অন্নদাশঙ্কর রায়

জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

“ফাগ কথাটার মানে

সত্যি ক’জন জানে

ডিক্সনারী দেখে

জানতে যদি চাও

লণ্ডন মে আও

শেখো একবার ঠেকে”।

—সম্ভবতঃ ১৯২৭ সালে পাঠানো সুধীরচন্দ্র সরকার সম্পাদিত ‘মৌচাক’ পত্রিকায় প্রকাশিত অন্নদাশঙ্করের প্রথম ছড়া। এর আগে অনুবাদ গল্প, প্রবন্ধ এর মধ্য দিয়ে অনেক বুদ্ধিজিবী, মনীষিদের কাছে তিনি পৌঁছে গেছিলেন। কিন্তু যে কবিতা তাঁকে জনগনের সামনে সবচেয়ে বেশী জনপ্রিয় করেছিল, পৌঁছে দিয়েছিল প্রত্যন্ত গ্রামে-গঞ্জে, তা হল,—

‘তেলের শিশি ভাঙল বলে খুকুর পরে রাগ করো

তোমরা যে সব বুড়ো খোকা ভারত ভেঙে ভাগ করো

তার বেলা’?

অন্নদাশঙ্কর এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি সাহিত্যের বিভিন্ন পথে অবাধ বিচরণ করেছেন।—প্রবন্ধ, কবিতা, ছড়া। পাশাপাশি উপন্যাস, গল্প, আলোচনা। সরকারী কর্মচারী হিসাবে জীবনে সফলতার শীর্ষ বিন্দুতে পৌঁছেছিলেন, কিন্তু সাহিত্যের ক্ষেত্রে তাঁর উত্তরণ ঘটেছে ধাপে ধাপে।

পঞ্চদশ শতকে নদীপথে যে সব বিখ্যাত স্থানগুলি সবচেয়ে বেশী জনপ্রিয় ছিল সেগুলি হল,—সুখচর, কোন্নগর কোতরং, কামারহাটি, আড়িয়াদহ প্রভৃতি। কোতরং ছিল অন্নদাশঙ্কর রায়ের পূর্ব পুরুষের বসতি। হিন্দ মটোর রেল স্টেশনের পশ্চাতে গঙ্গার দিকে বিস্তৃত স্থানটি ছিল কোতরং। কোতরং থেকে তাঁরা চলে আসেন বালেশ্বর জেলার রামেশ্বরপুরে। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি জ্ঞাতিদের সঙ্গে মনো-মালিন্য হওয়ায় অন্নদাশঙ্করের ঠাকুর্দা শ্রীনাথ রায় রামেশ্বরপুর ত্যাগ করেন। ঠাকুমার নাম দুর্গামনি। তিনি ছিলেন জাজপুরের সম্ভ্রান্ত সেন বংশের মেয়ে। অন্নদাশঙ্করের পিতার নাম নিমাইচরণ রায়। তিনি ব্রিটিশ সরকারের চাকরি গ্রহণ করেন। কিন্তু ভাইদের পড়াশুনো ভাল না হবার জন্য ঢেঙ্কানালের রাজ দরবারে সামান্য থিয়েটারের ম্যানেজারের চাকরি নিয়ে চলে আসেন। ঢেঙ্কানালে এসে নিমাইচরণ কটকের প্রসিদ্ধ পালিত বংশের কন্যা হেমনলিনীকে বিবাহ করেন।

১৯০৪ সালের ১৫ই মার্চ ঢেঙ্কানাল রাজ্য সরকারের লেডি ডাক্তার, মিসেস এ্যাণ্ডারসনের হাতে অন্নদাশঙ্করের জন্ম। তিন ভাই, দুই বোন অন্যান্য ভাইবোনেরা হলেন—অভয়শঙ্কর, রাজরাজেশ্বরী, অজয়শঙ্কর, ব্রজেন্দ্রমোহিনী। ঠাকুর্দা ছিলেন শাক্ত-মতাবলম্বী কিন্তু ঠাকুর্দা মারা যাবার সাত বছর পর বাবা-মা বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করেন। তখন অন্নদাশঙ্করের বয়স মাত্র আট বছর।

অন্নদাশঙ্করের বিদ্যাশিক্ষা শুরু ঢেঙ্কানালের অবধানের পাঠশালায়। মাটির উপর ‘ঠ’ অক্ষর লেখা দিয়ে তাঁর অক্ষর পরিচয় শুরু। ওড়িয়া ‘ঠ’ বর্ণ লেখা হয় শূন্যের সাহায্যে। পাশাপাশি ওড়িয়া ছন্দ মুখস্থ করা। পদ্যে এই ছন্দে’র নাম ‘কেশব কোইলি’, বাড়িতে মায়ের মুখে শুনতেন ‘গীতগোবিন্দ’ বাবার কাছে বিদ্যাপতি। কিন্তু চণ্ডীদাসকে ভালবেসে ফেললেন সেই শৈশব থেকেই। তাঁর নিজের কথায়,—‘আমাদের বাড়িতে অজস্র বাংলা বই ছিল। ছেলেবেলা থেকেই সেইসব বই পড়তাম। ছেলেবেলায় আমাকে কবিকঙ্কন চণ্ডী পাঠ করে শোনাতে হত। সকলে শুনতেন। মহাভারত, রামায়ণ, রামপ্রসাদ—এ সবও খুব শৈশবে আমি পড়ে ফেলেছি। দশ বছর বয়সে আমি হয়ত অনেক কিছু বুঝতাম না। কিন্তু বুঝি বা না বুঝি চোখ বুলিয়ে গেছি। সে সব পড়ে আমি ভাবলাম, আমি চেষ্টা করলে লিখতে পাড়ি (যুগান্তর, রবিবার, ৩রা জুলাই, ১৯৯৪)।

হইস্কুলে ইংরাজী ছিল তাঁর প্রথম ভাষা, ওড়িয়া ছিল দ্বিতীয় ভাষা। নিচু ক্লাসে ওড়িয়া ছিল শিক্ষার মাধ্যম। বাবা রাজবাড়ির থিয়েটারের ম্যানেজার ছিলেন, শৈশবে তিনি প্রায়ই রাজবাড়িতে উৎসবের দিন থিয়েটার দেখতে যেতেন। অভিনয় করার একটা সখ মনে মনে ছিল। বাবা পছন্দ করতেন না। যদিও বাবা অভিনয় করতেন, যথেষ্ট পারদর্শীও ছিলেন। তবু অন্নদাশঙ্করের বয়স যখন নয় বছর সেই সময় প্রথম ও শেষ বারের মত ধুরন্ধরের চরিত্রে একবার অভিনয় করেন। লেখার হাতে খড়ি দশ বছর বয়সে। প্রতিবেশী এক মেয়ে খুকুমনিকে তাঁর ভাললেগে যায়, তাঁকে উদ্দেশ্য করেই তিনি এক প্রেমের কবিতা লেখেন, তাঁর প্রথম প্রেম এবং কবিতা দুই’ই ব্যর্থ হয়।

