আপনি কি সব ভুলে যাচ্ছেন?

সৌম্য সিংহ

যা বলছি তা গল্প নয়, যা বলছি তা মিথ্যেও নয়। শুনুন সত্যি কথা। একবার এক ষাটোর্ধ দম্পতি ডিনার পার্টির আয়োজন করেছিলেন নিজেদের বাড়িতে। সন্ধ্যে থেকেই রীতিমতো জমে উঠেছিল আসর। অতিথি আগমন, গল্পগুজব, হাসিঠাট্টা, নাচগান আর সেই সঙ্গে নানা রকমের লোভনীয় প্লেট তো ছিলই। শীতের বিদায় বেলায় সব মিলিয়ে যাকে বলা যেতে পারে এক্কেবারে আইডিয়াল ডিনার পার্টি। সব ঠিকঠাকই চলছিল। অতিথি আপ্যায়নে কোনও ত্রুটিই রাখেন নি কর্তা-গিন্নি। মুশকিলটা হলো পার্টি শেষে অতিথিদের যখন ঘরে ফেরার পালা। কর্তামশাই হঠাৎ-ই উঠে দাঁড়িয়ে গায়ে চাপিয়ে নিলেন তাঁর প্রিয় নেভিব্লু ব্লেজারটি। তারপরে পায়ে শু-টি গলিয়ে অতিথিদের অনুসরণ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লেন। অবাক হয়ে গিন্নি প্রশ্ন করলেন, “এত রাতে তুমি কোথায় চললে?” ততোধিক অবাক চোখে কর্তার পালটা প্রশ্ন, “সে কি, আমাকে নিজের বাড়িতে ফিরতে হবে না?” কথাটা শুনে ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেলেন প্রায় ৩২ বছর ধরে একসঙ্গে ঘরসংসার করা গিন্নি। প্রথমে ভাবলেন বুঝি রসিকতা করছেন স্বামী। কিন্তু স্বামী যখন কিছুতেই বুঝতে চাইলেন না যে বাড়ি ফিরতে হবে বলে আসলে নিজের বাড়ি থেকেই মাঝরাতে গটগটিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন তিনি, তখন সত্যিই বেশ ঘাবড়ে গেলেন বেচারা স্ত্রী। ভাবলেন, পার্টিতে তো কোনও পানীয়র আয়োজন ছিল না। তা হলে এমন কথা বলছেন কী করে কর্তা? শেষে কোনওরকমে ধরে-বেঁধে কর্তাকে রাস্তা থেকে ফিরিয়ে আনা হলো নিজের বাড়িতে। এটি কিন্তু বিদেশের ঘটনা। এবারে শুনুন দেশের একজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপকের কথা। স্ত্রীবিয়োগ হয়েছে বছর কয়েক আগে।চাকরিসূত্রে ছেলেরা থাকেন বাইরে। কলকাতার এক অভিজাত আবাসনের একটি ফ্ল্যাটে তিনি থাকেন একাই। কিন্তু বছরখানেক হলো, কেমন যেন সব গণ্ডগোল হয়ে যাচ্ছে। দোকান-বাজার করে ফেরার সময় তিনি প্রায়ই ঢুকে পড়ছেন হাউসিং-এর অন্য ব্লকে কিংবা বেল দিচ্ছেন অন্য কারও ফ্ল্যাটে। কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছেন না বা চিনতে পারছেন না নিজের ফ্ল্যাটটিকে। শেষে নিজের ঘরেই পৌঁছতে হচ্ছে প্রতিবেশীদের সাহায্য নিয়ে। ফিরে এসে নিজের জুতোজোড়াও সযত্নে তুলে রাখছেন আলমারিতে।

