রাজস্থানে রাজ্যপালের দুর্ভাগ্যজনক ভূমিকা

শিবরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়

রাজস্থানের কংগ্রেস মন্ত্রীসভার সামনে আপাতত কোনো সংকট আছে বলে মনে হয় না। গত ১৪ আগস্ট ২০২০ রাজস্থান বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেইলট ভোটাভুটিতে জয়লাভ করলেন। ঘোলা জলে মাছ ধরবার চেষ্টা সাময়িকভাবে ব্যর্থ হল। কিন্তু রাজস্থানের রাজ্যপালের ভূমিকা নিছক দুর্ভাগ্যজনক নয়, নেতিবাচক এবং ষড়যন্ত্রমূলক। এতদিন মুখ্যমন্ত্রীর সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সংশয় হলে রাজ্যপাল মুখ্যমন্ত্রীকে তাঁর বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের নির্দেশ দিতেন এবং অনেক ক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রী নানা অজুহাতে বিলম্ব করতেন। রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী সংখ্যগরিষ্ঠতা প্রমাণের জন্য নিজেই রাজ্যপালকে বিধানসভার বিশেষ অধিবেশন ডাকার জন্য বারবার আবেদন করেছিলেন। কিন্তু রাজ্যপাল নানা অছিলায় বিলম্ব করছিলেন। ১৯৫০-এর ২৬ জানুয়ারী ভারতীয় সংবিধান গৃহীত হওয়ার পর এই ধরণের অদ্ভূত ঘটনা এই প্রথম ঘটল।

ঘটনার সূত্রপাত ২০২০ জুলাই মাসে মুখ্যমন্ত্রী গেইলট এবং উপমুখ্যমন্ত্রী শচীন পাইলটের সংঘাতকে কেন্দ্র করে। কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, এই দ্বন্দ্ব হচ্ছে কংগ্রেসের রাজনীতিতে প্রবীণ ও নবীন প্রজন্মের লড়াই। এই বছরের মার্চ মাসে মধ্যপ্রদেশের কংগ্রেসী মুখ্যমন্ত্রী কমলনাথের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া বেশ কয়েকজন বিধায়ক নিয়ে কংগ্রেস ছাড়েন ও বিজেপিতে যোগ দেন। ফলে সেই রাজ্যে কংগ্রেস সরকারের পতন হয় এবং বিজেপি মন্ত্রীসভা ক্ষমতাসীন হয়। কমলনাথ কংগ্রেসের অন্যতম প্রবীণ ও প্রতিষ্ঠিত নেতা—ইন্দিরা গান্ধী ও সঞ্জয় গান্ধীর সময় থেকে। জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া মধ্যপ্রদেশ কংগ্রেস তথা সর্বভারতীয় কংগ্রেসের প্রথম সারির নেতা মাধবরাও সিন্ধিয়ার ছেলে। অবশ্য জ্যোতিরাদিত্যের ঠাকুমা রাজমাতা বিজয়রাজে সিন্ধিয়া বিজেপির অত্যন্ত শ্রদ্ধেয়া নেত্রী ছিলেন এবং পিসিমা বসুন্ধরা রাজে রাজস্থানের প্রাক্তন বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী।

জ্যোতিরাদিত্য এখন বিজেপি সাংসদ (রাজ্যসভা)। শচীন পাইলটের বাবা রাজেশ পাইলট কংগ্রেসের জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। রাজেশজী এবং মাধবরাওজী দু-জনেরই দুর্ঘটনায় অকাল মৃত্যু হয়েছিল। যাই হোক, ১৪ জুলাই ২০২০ তারিখে শচীন পাইলট রাজস্থানের উপমুখ্যমন্ত্রী এবং রাজস্থান প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতির পদ থেকে অপসারিত হলেন। এরপর শচীন তাঁর সমর্থক বিধায়কদের (১৯ জন) নিয়ে দিল্লী গেলেন এবং বিধায়কদের হরিয়ানার গুরগাঁওতে থাকার বন্দোবস্ত হল। অপরদিকে কংগ্রেস বিধায়কদের জয়শলমীরে পাঠানো হল। ভারতবর্ষের রাজনীতিতে এই একটি নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। সরকারি পক্ষ বা বিরোধী পক্ষ তাদের বিধায়ক বা সাংসদদের হোটেল বা অতিথিশালায় আটকে রাখে, যাতে তাঁরা অন্য দলে চলে না যান। সেই হোটেল যেন থাকে ওই দলের পরিচালনাধীন সরকারের রাজ্যে। শচীন পাইলটের বিদ্রোহের ফলে রাজস্থানের কংগ্রেস সরকারের গরিষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে গেল।

মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করে তাঁকে বিধানসভার অধিবেশন ডাকার পরামর্শ দিলেন, যাতে মুখ্যমন্ত্রী আস্থাভোট নিতে পারেন। এই মর্মে ২৩ জুলাই ২০২০ মুখ্যমন্ত্রীর তরফ থেকে রাজ্যপালকে চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু রাজ্যপালজী নানা অজুহাতে বিধানসভার অধিবেশন ডাকতে দেরী করতে লাগলেন। এ এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতি। সাধারণত মন্ত্রীসভার সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হলে অনেক সময় মুখ্যমন্ত্রী আস্থা ভোট নিতে অথবা অনাস্থা ভোটের সম্মুখীন হতে দ্বিধাগ্রস্ত হতে পারেন এবং বিধানসভার অধিবেশন ডাকার জন্য রাজ্যপালকে পরামর্শ দিতে বিলম্ব করতে পারেন। কিন্তু রাজ্যপাল এই ব্যাপারে বিলম্ব করছেন, এইধরণের ঘটনা আগে ঘটেনি। ২৪ জুলাই কংগ্রেস বিধায়করা রাজভবনে পাঁচ ঘণ্টার জন্য ধর্ণা-অবস্থানে বসলেন।

রাজ্যপালের থেকে বিধানসভা ডাকার প্রতিশ্রুতি পেয়ে বিধায়করা ধর্ণা তুলে নিলেন। কিন্তু তিন দিনের মধ্যে রাজ্যপাল বিধানসভা ডাকার জন্য অদ্ভূত তিনটি শর্ত আরোপ করলেন ও বিধানসভা ডাকার সুপারিশ সংক্রান্ত ফাইল রাজ্য সরকারকে ফিরিয়ে দিলেন। এই তিনটি শর্ত হল— (১) করোনার উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সমস্ত বিধায়ককে হাজির করতে কমপক্ষে ২১ দিন সময় দেওয়া প্রয়োজন (২) ২০০ বিধায়কের পাশাপাশি (রাজস্থান বিধানসভার সদস্যসংখ্যা ২০০) আধিকারিকদের করোনা সংক্রমণ এড়ানোর স্বাস্থ্যবিধি কী হবে, তা সরকারকে চূড়ান্ত করতে হবে, (৩) যদি আস্থা ভোট হয়, তাহলে তা যেমন ভিডিও রেকর্ডিং করতে হবে, তেমনি ব্যবস্থা করতে হবে লাইভ টেলিকাষ্টেরও।

রাজ্যপালজীর একটি বক্তব্য আশ্চর্যজনক। সংবাদপত্রে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী তিনি বলেছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কের সমর্থন রয়েছে বলে সরকার দাবি করছে। তা হলে বিধানসভায় আস্থা ভোট চাওয়ার প্রয়োজন কোথায়? (বর্তমান কলকাতা, ২৫ জুলাই ২০২০, পৃষ্ঠা-৯)। ভারতীয় সংবিধানের ১৭৪ (১) ধারা অনুসারে রাজ্যপাল বিধানসভার অধিবেশন আহ্বান করেন। কিন্তু এই ক্ষেত্রে রাজ্যপালের ‘স্বেচ্ছাধান’ ক্ষমতা নেই। তিনি মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী বিধানসভার অধিবেশন ডাকেন। এই প্রসঙ্গে ১৯৬৭-তে পশ্চিমবঙ্গের সাংবিধানিক সংকটের কথা সংক্ষেপে উল্লেখ করা যেতে পারে। ২ নভেম্বর ১৯৬৭ পশ্চিমবঙ্গের প্রথম অকংগ্রেসী যুক্তফ্রন্ট সরকারের খাদ্য ও কৃষিমন্ত্রী প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ ও শাসক শিবিরের আরো ১৭ জন বিধায়ক যুক্তফ্রন্ট সরকারের প্রতি তাঁদের আস্থা তুলে নিলেন। স্বভাবতই সংখ্যার দিক থেকে সরকার সংখ্যালঘু হয়ে গেল।