ঢেঙ্কানাল হাই ইংলিশ স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন অন্নদাশঙ্করের কাকা। সঙ্গী অসম বয়সী দুর্গাচরণ পট্টনায়ক। স্কুলের হেড-মাষ্টার, এ্যাসিস্টেন্ট হেড-মাষ্টার ছিলেন বাঙালী। অন্নদাশঙ্কর ‘প্রবাসী’ পত্রিকা প্রথম দেখেন হেড-মাষ্টার রাজেন্দ্রলাল দত্তের বাড়ী। এছাড়া পাড়া প্রতিবেশী ব্রাহ্ম দ্বিজেন্দ্রনাথ বসুর বাড়িতে ছিল অসংখ্য বাংলা বই। বালক অন্নদাশঙ্করের অবাধ বিচরণ ছিল দ্বিজেন্দ্রনাথের বিচিত্র সংগ্রহশালায়। ভারতী, মানসী, মর্মবাণী, সবুজপত্র, গৃহস্থ, ভারতবর্ষ ও অন্যান্য পত্রিকা এই সময়েই তিনি প্রথম পড়েন। ঠিক এই সময়েই তাঁর জীবনে প্রথম অঘটন ঘটে। বাড়িতে আগুন লেগে যাবার জন্য একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে যায়। ঠাকুর্মা দুর্গামণি চলে যান আর এক কাকার সংসারে, কিছুদিন মন খারাপ হল। ইচ্ছা হল এক পত্রিকা প্রকাশ করবেন, ‘প্রভা’ নামে ওড়িয়া ভাষায় হাতে লেখা এক মাসিক পত্রিকা বার করলেন কিন্তু পাঠকের অভাবে তা বন্ধ হয়ে যায়।

অন্নদাশঙ্করের বয়স যখন তেরো, টোলের পণ্ডিত কেশবচন্দ্র কর তাঁর গৃহশিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হলেন। ইংরাজী ছাড়াও কেশবচন্দ্র অন্যান্য বিষয়ও অন্নদাশঙ্করকে দেখিয়ে দিতেন। কেশববাবু’র উৎসাহে অক্সফোর্ড মিশন থেকে প্রকাশিত ‘এপিফানি’ ইংরেজি সাপ্তাহিকের গ্রাহক হন। তাঁর উৎসাহেই এপিফানিতে ছাপাবার জন্য প্রশ্ন এবং পরে লেখা পাঠান এবং তা প্রকাশিত হয়। এই প্রসঙ্গে অন্নদাশঙ্কর বলেন,—‘কেশববাবু চাকরি ছেড়ে দিয়ে অন্যত্র চলে যান। কিন্তু সেই যে আমাকে একটা নেশা ধরিয়ে দিয়ে গেলেন যে নেশা আজ অবধি মিটল না। নামের নেশা আর লেখার নেশা। লিখে নাম করার নেশা। আমার জীবনে তিনি এসেছিলেন নিমিত্ত হয়ে। তিনি না এলে লেখক হওয়া আমার সেই বয়সে সম্ভব হত না’।

জীবনের প্রথম সাহিত্য সাধনা ওড়িয়া ভাষার মাধ্যমে, পরবর্তী কালে বাংলা ভাষার মাধ্যমেই সাহিত্য সাধনা করেছেন, পাশাপাশি ইংরাজী প্রবন্ধ। তখনকার দিনে বিখ্যাত ওড়িয়া সাপ্তাহিক ‘উৎকল দীপিকায়’ দয়ানিধি দাস ছদ্ম নামে এক চিঠি লেখেন, বিষয় কিভাবে সার্কাস কোম্পানি গরিবদের টাকা লুঠ করেন। সাহিত্য পদবাচ্য না হলেও এই চিঠিই ছিল ওড়িয়া সাহিত্য কর্মে অন্নদাশঙ্করের প্রবেশের চাবিকাঠি। ১৯১৮ সালে অষ্টম শ্রেনীতে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে ঢেঙ্কানাল স্কুল ছড়ে পুরীর জেলা স্কুলে চলে এলেন। কাকা গোলকপ্রসাদ ছিলেন পুরীর ডিস্ট্রিক বোর্ডের ইঞ্জিনীয়ার তিনিই তাঁকে ভর্তি করিয়ে দেন। কিন্তু ছয় মাস পর মার অসুস্থতার সংবাদ পেয়ে তিনি অবার ঢেঙ্কানালেই ফিরে আসেন। এই সময় তিনি স্কুল থেকে ভাল রেজাল্ট করার জন্য টলস্টয়ের ‘টোয়েন্টি থ্রি টেলস’ নামে একটি গল্পের বই পুরস্কার পান। এই বই থেকেই ‘থ্রি কোয়েশ্চেন’ গল্প অনুবাদ করে ‘প্রবাসী’তে পাঠান। ‘প্রবাসী’তে গল্পটা ছাপা হয়েছিল। বাংলায় তাঁর প্রথম লেখা টলস্টয়ের হাত ধরেই। তখন থেকেই তাঁর একটা স্বপ্ন ছিল মেট্রিক পাশ করেই তিনি সাংবাদিক রূপে জীবন শুরু করবেন। তিনি হবেন সন্ত নিহাল সিঙের মতো সাংবাদিক। শুরু হল স্কুলের পড়ার পাশাপাশি সাংবাদিক হবার জন্য পড়াশুন। তখন সাংবাদিকতাই ছিল তাঁর জীবনের আদর্শ। মাসিক ‘মডার্ন রিভিয়ু’, সাপ্তাহিক ‘টেলিগ্রাফ’, বাংলা মাসিক ‘প্রবাসী’ ইত্যাদি পত্রিকা আনিয়ে পড়তেন। লালা লাজপৎ রায়ের ‘বন্দেমাতরম্’ পত্রিকাও আনান। পড়লেন ‘সেলফ এডুকেটর সিরিজ’।

ঢেঙ্কানাল ছিল ওড়িশার মধ্যে এক উপেক্ষিত অঞ্চল। সেই ঢেঙ্কানালই অন্নদাশঙ্করের উজ্বল ভবিষ্যতের ভিত্তিভূমি। এই সময় ঢেঙ্কানালের কৃতী সন্তান সারেঙ্গ দাস ১৪ বছর জাপান ও আমেরিকা প্রবাসের পর দেশে ফেরেন। তাঁর সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে অন্নদাশঙ্করকে এক গান লিখতে হয়। রবীন্দ্রনাথের অনুকরণে ওড়িয়া’তে তিনি গান লিখলেন। এর পরের কথা অন্নদাশঙ্করের নিজের মুখ থেকেই শোনা যাক,—‘সারেঙ্গ বাবু ছিলেন আমার আদর্শ। আমেরিকায় গিয়ে তিনি কেমন করে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বাসন মাজেন, ঘর ঝাড় দেন ও দেওয়াল রং করেন এবং সেই রোজগারের টাকায় কেমন করে কলেজের পড়শুনা করেন সে সব কথা বলে তিনি আমার মনে আমেরিকার স্বপ্ন জাগিয়ে তোলেন। আমিও সে দেশে গিয়ে তেমনি করে কলেজে পড়াশুনা করব’। তবে আমেরিকায় যাবার ব্যাপারে বাবা নিমাইচরণের অনুপ্রেরণা ছিল সবচেয়ে বোশি। শৈশবে তিনি পুত্রকে প্রায়ই বলতেন—‘বড়ো হয়ে তুই ওয়াশিংটন হবি’। পিতা নিমাইচরণ এই উপলক্ষে পুত্রকে জর্জ ওয়াশিংটনের একখানি জীবনী দিয়েছেলেন।

