস্টেমে এই ভাইরাস আদৌ কোনও ক্ষতি করছে কিনা, করলেও কতোটা, সে বিষয়ে গভীরভাবে নজর রাখছেন বিশেষজ্ঞ এবং গবেষকরা। কিন্তু এই  মুহূর্তে সবথেকে আগে দরকার যুদ্ধকালীন তৎপরতায় এই ভাইরাস-জনিত রোগকে প্রতিহত করা। অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত এর প্রতিষেধক বা ওষুধ নিয়ে গবেষণার। যত তাড়াতাড়ি এই রোগের প্রতিষেধক-ওষুধ আবিষ্কৃত হবে ততোই মঙ্গল।

এটা ঠিক যে এই ভাইরাস-ঘটিত রোগের বিপজ্জনক দিক নিয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশই নেই। কিন্তু এটাও সত্যি, সরাকারের গাইডলাইন মেনে আগাম সাবধানতা নিলে অনেকেরই হয়তো ভেন্টিলেশনের প্রয়োজনই হবে না। চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে প্রথম থেকে চললে সুস্থ শরীর আর মন নিয়ে বাড়ি ফেরা সম্ভব। আর এরজন্য দরকার গণচেতনা। জনসাধারণের দায়িত্ববোধটাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এরজন্য এই রোগ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা চাই। জানতে হবে  ভাইরাসের চরিত্রটা ঠিক কেমন। প্রতিরোধের উপায়টাই বা কী!

অনেকেরই হয়তো অজানা নয়, ভাইরাস একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রোটিনকণা RNA বা  DNA এবং এটি উদ্ভিদ, ব্যাকটেরিয়া বা প্রাণীর মধ্যে প্রবেশ করে বেঁচে থাকে পরজীবীর মতো। বংশবৃদ্ধিও করে ক্রমশ। ভাইরাস অত্যন্ত সংক্রামক। খালিচোখে  দেখা যাওয়া তো দূরের কথা, ধরা পড়ে না সাধারণ অনুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচেও। শনাক্তকরণের জন্য দরকার হয় ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ।  করোনা ভাইরাস এইরকমই এক RNA ভাইরাস। একে বলা যেতে পারে Severe mutated form  of Corona virus. Severe Acute Respiratory Syndrome (SARS- CoV2). মহামারীর আকার ধারণ করা রোগটি Corona virus COVID 19।

১৯৩০ সালে মুরগির দেহে এবং ১৯৪০এ বাদুড় আর পাখির মধ্যে করোনা ভাইরাসের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। তবে ১৯৬০ সালে প্রথম সর্দি-কাশিতে (Common Cold) আক্রান্ত মানুষের শরীরে এই ভাইরাসের অস্তিত্ব ধরা পড়ে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই এর মিউটেশন হয়। সব ভাইরাসেই গঠনগত পরিবর্তন হয় শারীরিক প্রোটিনের। কিন্তু এই করোনা ভাইরাসের গঠনগত ভয়াবহ পরিবর্তন সত্যিই লক্ষ্য করার মতো। মুকুট বা মালার মতো দেখতে বলে একে করোনা বলা হয়। এটি একটি ল্যাটিন শব্দ। অন্যান্য RNA ভাইরাসের থেকে আকৃতিতে অনেকটাই বড়।

কীভাবে সংক্রামিত হয় এই ভাইরাস? কথা বলার সময়, হাঁচি-কাশি, মুখ থেকে নির্গত থুথু, নাক থেকে নিঃসৃত শ্লেষ্মা কণা বা Droplet এর মাধ্যমে সংক্রামিত হয় এটি। তবে কণার আকার বড় হওয়ায় বেশিদূর যেতে পারে না বাতাসে ভর করে। ৩ মিটারও এগোতে পারে না। আটকে যায় জামাকাপড়, আসবাবপত্র, মেঝে বা অন্যকিছুতে। মাটিতেও পড়ে থাকে। এদের সংক্রমণ ক্ষমতা ২ থেকে ৪ সপ্তাহ। তাই অন্যের পোশাক, করমর্দন, পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম, জড়িয়ে ধরা—এ সবেতেই মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের প্রবল সম্ভাবনা। খুব কাছাকাছি বসে খাওয়া বা খাইয়ে দেওয়াতেও আছে বিপদের সম্ভাবনা। রোগ ছড়াতে পারে শিশুর মল থেকেও।

রোগের লক্ষণ

জ্বর, সর্দিকাশি, গলায় ব্যথা, শ্বাসপ্রশ্বাসের কষ্ট থেকে নিউমোনিয়া। শিশুর ক্ষেত্রে হতে পারে ডায়েরিয়া। আক্রান্ত হতে পারে খাদ্যনালী, লিভার এবং কিডনিও। খুব কম ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে রেসপিরেটরি সিস্টেমে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য সিস্টেমে।