রাজ্যপাল ধরমভীরা মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায়কে পরামর্শ দিলেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিধানসভায় আস্থা ভোট নেবার জন্য। সেই সময় বিধানসভার অধিবেশন স্থগিত ছিল। ৭ নভেম্বর ১৯৬৭ রাজ্য মন্ত্রীসভা সিদ্ধান্ত নিল যে বিধানসভার অধিবেশন ১৮ ডিসেম্বরে ডাকা হবে। রাজ্যপাল অসন্তোষ প্রকাশ করলেন এবং মুখ্যমন্ত্রীকে অনুরোধ জানালেন, বিধানসভার অধিবেশন নভেম্বর ২৩ তারিখে এগিয়ে আনা হোক। ১৭ নভেম্বর তারিখে একটি বিশেষ বৈঠকে রাজ্য মন্ত্রীসভা রাজ্যপালের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল। এই অবস্থায় ২১ নভেম্বর ধরমভীরা প্রথম যুক্তফন্ট মন্ত্রীসভাকে বরখাস্ত করলেন। রাজ্যপালের এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে সারা দেশে সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক ঝড়-বিতর্ক উঠেছিল। রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী কোনোভাবেই বিধানসভার অধিবেশন এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন নি। তবুও রাজ্যপাল নজিরবিহীন নজির সৃষ্টি করলেন। শেষ পর্যন্ত শচীন পাইলট  তাঁর সহযাত্রী বিধায়কদের সঙ্গে কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের রাজনৈতিক বোঝাপড়া সম্ভব হল। ১৪ আগস্ট বিধানসভায় আস্থাভোটে মুখ্যমন্ত্রী জয়লাভ করলেন। রাজনৈতিক সংকট সাময়িকভাবে মিটল। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, রাজ্যপালের এই অদ্ভূত আচরণের কারণ কী?

কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজ্যপাল সময় নিচ্ছিলেন যাতে আরো কিছু সংখ্যক কংগ্রেস বিধায়ক দল ছেড়ে চলে আসেন। ফলে কংগ্রেস সরকারের পতন অনিবার্য হয়ে উঠবে এবং বিকল্প বিজেপি সরকার গঠিত হবে, যেমনভাবে মধ্যপ্রদেশ ও কর্ণাটকে পিছনের দরজা দিয়ে বিজেপি সরকার গঠন করেছিল। ভারতীয় রাজনীতিতে সরকার ভাঙ্গা-গড়ায় ‘আয়ারাম-গয়ারাম’ খেলা ১৯৬৭-তে চতুর্থ সাধারণ নির্বাচনের পর আরম্ভ হয়েছিল। অবশ্য তখন ছিল বিভিন্ন দলের কোয়ালিশন মন্ত্রীসভা। এখন রাজনৈতিক স্বার্থে বিরোধী দল শাসিত এক দলীয় সরকারকে প্রলোভন ও ভয় দেখিয়ে ভেঙ্গে দেওয়া হচ্ছে ও রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করা হচ্ছে।

ভারতীয় গণতন্ত্রে এক ভয়ংকর প্রবণতার সৃষ্টি হতে চলেছে। সবশেষে বলি, রাজস্থানের রাজ্যপাল কলরাজ মিশ্র অত্যন্ত প্রবীণ, অভিজ্ঞ ও মান্যবর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। বিজেপির পূর্বে ভারতীয় জনসঙ্ঘের সময় থেকেই তিনি অন্যতম প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যক্তি। অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক বৈধতার দিক থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী-সহ কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার কোনো মন্ত্রীই তাঁর ধারে কাছে আসতে পারেন না। দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াই ও কর্মকান্ডের পর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিছক রাজ্যপালের চাকরীটা বাঁচানোর জন্য কেন্দ্রীয় সরকার ও কেন্দ্রীয় শাসক দলের নির্দেশে তিনি কিনা এই ধরণের দুর্ভাগ্যজনক নজির সৃষ্টি করলেন! ভারতীয় গণতন্ত্রের লজ্জা।

লেখক : প্রক্তন বিভাগীয় প্রধান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, মৌলনা আজাদ কলেজ, কলকাতা

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*