ঢেঙ্কানালের স্কুলে ম্যাট্রিক পরীক্ষা নেবার বন্দোবস্ত ছিল না। ফলে অন্নদাশঙ্করকে কটকে এসে পরীক্ষা দিতে হয়। ১৯২১ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় তিনি দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করেন। ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেবার সময় ছোট কাকা হরিশচন্দ্র রায় কে অন্নদাশঙ্কর বলেছিলেন,—‘দেখবে সাত দিনের মধ্যে একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটবে’। তাঁর প্ল্যান ছিল পরীক্ষা দিয়ে কাউকে না বলে কলকাতায় পালিয়ে আসবেন। সেখান থেকে আমেরিকা যাবেন।—‘কিন্তু সাত দিনের মধ্যে যা ঘটল তা আমার পরিকল্পিত আশ্চর্য ঘটনা নয়, বিধাতার আশ্চর্য পরিকল্পিত ঘটনা। মাকে বেশ ভালে দেখে এসেছিলুম, খবর এলো তিনি নেই। কোথায় আমি চলে যাব আমেরিকায়, না তিনি চলে গেলেন স্বর্গে’।

আমেরিকা যাবার আশা পূরন না হলেও সাংবাদিক হবার ভূতটা তখনও তার ঘাড়েই বসেছিল। পরম হিতৈষী দ্বিজেন্দ্রনাথ বসু লিখে দিলেন পরিচয় পত্র। অন্নদাশঙ্কর কলকাতায় এলেন, দেখা করলেন,—‘বসুমতী’র সম্পাদক হেমন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ মহাশয়ের সঙ্গে। তিনি কিছু অনুবাদের কাজ দিলেন পরামর্শ দিলেন শর্টহ্যাণ্ড-টাইপটা শিখতে। ভর্তি হলেন ঘোষ-মিত্র স্কুলে। কিন্তু পরিবেশ ভাল না লাগার জন্য দেখা করলেন, ‘সার্ভ্যাণ্ট’ সম্পাদক শ্যামসুন্দর চক্রবর্তীর সঙ্গে। তিনি বললেন প্রুফরিডিং শিখতে। পত্রিকার এক প্রুফরিডারের কাছে প্রুফরিডিং শেখার সময় প্রুফরিডার ভদ্রলোক বললেন,—‘আপনি এবার তাহলে আমার চাকরিটা খাবেন’। অন্নদাশঙ্কর বললেন,—‘আমি প্রুফ রিডার হতে চাই না, আমি সাংবাদিক হতে চাই’। তখন তিনি বললেন,—‘আপনাকে প্রথমে গ্র্যাজুয়েট হতে হবে আর ইংরেজী শিখতে হবে’। পদে পদে বিপদ, এরি মধ্যে ছোটকাকার চিঠি এল,—‘তুমি আমাদের বংশের বড় ছেলে, তোমার কাছে আমরা এর চেয়ে বড় কিছু আশা করেছিলুম। ফিরে এসো, কটক কলেজে আমি তোমাকে ভর্তি করে দেব। তুমি আমার কাছে থাকবে’।

অগত্যা কটকে ফিরে এলেন, ভর্তি হলেন কটকের রভেনশ কলেজে, ইণ্টার মিডিয়েট আর্টসে। থাকলেন ছোটকাকা হরিশচন্দ্রের বাড়িতে। কলেজে আলাপ হল, কালিন্দীচরণ পানিগ্রাহী, বৈকুণ্ঠনাথ পট্টনায়েক, হরিহর মহাপাত্র এবং শরৎচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। ১৯২২ থেকে ১৯২৬ সাল, ওড়িয়া সাহিত্যে এই পাঁচ তরুন ‘সবুজ গোষ্ঠী’ নামে পরিচিত হন। বাংলাদেশে ‘সবুজপত্র’ ইতিমধ্যেই প্রগতিধর্মী আন্দোলনে অনেকখানি অগ্রণী হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের অনুপ্রেরণায় তরুণ লেখকগোষ্ঠী সবুজপত্র’র আদর্শ ও প্রয়াসকে চরিতার্থ করতে উৎসাহিত হয়। এই পাঁচ তরুণ সাহিত্যিকের কাছে রবীন্দ্রনাথ ও প্রমথ চৌধুরী ছিলেন তাঁদের প্রেরণার প্রধান উৎস। পাঁচ বন্ধু মিলে এক ক্লাব তৈরী করেন, নাম দেন ‘ননসেন্স ক্লাব’। এর থেকে আসে পত্রিকা প্রকাশের সঙ্কল্প। হাতে লেখা পত্রিকা। পত্রিকার নাম রাখা হয় ‘অবকাশ’ (অন্নদা, বৈকুণ্ঠ, কালিন্দী, শরৎ)। কিন্তু চার বন্ধুর নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে পত্রিকার নাম তৈরী হলেও বাদ পড়ে হরিহর এর নাম, ফলে পত্রিকার নাম বদলে রাখা হয় ‘সাধনা’। অন্নদাশঙ্কর লিখতেন তিন ভাষাতে-ইংরাজী, ওড়িয়া, বাংলায়। এই চার বছরের মধ্যে চৌদ্দ কবিতা লিখেছিলেন। কবিতাগুলি পর্যায়ক্রমে ‘উৎকল সাহিত্য’, ‘সহকার’ ও ‘সবিতা’ সাহিত্য পত্রে প্রাকাশিত হয়েছিল। কবিতাগুলি হল,—‘প্রলয় প্রেরণা’, ‘সৃজন-স্বপ্ন’, ‘মানসি ও মুঁ’, ‘যৌবন থরে গেলে আর আসে না’, ‘উদভিন্ন যৌবন’, ‘পরীমহল’, ‘প্রণয়ী’, ‘কমল বিলাসীর বিদায়’, ‘সাগর প্রতি’, ‘এ জীবন দেলা মতে কিএ’, ‘কৌনসি প্রিয়ার প্রতি কৌনসি প্রিয়’, ‘চিরন্তন নর চাহেঁ চিরন্তন নারী’, ও ‘নীরব কবি’। হরিহর মহাপাত্র এ প্রসঙ্গে বলেছেন,—‘আমাদের পাঁচজনেরই ছিল সাহিত্যে আসক্তি, সাহিত্য সাধনার আকাংখা ইংরেজী ও বাংলা বই এবং পত্রপত্রিকা সম্বন্ধে আগ্রহ, সবচেয়ে বেশি ছিল রবীন্দ্রনাথের প্রতি অনুরাগ। ‘উৎকল সাহিত্য’ তখন প্রথম সারির ওড়িয়া মাসিকপত্র হিসাবে সুপ্রতিষ্ঠিত। পত্রিকারি সম্পাদক বিশ্বনাথ করের সঙ্গে আমাদের একদিন অপ্রত্যাশিতভাবে আলাপ হল। অপার স্নেহে বিশ্বনাথবাবু আমাদের কাছে টেনে নিলেন, বিনা দ্বিধায় তাঁর পত্রিকায় আমাদের লেখা ছাপতে শুরু করলেন—রাতারাতি আমরা ওড়িয়া সাহিত্য জগতে ব্যপক পরিচিতি লাভ করলাম। পরবর্তী কালে আমাদের গোষ্ঠী ‘সবুজগোষ্ঠী’ নামে অভিহিত হয়, আমাদের সাহিত্যকৃতিও ‘সবুজসাহিত্য’ নামে পরিচিত হয়’। এই সবুজদলের অন্যান্য সভ্য শান্তি মুখার্জী, শ্যামাচরণ মুখার্জী, নগেন্দ্রনাথ দত্ত, হরিশচন্দ্র বড়াল, সচ্চিদানন্দ রাউত রায়, মায়াধর মানসিংহ, চিন্তামনি মহান্তি। সবুজপত্রে প্রকাশিত কবিতাগুলি ওড়িয়া তরুণ সাহিত্যিক মণ্ডলীকে বিশেষভাবে আলোড়িত করে। অন্নদাশংকর রায় বলেছেন—‘They styled themselves as Sabujas or Green initiating the same momenclature which Tagore and Promotha Chowdhury had coined and publicised in Bengal at one time as a counter-blast to the old and orthodox in Bengal society. And like the Bengali Sabujpatra they two had and other piece of their own in Yuga Bina (The lyre of the times)’.