অ্যালঝাইমারের খপ্পরে

কিছুদিন এমন চলার পরে বিদেশের এবং দেশের দুই বৃদ্ধকেই তাঁদের বাড়ির লোকেরা নিয়ে গিয়েছিলেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞর কাছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরে জানা গেল দু-জনেই আসলে আক্রান্ত হয়েছেন অ্যালঝাইমার রোগে, যাকে বলা যেতে পারে একধরণের গুরুতর স্মৃতিভ্রংশতা। ভুলে যাওয়া রোগ ডিমেনশিয়ারই এ এক বিশেষ রূপ—কিছু ব্যতিক্রম থাকলেও যা আসে মূলত বার্ধক্যেরই হাত ধরে। অবশ্য তার আগেও যে আসে না তা নয়।তবে বিশেষ কিছু লক্ষণের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যেতে পারে রেড অ্যালার্ট। সাবধান হওয়া যেতে পারে সময় থাকতে। যদিও সেই সঙ্গে কিন্তু এটাও জেনে রাখা দরকার যে ভুলে যাওয়া মানেই ডিমেনশিয়া বা অ্যালঝাইমারের হানাদারি নয়। সঠিক মনোনিবেশ, স্মৃতির অনুশীলনের অভাব বা অন্যান্য কিছু শারীরিক, মানসিক কিংবা পারিপার্শ্বিক কারণেও আসতে পারে বিস্মরণের মুহূর্ত,বিস্মরণের বেলা। হতে পারে তা নিছকই সাময়িক, আবার হতে পারে স্থায়ীও। সবারই স্মৃতিশক্তি সমান হবে, এমনও কোনও কথা নেই। তাই অকারণে ঘাবড়ে যাওয়া নিস্প্রয়োজন। বরং বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নিয়ে এই স্মৃতিভ্রংশতার বিষয়টা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা করে নিলে সত্যিই হয়তো অনেক সহজ হয়ে যাবে ভবিষ্যতের লড়াইটা।

অবরুদ্ধ স্মৃতিপথ

আসলে ডিমেনশিয়া আর অ্যালঝাইমার অসুখের মধ্যে সীমারেখাটা কিন্তু খুবই সূক্ষ। তথ্য বলছে, প্রায় ৭০ শতাংশ ডিমেনশিয়ার মধ্যেই অ্যালজাইমার্সের লক্ষণ প্রকট। তাই অন্তত এক্ষেত্রে সীমারেখা খোঁজার চেষ্টাই অর্থহীন। রোগের মূল কারণ হলো মস্তিষ্কের কোষের মৃত্যু। ফলে অবরুদ্ধ হয়ে যায় স্মৃতির চেনা পথ। মনে পড়তে গিয়েও যেন মনে পড়ে না, মনে থাকে না অনেক কিছুই।হারিয়ে যায় সুসংবদ্ধ ভাষা। চেনাকেও লাগে অচেনা। মুখ মনে পড়ে তো নাম মনে পড়ে না।সুদূর অতীতের স্মৃতি অক্ষত থাকলেও, মুছে যায় সাম্প্রতিক ঘটনার স্মৃতি, এমনকী কথাবার্তাও।দারুণভাবে ব্যাহত হয় দৈনন্দিন জীবনযাত্রা। আচমকাই আলগা হয়ে যায় সেই চিরপরিচিত ব্যক্তিত্বের বাঁধন। কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যায় স্থান-কাল-পাত্র। ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় সাধারণ বিচারবুদ্ধি এমন কী সামাজিক চেতনাও।

কারণটা কী

যাওয়া যাক অ্যালঝাইমারের গভীরে। গবেষকরা বলছেন, মস্তিষ্কের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশের কোলিনারজিক নিউরোনের (Cholinergic  cell) মৃত্যুই হতে পারে অ্যালঝাইমার রোগের আসল কারণ। এই কোষ থেকেই নির্গত হয় বার্তাবাহী রাসায়নিক অ্যাসিটিল কোলিন (Acetylcholine)। মস্তিষ্কের কর্মতৎপরতায় এই রাসায়নিক পদার্থটির ভূমিকা কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এটি আশপাশের কোষকেও প্রয়োজনীয় অন্যান্য রাসায়নিক নির্গমণে উদ্দীপ্ত করে।তাই কোলিনারজিক কোষের মৃত্যুতে থমকে যেতে পারে মস্তিষ্কে শিখন এবং স্মৃতির গোটা প্রক্রিয়াটাই। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন অ্যালঝাইমারে ভুগছেন এমন মানুষের মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশের প্রায় ৮০ শতাংশ কোলিনারজিক কোষই নষ্ট হয়ে গেছে।তবে আধুনিক গবেষণা বলছে, এর বাইরেও আরও কিছু জৈবরসায়নিক বা অন্য কারণ থাকতে পারে এই রোগের নেপথ্যে। যেমন জিন বা বংশগতির ধারাতেও আসতে পারে অ্যালঝাইমার। সাধারণত ৬৫ থেকে ৮০ বছর বয়সের মধ্যে এই রোগ থাবা বসানোর সম্ভাবনা থাকলেও জিন বা বংশগতির কারণে হলে তা আসতে পারে বেশ কিছুটা আগেই।