দায়িত্ব এবং কর্তব্য

  • বাড়িতেই থাকুন। বাইরের লোকের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করবেন না। একান্তই প্রয়োজন হলে এক মিটার দুরত্ব বজায় রাখুন। আন্তরিকতা দেখাতে হাতে হাত রাখবেন না একেবারেই। করমর্দন নয়, নিরাপদ দুরত্ব থেকে নমস্কারই যথেষ্ট।
  • যেখানে লোকসংখ্যা বা জনসমাগম বেশি, এড়িয়ে যান সেইসব জায়গা।
  • করোনা আক্রান্ত মানুষের সংস্পর্শে ভুলেও যাবেন না। অজান্তে তা হলে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে যোগাযোগ করুন দ্রুত।
  • বৃদ্ধরা তো বটেই, যাঁদের প্রেসার বা সুগার আছে কিংবা পেসমেকার বসানো  আছে তাঁদের কিন্তু বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে।
  • নিজেকে গৃহবন্দি বলে ভাববেন না। ফোনে, ভিডিওকলে প্রয়োজনীয় কথা  বলুন, গল্প করুন প্রিয়জন কিংবা পরিচিতদের সঙ্গে। টিভি দেখুন।
  • হাতমুখ সাবানজল দিয়ে বারবার ধুয়ে ফেলুন।
  • হাঁচিকাশির সময় মুখ টিস্যুপেপার বা রুমালে ঢেকে নিন। টিস্যুপেপার ফেলে দিন। রুমাল কেচে দীর্ঘক্ষণ রোদে শুকিয়ে নিন।
  • বাড়িতে গরম পুষ্টিকর খাবার খান। মনে রাখবেন, শুধুমাত্র ডালভাতেই যথেষ্ট পুষ্টি রয়েছে।
  • বারবার পান করুন হাল্কা গরম জল। অভ্যাস থাকলে ঘনঘন লিকার চাও চলতে পারে।
  • ধূমপান বা অন্যান্য নেশা থেকে বিরত থাকুন।
  • সুগার, প্রেসার, কোলেস্টেরল, ইউরিক অ্যাসিড বা অন্যান্য সমস্যার জন্য যদি ডাক্তারের পরামর্শে নিয়মিত ওষুধ খেতে হয় তবে তা কিন্তু অবশ্যই অব্যাহত রাখতে হবে।
  • নিয়মিত ব্যায়াম বা শরীরচর্চা করুন বাড়িতেই।
  • জরুরি প্রয়োজনে বাড়ির বাইরে যেতে হলে অবশ্যই ব্যবহার করুন মাস্ক এবং গ্লাভস। বাড়িতে ফিরে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে জামাকাপড়ের মতোই সাবানজলে ধুয়ে শুকিয়ে নিন কড়া রোদে। চশমা থাকলে ভালো করে ধুয়ে নিন তাও।  
  • এড়িয়ে যান সিঁড়ির হাতল। নিয়মিত পরিস্কার করুন দরজার হাতল।
  • বিশেষ সাবধানতা প্রয়োজন টাকা-পয়সার ক্ষেত্রে।
  • হাঁচি-কাশি-জ্বর বা শ্বাসকষ্ট হলেই নিজেই নিজের ডাক্তারি না করে দ্রুত পৌঁছে যান কাছাকাছি ডাক্তারের চেম্বারে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কিংবা হাসপাতালে।
  • নিজে বা পরিচিত প্রিয়জন বাইরে থেকে এলে তা গোপন করবেন না। হোম কোয়ারান্টাইন সংক্রান্ত সরকারি নিয়ম অক্ষরে অক্ষরে পালন করুন।

মনে রাখবেন, বিশ্বজুড়ে মহামারীর আকার নিলেও অযথা আতঙ্কের কোনও কারণ নেই। এখনও পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট ওষুধ বা প্রতিষেধক আবিষ্কৃত না হলেও রোগটির নিয়ন্ত্রণ কিন্তু অনেকটাই মানুষেরই হাতে। এরজন্য প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস এবং দৃঢ়তা। সরকারি নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করা এবং সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করা।

যে কথাটা অবশ্যই বলা দরকার, বিশ্বের এই সঙ্কটজনক পরিস্থিতিতে আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মাননীয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গঠনমূলক চিন্তাধারা, বলিষ্ঠ পদক্ষেপ মুগ্ধ করেছে আমাকে। বিভিন্ন হাসপাতালে ছুটে যাচ্ছেন, গোটা ব্যবস্থাটা পর্যবেক্ষণ করছেন তিনি নিজে। সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর সহৃদয় ব্যবহার, উদার মানসিকতা সত্যিই মুগ্ধ করার মতো। তাঁর এই বিরল প্রয়াস অবশ্যই শ্রদ্ধার সঙ্গে মনে রাখবো।

আর এই দুঃসময়ের সঙ্গে লড়াই করার জন্য নিশ্চিতভাবেই আমাদের শক্তি  জোগাবে কবিগুরুর সেই উক্তি—সঙ্কটের কল্পনাতে হয়ো না ম্রিয়মান/মুক্ত করো ভয়, আপনা মাঝে শক্তি ধরো/নিজেরে করো জয়।  

2 Comments

  1. It is very informative and easily understandable. Dr. Ganguly presents it in very lucid language. Our hon’ble CM extends her trusted hands to all people in this state. We must respect her words.

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*