সবুজদলের এই উৎসাহ বা প্রেরণায় সৃষ্টি মূল যেহেতু উড়িষ্যার মৃত্তিকায় ছিল না। তাই সবুজদলের স্থায়িত্বও এক দশকের বেশি নয়। তবু সবুজদল ওড়িয়া সাহিত্যের গতানুগতিকতার ক্ষেত্রে যে একটা আলোড়ন এনেছিল তার ঐতিহাসিক মূল্য উপেক্ষণীয় নয়। মায়াধর মানসিংহ ওড়িয়া সাহিত্য নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছেন,—‘The greens, neverthless, left a deep influence on the younger generation for at least two decades They made the Tagore rhyme-schemes story in Oriya literature, along with the indigenous ones, Many Poems of Anndasankar Roy and Baikuntha Patnayak written on those every days are accepted by all critics as we loom additions to the treasure house of Oriya language.’

ওড়িয়া সাহিত্যের পাশাপাশি বাংলায় কবিতা পাঠালেন ‘প্রবাসী’তে (কবিতার নাম ‘কৃষ্ণ’)। ‘পারিবারিক নারী সমস্যা’ নামে এক প্রবন্ধ পাঠালেন ভারতী’তে। অবশ্য এর আগেই কটক কলেজের ম্যাগাজিনে অধ্যাপক শচীন্দ্রলাল দাস বর্মার An Anti-feminist Cry কবিতারি উত্তরে অন্নদাশঙ্কর লিখেছিলেন এ Feminist Counter-cry নামে এক কবিতা। এরপর তিনি ‘নানাকথা’ নামে আর এক প্রবন্ধ লিখে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করলেন। পাশাপাশি তিনি ওড়িয়া ভাষায় অষ্টাদশ শতাব্দীর কবি ব্রজনাথ বড়জেনার কাব্যের সূত্র ধরে লেখেন ‘সমর ও সাহিত্য’ বিখ্যাত প্রবন্ধটি। পরের প্রবন্ধ ‘নর চক্ষুর নারী’। প্রবন্ধটি ওড়িশাতে নারী সম্পর্কিত চিন্তায় নতুন ধারার সূচনা করে। এরপর আরেক প্রবন্ধ লেখেন ‘ভারতের শিল্প’। এই সময়েই তিনি টলস্টয়ের ‘হোয়াট ইজ আর্ট’ গ্রন্থখানি পড়েন। মনে কতকগুলি প্রশ্নের উদয় হয়। পূজোর ছুটিতে শান্তিনিকেতনে বেড়াতে এসে এক সকালে যখন রবীন্দ্রনাথ প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছেন যুবক আন্নদাশঙ্কর এলেন রবীন্দ্রনাথের কাছে, অনুমতি নিয়ে বললেন,—টলস্টয়ের ‘হোয়াট ইজ আর্ট’ পড়ে আমার মাথায় একটা প্রশ্ন ঘুরছে,—‘Is Art too good to be human nature’s daily food’? রবীন্দ্রনাথ একটু থেমে পাল্টা প্রশ্ন করলেন,—‘Can everybody understad higher mathematics? Do you think it can be watered down to the common level?’ আচ্ছা এর উত্তর দেব বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্তৃত্বায়। পরে তাঁর সেই বক্তৃত্বা স্থান পায় সাহিত্যের পথে গ্রন্থটিতে।

কটকে আই-এ পাস করার পর বি-এ পড়তে এলেন পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রথমে ইতিহাসে অনার্স নিলেও পরে ইংরাজী অনার্স নিয়ে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হন। এম-এ তেও ভর্তি হন। কিন্তু অসময়ে ‘বাসন্তী’ (এই সময় ‘ভারতী’ পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে বারোয়ারি উপন্যাস প্রকাশিত হতে থাকে। এই দেখে অন্নদাশঙ্কর, কালিন্দীচরণ ঠিক করলেন যে ওড়িয়া’তেও বারোয়ারি উপন্যাস লিখবেন। এই পরিকল্পনা অনুসারে বিশ্বনাথ কর সম্পাদিত ‘উৎকল সাহিত্য’ পত্রিকায় অন্নদাশঙ্কর ও তাঁর বন্ধুবর্গ ‘বাসন্তী’ নামে এক বারোয়ারি উপন্যাস লেখা শুরু করেন। ওড়িয়া সাহিত্যের ইতিহাসে ‘বাসন্তী’ এইজন্য গুরুত্বপূর্ণ যে এইটেই ওড়িয়া’তে প্রথম বারোয়ারি উপন্যাস। আর অন্নদাশঙ্করের জীবনে বাসন্তীর গুরুত্ব এই যে এইটেই গল্প-উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে তাঁর প্রথম প্রয়াস) নামে এক বারোয়ারি উপন্যাস লিখতে গিয়ে প্রেমে পড়লেন। বারেয়ারি উপন্যাসের প্রস্তাব স্বয়ং অন্নদাশঙ্কর দিয়েছিলেন তৎকালীন উৎকল সম্পাদক বিশ্বনাথ করকে, তিনি রাজী হলেন। শুরু হল উপন্যাস লেখা মোট নয়জন লেখক লেখিকা উপন্যাসটিতে লিখেছিলেন। এদের মধ্যে একজন ‘সরলাদেবী’। তিনি ছিলেন ধনী জমিদারের শিক্ষিতা গৃহবধূ। প্রথমে পত্রের মাধ্যমে অন্নদাশঙ্করের সঙ্গে আলাপ পরে ঘনিষ্টতা। শিক্ষিতা নারী সামন্ততান্ত্রিক জমিদারের অন্তঃপুরে থাকবে, অন্নদাশঙ্কর তা মেনে নেন নি। মুক্ত করার তিনি উপায় খুঁজলেন। এম-এ পড়া বন্ধ হল। আই-সি-এস পরীক্ষা দিলেন ১৯২৬ সালে। কারন আই-সি-এস পরীক্ষায় পাশ করলে দুজনে চলে যাবেন ইংলণ্ডে সেখানে দুবছর কাটিয়ে দেশে ফিরলে সব সমস্যার সমাধান। প্রথম বার আই-সি-এস পরীক্ষায় তিনি পঞ্চম স্থান পেলেও তাঁর পরিবর্তে সরকারি মনোনয়ন পেলেন যাঁরা, তাঁরা প্রতিযোগিতায় তাঁর চেয়ে অনেক পেছনেস্থান পেয়েছিলেন। ১৯২৭ সালে আবার দিলেন। হলেন প্রথম। কিন্তু সরলা মুক্ত হল না। মনে মনে মুক্ত করলেন সরলাকে শেষ কবিতা লিখলেন ওড়িয়া ভাষায়, তাকেই কেন্দ্র করে ‘কমল বিলাসীর বিদায়’।