স্নায়ুকোষে জট

এই রোগের ব্যাপারে বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা.অমরনাথ মল্লিকের ব্যাখ্যা, ডিমেনশিয়ায় নিউরোন বা স্নায়ুকোষের অবক্ষয়ের ফলে মস্তিষ্কের  আকারে পরিবর্তন ঘটে কিছুটা। সেরিব্রাল কর্টেক্স শুকিয়ে যায়। মস্তিষ্কের গহ্বর বা ভেন্ট্রিকল বড় হয়ে যায়। মস্তিষ্কের আয়তন কমে যায়। অ্যালঝাইমারে মূলত আক্রান্ত হয় সেরিব্রাল কর্টেক্স। কোলিনারজিক নিউরোনগুলিতে বিটাঅ্যামাইলয়েড নামে একধরণের অস্বাভাবিক প্রোটিন বা পেপটাইডের স্তর জমে ক্রমশ বিপদ ডেকে আনে। স্নায়ুকোষের মধ্যে টাউ (TAU) প্রোটিন পরিবর্তিত হয়ে প্যাঁচালো ফিতের মতো জট বা টাংগল (TANGLE) তৈরি করে। পরিণতিতে মৃত্যু হয় স্নায়ুকোষের। স্বাভাবিকভাবেই কমে যায় স্মৃতি, বিচারবুদ্ধি আর আবেগ। উল্লেখ্য, স্মৃতিভ্রংশতার বিষয়ে গণচেতনা গড়ে তুলতে বিশেষ প্রচারাভিযান শুরু করেছেন ডা. মল্লিক।

বুঝতে হবে ব্যাপারটা

স্মৃতিভ্রংশতার গোড়ার কথা যহেতু ডিমেনশিয়া তাই পৌঁছনো দরকার আরও একটু গভীরে। হ্যাঁ, অ্যালঝাইমার মাত্রই ডিমেনশিয়া, কিন্তু তাই বলে কারও ডিমেনশিয়া হয়েছে মানেই তিনি অ্যালঝাইমারে আক্রান্ত, এমন কিন্তু নয়। ডিমেনশিয়া অনেক রকমের হতে পারে, তার মধ্যে অ্যালঝাইমার অন্যতম।তবে অন্তত ৬০ শতাংশ স্মৃতিভ্রংশতার প্রকৃতি হলো  অ্যালঝাইমার ডিমেনশিয়া। গোটা ব্যাপারটা স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিলেন ইনস্টিটিউট অফ সাইকিয়াট্রির ডিরেক্টর ডা. প্রদীপ কুমার সাহা। আসলে ভুলে যাওয়া ব্যাপারটা বিভিন্ন কারণে ঘটতে পারে। বয়স বাড়লে স্বাভাবিক নিয়মেই দুর্বল হয়ে পড়ে স্মৃতিশক্তি। এ ছাড়া অবসাদের গ্রাসেও হারিয়ে যেতে পারে মনে রাখার ক্ষমতা। ডেলিরিয়ামের ফলেও অনেক সময় মনে রাখার ক্ষমতা বা বিচারবুদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। তাই এ সবের সঙ্গে মোটেই এক করে ফেললে চলবে না ডিমেনশিয়াকে। এম আর আই কিংবা ব্রেন-বায়োপসি করেই নিশ্চিত হতে হবে যে আসল ব্যাপারটা ঠিক কী। তবে ডিমেনশিয়া হলেও অ্যালঝাইমার ছাড়াও তার আরও কিছু রকমফের আছে। এর মধ্যে যেমন কিছু আছে চিকিৎসাযোগ্য, তেমনই কিছু কিন্তু আদৌ চিকিৎসাযোগ্যই নয়। যেমন হাইপোথাইরয়েডিসম থেকে ডিমেনশিয়া হলে তা চিকিৎসার মাধ্যমে ভালো হয়ে যাওয়ার আশা থাকে। ড্রাগ বা অ্যালকোহলের কারণেও স্মৃতিভ্রংশতা চিকিৎসার আওতার বাইরে নয়। হাইপারটেনশন থেকে ডিমেনশিয়া হলে অবস্থার অবনতি ঠেকানো যেতে পারে যথাযথ চিকিৎসায়। ভাস্কুলার ডিমেনশিয়াতো অত্যন্ত পরিচিত সমস্যা।