ইতিমধ্যে তাঁর বন্ধু কৃপানাথ মিশ্র জানালেন যে ‘বিচিত্রা’ নামে বাংলায় এক নতুন পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে যার সম্পাদক উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়কে কৃপানাথ খুব ভালো ভাবে চেনেন। কৃপানাথের মারফত অন্নদাশঙ্কর এক প্রবন্ধ পাঠালেন বিচিত্রা’য় প্রকাশের জন্য। প্রবন্ধ ‘রক্তকরবীর তিনজন’ নামে বিচিত্রা’য় পত্রস্থ করে উপেন্দ্রনাথ আরও লেখা চাইলেন অন্নদাশঙ্করের কাছে। তখন অন্নদাশঙ্কর ইংলণ্ড যাবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বিচিত্রা’র সম্পাদককে জানালেন যে তাঁর ইয়োরোপের ভ্রমণের কাহিনী কিস্তিতে কিস্তিতে লিখে পাঠাবেন। ইয়োরোপ যাত্রর সঙ্গে সঙ্গে বিচিত্রা’য় শুরু হল তাঁর ‘পথে প্রবাসে’র প্রকাশ। বাংলা সাহিত্যে অন্নদাশঙ্করের খ্যাতির সূচনা।

আই-সি-এস দিয়ে ইংলণ্ডে যাবার পথ হল সমস্যা জর্জরিত। মুখ্যত অর্থনৈতিক সমস্যা মূল কারন। ছোটকাকা পরামর্শ দিলেন,—বিয়ে করে শ্বশুরের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বিলেতে যাও। অন্নদাশঙ্কর রাজী হলেন না। একদিন পুরীর সমুদ্র সৈকতে দেখা উৎকল সাহিত্যের বর্ষীয়ান সহ-লেখক লক্ষ্মীনারায়ণ পট্টনায়কের সঙ্গে অন্নদাশঙ্কর তাঁকে বললেন,—তিনিই সাহায্য করলেন। ১৯২৭ সালের জুলাই মাসে অন্নদাশঙ্কর ইংলেণ্ডর উদ্দেশ্যে ঢেঙ্কানাল ত্যাগ করলেন। রেলপথে বম্বে। জলপথে বম্বে থেকে নেমে আবার রেলপথে এলেন ক্যালে। তারপর ইংলিশ চ্যানেল পার হয়ে জলপথে র্নিদষ্ট দিনের সাতদিন আগেই লণ্ডনে পৌঁছলেন। জাহাজে তাঁর সহযাত্রী ছিলেন দ্বিজেন্দ্রলাল মজুমদার ও হিরন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়। দ্বিজেন্দ্রলাল গেলেন কেম্ব্রিজে শিক্ষানবিশি পাঠ করতে আর অন্নদাশঙ্কর ও হিরন্ময় ভর্তি হলেন লণ্ডনের স্কুল অব ওরিয়েণ্টাল স্টাডিজে। এই দু’জন মিলে হ্যাম্পস্টেড হীথের কাছাকাছি ১৫নং পার্ক হিল রোডে সরোজকুমার দাস ও তাঁর স্ত্রী তটিনী গুপ্তর সঙ্গে ঘর ভাড়া করে লণ্ডন বাস শুরু করেন। স্কুল অব ওরিয়েণ্টাল স্টাডিজ ছাড়াও অন্নদাশঙ্কর লণ্ডন স্কুল অব ইকনমিক্স, ইউনিভার্সিটি কলেজে এবং কিংস কলেজে অধ্যয়ন করেন।

অবকাশ পেলে চলে যান লণ্ডনের বাইরে অথবা ইংলণ্ডের বাইরে। এর মধ্যে তিনি খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন ‘ভারতী’ এবং ‘প্রবাসী’র অন্যতম সাহিত্যিক মনীন্দ্রলাল বসু ব্যারিস্টারি পড়তে এসে সুইজারল্যাণ্ডে আছেন। বড়দিনের অবকাশে তিনি চলে এলেন মনীন্দ্রলালের কাছে। মনীন্দ্রলাল ফরাসী জার্মান ভাষা ভালই জানতেন তাঁকে সঙ্গে করে অন্নদাশঙ্কর এলেন ‘জন ক্রিস্টোফার’ এবং ‘রম্যা রলাঁর’ সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। শিল্পের মূল্য সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথকে যে প্রশ্ন করে ছিলেন ঠিক একই প্রশ্ন করলেন রলাঁকে। দু’জন মনীষীর উত্তর এল দু’রকম তার প্রতিফলন আমারা পাই ‘বিনুর বই’ এর দ্বিতীয় পর্বে ‘বিনুর নিয়তি’ শীর্ষক পরিচ্ছদে। এছাড়া ‘পথে প্রবাসের’ পাতায় পাতায় আমরা তাঁর এই আই-সি-এস পড়তে এসে ইওরোপ ভ্রমণের কাহিনী জানতে পারি।

ইংলণ্ডে থাকাকালীন অন্নদাশঙ্কর বাংলা সাহিত্যের প্রতি সবচেয়ে বেশী আকৃষ্ট হলেন। ‘মৌচাক’ পত্রিকায় ছোটদের জন্য ধারাবাহিক ভাবে শুরু করলেন ইউরোপের চিঠি। ১৯২৮ সালে ‘কল্লোল’ পত্রিকার পক্ষ থেকে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত এবং ‘কালিকলম’ পত্রিকার পক্ষ থেকে মুরলীধর বসু ও শিশির নিয়োগী তাঁকে লেখার জন্য আমণ্ত্রণ জানালেন। ‘কালিকলম’ পত্রিকার আহ্বানে নয়টি প্রবন্ধ লেখেন। সেগুলি হল,—‘তারুন্য ধর্ম’, ‘ধর্মস্য গ্লানিঃ’, ‘সৃষ্টির দিশা’, ‘প্রচ্ছন্ন জড়বাদ’, ‘একলা চল রে’, ‘যতি ও সতী’, ‘প্রতিমাভঙ্গ’, ‘মনে মনে’, ‘নব্যনীতি’। প্রথম সাতটি প্রবন্ধ একত্র করে ১৯২৮ সালে ‘তারুণ্য’ নামে তাঁর প্রথম বাংলা গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। সেই সঙ্গে ‘নীতিজিজ্ঞাসা’, ‘স্ত্রীপুরুষ’, ‘রবীন্দ্রাদিত্য’, প্রভৃতি কয়েকটি প্রবন্ধ লেখেন ‘কালিকলম’এ ও ‘কল্লোল’এ।

১৯২৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ফিরে এলেন ভারতে। বোম্বাই বন্দরে পদার্পণের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে গেল আই-সি-এস রূপে অন্নদাশঙ্করের চাকরী জীবন। কিন্তু তাঁর কর্মস্থল সম্বন্ধে কিছুই জানতেন না। বোম্বাই থেকে এলেন কলকাতায়। উঠলেন আমহার্স্ট স্ট্রীট হ্যারিসন রোড়েব সংযোগস্থলে এক হোটেলে। তখন তিনি বাংলা সাহিত্যে সুপ্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক। তাঁর সঙ্গে এসে সাক্ষাৎ পরিচয় করলেন অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত ও বিষ্ণু দে প্রমুখ কয়েকজন তরুন সাহিত্যিক। অচিন্ত্যকুমার একদিন নিয়ে গিয়ে পরিচয় করিয়ে দিলেন প্রমথ চৌধুরী এবং উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে। উপেন্দ্রনাথ ‘বিচিত্রা’র জন্য একখানি উপন্যাস চাইলেন। কর্মের তাগিদে দেখা করলেন চিফ সেক্রেটারীর সঙ্গে। তিনি বললেন,—মুর্শিদাবাদ জেলার সদর বহরমপুরে গিয়ে কার্যভার গ্রহণ করতে। অন্নদাশঙ্কর পনের দিনের ছুটি চাইলেন, মঞ্জুর হল মাত্র সাত দিনের, এলেন ঢেঙ্কানালে। ছুটি কাটিয়ে ফিরে এলেন। কার্যভার গ্রহণ করলেন বহরমপুরে এসে। একটা বাসা ভাগাভাগি করে দ্বিজেন মজুমদার আর তিনি থাকলেন।  পাশাপাশি চলল সাহিত্য সাধনা।

এরি মধ্যে একদিন অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তর সঙ্গে গেলেন শান্তিনিকেতনে। দেখা করলেন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। রবীন্দ্রনাথ পথে-প্রবাসে পড়েছেন। অন্নদাশঙ্কর সেই অর্থে পরিচিত। রবীন্দ্রনাথ জানতে চাইলেন,—আই-সি-এস’রা তো কর্মের জন্য সারা ভারতবর্ষ ঘুরবে তা হঠাৎ তুমি কেনো বাংলাকে বেছে নিয়েছো ? যুবক অন্নদাশঙ্কর উত্তর দিলেন,—তিনি চাকরির দিক থেকে বিষয়টাকে দেখেন নি, দেখেছেন সাহিত্যের দিক থেকে। ইয়োরোপ দেখবার জন্য যেমন আই-সি-এস হয়েছেন ঠিক তেমনি আই-সি-এস হওয়ার সুযোগ নিয়ে তিনি বাংলা দেখবেন। এই সময় রবীন্দ্রনাথ দুই তরুনের কাছে ‘লোকলক্ষ্মী গর্ভিণী’। এই কথার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছিলেন এইভাবে যে,—গর্ভিণী নারীর যেমন একমাত্র চিন্তা হল গর্ভ রক্ষা করা তেমনই শিল্পীরও একমাত্র চিন্তা হওয়া উচিত, শিল্পের জন্য যে-আবেগকে অন্তরে ধারণ করেছেন শিল্পী, তাকে কেমন করে লোকসমক্ষে উপস্থাপন করবেন। আর একবার ১৯৩৭ সালে তিনি যখন  রাজশাহীর জেলা শাসক তখন হঠাৎ একদিন একটা টেলিগ্রাম আসে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ আত্রাইঘাটে অন্নদাশঙ্করের উপস্থিতি কামনা করেছেন। গিয়ে দেখেন ঘাটে সারি সারি প্রজাদের ভীড় তার মাঝে রবীন্দ্রনাথ এরপর রবীন্দ্রনাথ এবং অন্নদাশঙ্কর স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে পাশাপাশি বসেন, ট্রেন এলে একসঙ্গে নাটর পর্যন্ত যাত্রা। তিনি বললেন,—‘আমি আজকাল ছড়া লিখছি। তুমি লেখ না কেন ?’ আমি সবিনয় নিবেদন করি ছড়া আমার হাত দিয়ে হবে না। তিনি কলকাতা ফিরে গিয়ে কি মনে করে আমাকে তাঁর ‘সে’ বইখানি পাঠিয়ে দেন। অন্নদাশঙ্কর বইখানি নিয়ে নাড়াচড়া করেন গুরুদেবের কথাগুলি মনে পড়ে এরপর আবার লিখতে শুরু করলেন ছড়া।

অবশ্য ছড়া সমগ্র’র (১৯৯৪) ভূমিকায় অন্নদাশঙ্কর একটু অন্য কথা বললেন,—‘যারা আমাকে খাইয়ে পড়িয়ে আয়েসে আরামে বাঁচিয়ে রেখেছে তাদের শ্রমের ঋণ আমি শোধ করব কি উপায়ে ? আমি তো চাষি বা কারিগর বা মজুর নই। এ ঋণ অর্থ দিয়ে শোধ করা যায় না। সেইজন্য গান্ধীজী বলেছেন সুতো কে তাদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে তাদের ঋণ শোধ করতে। কায়িক শ্রমে আমার মন নেই। জোর করে চরকা কেটেছি, ছেড়ে দিয়েছি। পিতৃঋণ, ঋষিঋণ ইত্যাদির মতো এটাও একপ্রকার ঋণ। কাব্যে বা উপন্যাসে বা প্রবন্ধে এ ঋণ আমি শোধ করতে পারিনি। পারবও না। কোনো মতেই সে সব রচনা সহজবোধ্য হবে না। সহজবোধ্য করতে গেলে দুধের সঙ্গে জল মেশাতে হবে। সেটা আমার নীতি নয়। তাহলে আমি কি করব ? আমি ছড়া লিখব। কিন্তু লিখতে পারব কি? ‘না’ ‘না’ করতে করতে একদিন লিখেই ফেলি….’