এছাড়া মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণ, পারকিনসন্স ডিসিস, দুর্ঘটনায় মস্তিষ্কে আঘাত, এনকেফেলাইটিস, ম্যানেনজাইটিস, এল ডি বডি এমনকী এইডসের হাত ধরেও আসতে পারে স্মৃতিভ্রংশতা। থায়ামিন নামে ভিটামিনের অভাবও ডেকে আনতে পারে গুরুতর সমস্যা। তবে এর মধ্যে নিঃসন্দেহে সব থেকে বেশি দুশ্চিন্তার কারণ অ্যালঝাইমারই। তবে ইচ্ছে করে ভুলে যাওয়ার অভিনয়ও বিচিত্র নয়।

মনোবিদের দরবারে

মনোবিদ ড. অমিত চক্রবর্তী অবশ্য মনে করেন ডিমেনশিয়া বা অ্যালঝাইমারে আক্রান্ত মানুষের জীবনের শেষ আট বছরে রোগের লক্ষণগুলি ক্রমশ প্রকট হয়ে ওঠে। চিকিৎসার মাধ্যমে অবনতির দ্রুততা সামান্য কমানো যেতে পারে মাত্র। বড়জোর নিয়ন্ত্রিত হতে পারে রোগের মাত্রা। তবে কেয়ার গিভারদের কাউন্সেলিং এবং প্রশিক্ষণ এক্ষেত্রে খুবই জরুরি।

সতর্ক নজর

তাই বয়স ৬০-এর দিকে এগোলেই এই লক্ষণগুলির দিকে রাখতে হবে সতর্ক নজর—

  • সাম্প্রতিক ব্যাপার-স্যাপার মনে রাখতে না পারা।
  • সময় এবং জায়গা ভুলে যাওয়া। অতি কাছের মানুষেরও নাম মনে করতে না পারা।
  • সামান্য গণনা কিংবা হিসেব-নিকেশেই ব্যাপক ভুলভাল।
  • যেখানে সেখানে জিনিস রেখে মনে করতে না পারা।
  • গুছিয়ে কথা বলতে অসুবিধে।
  • চেনা-জানা সাধারণ কাজ করার ক্ষেত্রেও অক্ষমতা। যেমন, চাবি দিয়ে তালা খুলতে হয় কেমন করে তা ভুলে যাওয়া।
  • সৃজনশীল কাজকর্মে আগ্রহ তো দূরের কথা, স্বাভাবিক বোধবুদ্ধি পর্যন্ত হারিয়ে ফেলা। ব্যক্তিত্বের অবনতি। সামজিক চেতনার অবক্ষয়। বিচারবুদ্ধি লোপ। সিদ্ধান্ত নেওয়ার অক্ষমতা।
  • যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়ানো, উদাসীনতা কিংবা বদমেজাজ।
  • জরুরি প্রয়োজনে ওয়াশরুম পর্যন্ত পৌঁছনোর অক্ষমতা বা অনিচ্ছা।
  • শেষ পর্যন্ত দৈনন্দিন জীবনে নিজের কাজটুকু নিজে করার ক্ষমতা বা ইচ্ছের অভাব।

সবমিলিয়ে পর্যবেক্ষণ কিন্তু খুব বেশি হলে ছয় মাস। তবে দেরি না করে তার আগেই পরামর্শ নিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং অবশ্যই মনোবিদের।

সেই সঙ্গে অবশ্যই যা করা দরকার

  • স্মৃতিভ্রংশ মানুষকে যতটা সম্ভব সক্রিয় রাখা।
  • গল্প করে,অ্যালবামের পাতা উলটে অতীতকে সামনে মেলে ধরার প্রচেষ্টা। সামনে ঘড়ি-ক্যালেন্ডার রেখে সময়কাল সম্পর্কে সজাগ করা।
  • গল্পের বইয়ের প্রতি আগ্রহ জাগানো। দরকার হলে পড়ে শোনানো।
  • গান শোনানো, সিনেমা দেখানো। টিভি দেখা তো আছেই।
  • চেনা জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যাওয়া, চেনা মানুষদের সঙ্গে আড্ডায় উৎসাহিত করা।পছন্দের খাবার খাওয়ানো মাঝেমধ্যে।
  • দারুন কাজ দেয় শব্দছক।

কাছের মানুষদের শুধু মনে রাখতে হবে যে স্মৃতিভ্রংশ মানুষের আচার-আচরণে কখনোই বিরক্তি প্রকাশ করা উচিত নয়।রাগ করবেন না ভুলেও। বরং যতটা পারবেন মানসিক সমর্থন দিন পথ হারানো আপনজনকে।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*