আমার তৃতীয় উপন্যাস ‘যার যেথা দেশ’ সত্যাসত্যে’র প্রথম পর্ব। ইটালিতে ফ্লোরন্স দেখতে গিয়ে মনে হল ফ্লোরন্স এই নাম দিয়ে পৃথিবীর একজন বিখ্যাত মহিয়সী নারীর নাম আছে ‘ফ্লোরন্স নাইটিঙ্গেল’। ভারতবর্ষেও এমন কোনো শহর নিশ্চয়’ই আছে যার নামে আমার উপন্যাসের নায়িকার নাম হতে পারে। মনে পড়ে গেল ‘উজ্জয়িনী’ শহরের নাম। তবে উপন্যাস লেখা তখনও শুরু করিনি। কি লিখব তখনও জানি না। তখন ইতালির ইতিহাসে পুরোদস্তুর ফাশিস্ত গভর্ণমেণ্ট প্রতিষ্ঠার পর্ব। মনকে ভীষন ভাবে নাড়া দিল। এক কথায় যাকে বলে ‘ডিকটেটর শিপ’। এই নিয়ে একটা প্রবন্ধও লিখেছিলেন সুধীন্দ্রনাথ দত্ত সম্পাদিত ত্রৈমাসিক ‘পরিচয়’ পত্রিকায়। তখনও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ অনেকের কাছেই অবাস্তব বা অবিশ্বাস্য ছিল। ডিকটেটর আসল চেহারা চেনবার চেষ্টা করেছিলেন রমাঁ রলাঁ। তিনিই মুসোলিনী সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীকে সতর্ক করেছিলেন। তবু রবীন্দ্রনাথ মুসোলিনীর আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন। মাধব সদাশিব গোলওয়ালকর জার্মানির নাৎসিবাদের প্রশস্তি রচনা করেন ‘উই অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইণ্ড’-এর ৩৫ পৃষ্ঠায়। পক্ষান্তরে ১৯৩৫ সালে অন্নদাশঙ্কর লেখেন,—‘একই বীজ থেকে কি করে দুই জাতের চারা হতে পারে তা আমাদের সকলের জেনে রাখা ভালো। নইলে বুনব ডেমক্রেসি আর ফলবে ডিকটেটরশিপ’। তবে এর থেকেও বড় ব্যাপার ছিল ‘লস অফ ফেইথ’। বিশ্বাস হারানো। মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ। কিন্তু এই পাপ আজ অহরহ হচ্ছে। পশু বিশ্বাস ছাড়াও বাঁচে, মানুষের বেঁচে থাকার জন্য একটা অবলম্বন চাই। একটা কোন বিশ্বাস। কী নিয়ে বেঁচে থাকবে? বেঁচে থাকার কিছু কারন না পেলে আসে ‘ডেথ উইশ’। মৃত্যু ইচ্ছা। কেউ আত্মহত্যা করে, কেউ আবার পারে না। গোড়াতে ভেবেছিলাম পাঁচটা খণ্ড লিখব। গান্ধীবাদ, কম্যুনিজম্, লিবারালিজম্—এরকম পাঁচটা আইডিয়া নিয়ে পাঁচ খণ্ড। উপকরণ মাথাতেই ছিল না। উপন্যাসটা তখন শুধু কল্পনা। উপেন্দ্রনাথ চাপ দিলেন। কল্পনাটাকে মাথা থেকে কাগজে নামানো শুরু করলাম। ‘বিচিত্রা’তে প্রথম দু’একটা চ্যাপ্টার সাধু ভাষাতে বেড়োয়। সংলাপ অংশ চলিত ভাষায়। পরে প্রমথ চৌধুরীর পরামর্শে পুরোটাই চলিত ভাষায় লিখি।

তবে ‘আগুন নিয়ে খেলা’ আমার প্রথম গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত উপন্যাস। আমি তখন বহরমপুরে। অন্য একটা কাজে কলকাতায় এসেছি। বরযাত্রী গেছি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তর বিয়েতে। বউভাতের অনুষ্ঠানে পরিচয় হল গৈরিক ধারী কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে এবং ডি. এম্. লাইব্রেরীর স্বত্বাধিকারী গোপাল দাস বাবুর সঙ্গে। তিনি বললেন উপন্যাস দিন। আমি তখন ‘যার যেথা দেশ’ লিখছি। বললাম এই উপন্যাসটা শেষ না হলে কি করে লিখি ? কলকাতা থেকে বহরমপুরে ট্রেনে ফিরতে ফিরতে মনে এসে গেল ‘আগুন নিয়ে খেলার’ কাহিনী। ফিরে এসে শুরু করলাম ঝড়ের বেগে। মাত্র ছযদিনের কাহিনী। নায়িকা ‘পেগী’ কে নিয়ে তখন বিতর্ক হয়েছিল। কেউ কেউ বলেছিলেন উনি আমার স্ত্রী। আজ বলি ও কোন নারী নয় আমার পাটনার ঘনিষ্ট বন্ধু ভবানী ভট্টাচার্য। আর ভবানীই আমার সঙ্গে আমার মার্কিণী স্ত্রীর প্রথম পরিচয় করিয়ে দেন। ১৯৩০ সালের ২৩ শে অক্টোবর রাঁচীতে খ্রীষ্টান ম্যারেজ অ্যাক্টে অ্যালিস ভার্জিনিয়া অর্ণডর্ফের সঙ্গে আমার বিবাহ হয়। শ্রীমতী অর্ণডর্ফ পরিচিত হন ‘লীলা রায়’ নামে। মার্কিন বংশোদ্ভূতা স্ত্রীর এই নতুন নামকরণের মধ্যে নিহিত আছে অন্নদাশঙ্করের আধ্যাত্মিক ভাবনা। লীলা হল সৃষ্টি আর সৃষ্টির মধ্যেই স্রষ্টার প্রকাশ। চার বছরের মধ্যে হলেন দুই সন্তানের জনক-জননী। ‘আগুন নিয়ে খেলা’ ভ্রমণ কাহিনীর ঢঙে লেখা উপন্যাস।

এই উপন্যাস লিখতে লিখতেই ‘পুতুল নিয়ে খেলা’ উপন্যাসের কাহিনী মনে আসে। এতেও কিন্তু অলিখিত ভাবে জড়িয়ে আছে ‘ভবানী ভট্টাচার্য’। ভবানী’র বাবা ছিলেন জেলা জজ। ভবানীর বিয়ের জন্য তিনি কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। পাত্রের পরিচয় দিয়েছিলেন ‘বীয়িং দি ওনলি সন অব আ ডিস্ট্রিক্ট জজ’ ওই বিজ্ঞাপন থেকেই আমার মনে ‘পুতুল নিয়ে খেলা’র  আইড়িয়াটা আসে।

‘আগুন নিয়ে খেলা’ আমার প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস। জীবনে প্রথম লেখা উপন্যাস ‘অসমাপিকা’। অসমাপিকা যখন বই হয়ে বেরোয় তখন আমি ‘সত্যাসত্য’ লেখা নিয়ে তন্ময়। ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতাটা সত্যি। প্রেমে ব্যর্থ, কিন্তু সাহিত্যে সফল। সত্যাসত্য সম্বন্ধে অনেক প্রশংসা হচ্ছিল। আমার তখন প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস। ইতিমধ্যে আমার পদন্নোতি হয়েছে। নদীয়া জেলার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট। সাহিত্যে সফল, তার সঙ্গে চাকরিতে সফল। আমি অন্য মানুষ হয়ে গেলুম। সাহিত্য চুলোয় গেল। চাকরিতে সাকসেসফুল হতে হবে। সাহিত্যে অবহেলা এল। ওটাই আমার ডার্কেস্ট এজ। রাজশাহীর জেলা শাসক থাকা কালে বাংলার প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হকের সঙ্গে তাঁর বিরোধ বাধে তাঁকে প্রশাসন বিভাগ থেকে বদলি করে বিচার বিভাগে নিয়ে আসা হয়। তিনিও কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা জজের দায়িত্ব নেওয়ার আগে লম্বা ছুটি নিয়ে বেড়াতে গেলেন শ্রীলঙ্কা, দক্ষিন ভারত, ফেরার পথে গেলেন কটক। সেখানে মেজ ছেলে চিত্রকামের চিকিৎসা বিভ্রাটে মৃত্যুহল। তখন আমার হুঁশ হল। কোন পথে চলেছি আমি ? দুঃখ মোচন থেকে ব্রেক হয়ে গেল। ১৯৩৬ থেকে প্রায় ১৯৪০ পর্যন্ত বন্ধ্যা। কি করে সাহিত্যে ফিরে আসা যায় ? ‘মর্তেরস্বর্গ’ ও ‘অপসরণ’ লিখে ঠিক করি ‘অসমাপিকা’ নতুন করে লিখব। প্রেমের কাহিনী, প্রেমের ভাষায় লিখতে হবে। ওখানার প্রতি আমার স্বাভাবিক দুর্বলতা ছিল। অপটু সন্তানের প্রতি মায়ের যেমন হয়। কিন্তু আমি তখন বিচারকের আসনে বসে যতরকম মামলা মকদ্দমার রায় লিখছি। রায় লেখার হাত দিয়ে প্রেমের ভাষা বেরোয় না। শুধু ভাষা নয়, চাই নতুন স্টাইল। রবীন্দ্রনাথ যেমন ‘লিপিকা’র জন্য নতুন স্টাইল উদ্ভাবন করেন। তাই নতুন করে ‘অসমাপিকা’ লেখার প্ল্যানটাকে পোস্টপন করলুম। ‘মর্তেরস্বর্গ’ শেষ হল না, তখন অপসরণ লিখে সত্যাসত্য শেষ করলুম। কিন্তু অসমাপিকাকে নতুন করে লেখা হয়ে ওঠে না।

এই প্রসঙ্গে বলে রাখি,—১৯২৯ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত মুর্শিদাবাদ, বাঁকুড়া, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, ঢাকা, মৈমনসিংহ প্রভৃতি অবিভক্ত বাংলায় ১৮ জেলায় অ্যাসিসট্যান্ট ম্যাজিস্ট্রেট, সাব ডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেট, ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্ট্রেট ও ডিস্ট্রিক জজ হয়ে জীবন কাটাই। ১৯৫১ সালে জুডিসিয়াল সেক্রেটারি ও লিগ্যাল রিমেমব্রান্সার পদে থাকাকালে অবসর গ্রহন করি। বসবাস শুরু করি শান্তিনিকেতনে।

অন্নদাশঙ্কর যখন ঢাকায় ছিলেন তখন স্থানীয় সাহিত্য প্রেমীরা তাঁর কাছে আসা যাওয়া শুরু করলেন। এই সময় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিষয়ে তিনি অনেক গুলি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। এই বিষয়ে তাঁর জিজ্ঞাসা গুলিকে তিনি আমাদের প্রাত্যহিক বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করলেন। বুঝিয়ে দিলেন ব্যাধির সম্বন্ধে অজ্ঞতা বা উদাসীনতা ব্যাধির হাত থেকে বাঁচার উপায় নয়, ব্যাধিকে নির্ণয় করা তার সঙ্গে মোকাবিলা করাই হল প্রকৃত প্রতিকার। এই সময় একদল তরুন তাঁর কাছে এলেন পত্রিকা প্রকাশের পরিকল্পনা নিয়ে। অন্নদাশঙ্কর পত্রিকার নাম করন করলেন ‘সবুজবাংলা’। প্রথম সংখ্যায় ‘মাদ্রাসী বাঙলা’ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। ওই প্রবন্ধটিতে তিনি মাদ্রাসা শিক্ষার কুফল সম্বন্ধে তীব্র সমালোচনা করেন এবং কুপ্রভাব মুক্ত হওয়ার জন্য প্রস্তাব দেন। এছাড়া আর এক পত্রিকার বিশেষ প্রচার ছিল স্থানীয় সাহিত্য সমাজে। পত্রিকারি পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন দুই ভাইবোন শামসুর নাহার ও হাবিবুল্লাহ বাহার। পত্রিকার নাম ‘বুলবুল’। এই পত্রিকায় অন্নদাশঙ্কর ‘দাঙ্গা’, ‘জীবিকা’, ‘হিন্দু-মুসলমান’, প্রভৃতি প্রবন্ধ লেখেন। এই প্রবন্ধ গুলির মধ্যে তিনি তৎকালীন সমাজের নানা ছায়াচ্ছন্ন দিকে অর্থপূর্ণ আলোকপাত করেন।

সাহিত্যে সময় দেব বলেই চাকরি থেকে স্বেচ্ছা অবসর নিলুম। (তখন চিফ সেক্রেটারী ছিলেন সুকুমার সেন এবং স্বরাষ্টমন্ত্রী ছিলেন কিরণশঙ্কর রায়। মন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর মতোবিরোধ হল, তাঁকে বদলি করা হল কলকাতায়, এই বদলি তিনি মেনে নিলেন না। চিফ সেক্রেটারী অন্নদাশঙ্করের জন্য জওহরলালকে চিঠি লিখলেন ওর ওপর অবিচার হযেছে। এরপর গরিমসী করে আরো প্রায় এক বছর কেটে গেল। চিফ সেক্রেটারী হলেন সত্যেন্দ্রনাথ রায়। একুশ বছর কয়েক মাস চাকরী করার পরে তিনি অবসর নিলেন। অবশেষে ১৯৫১ সালে শুরু হল তাঁদের বহু বাঞ্ছিত শান্তিনিকেতনে বাস।) লিখতে গিয়ে দেখি না লিখে লিখে হাত খারাপ হয়ে গেছে। একেই বলে পুরুষের ভাগ্য। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে সাহিত্য করলুম। সাহিত্যে সফল। মাথায় সাফল্যের ভূত চাপল। চাকরিতে সফল হলাম। সাহিত্যে ব্যর্থ। কালী দেবীর এমন অভিমান যে চাকরি ছেড়েও তাঁর মন ভাঙানো যায় না। তখন ‘না’ আর ‘কন্যা’ এই দু’খানা উপন্যাস লিখি। কন্যা লিখে বুঝলাম, লেখার হাত ফিরে পেয়েছি। তখন ‘রত্ন ও শ্রীমতী’ উপন্যাস লিখি প্রায় পঁচিশ বছর পরে। কিন্তু এমন ভাগ্য, বার বার বাধা আসে। ভেতরে বাধা, বাইরে বাধা। এ আমার পরাজয়ের সাক্ষ্য। পর্বতের কাছে পরাজয়। কারন কি জান ?—মাউনটেনীয়রের জীবনে এমন অনেক মুহুর্ত আসে যখন জেদ করে এগোবার চেষ্টা করলে অবধারিত মৃত্যু। তখন পিছিয়ে আসতে হয়। মেনে নিতে হয়, পর্বত জয়ী হয়েছে। ‘অসমাপিকা’, ‘রত্ন ও শ্রীমতী’র কেসটাও তাই। আমি বারে বারে হেরে গেছি।

আমার শেষ গ্রন্থ ‘ক্রান্তদর্শী’, তার আগে একটা প্রবন্ধ লিখেছিলাম ‘আর্ট’ নামে আমার জীবনে সবচেযে বেশী সময় ধরে লেখা গ্রন্থ। আমি তখন শান্তিনিকেতনে। এমন সময় বুদ্ধদেব বসুর ডাক পাই। তাঁর ‘কবিতা’ পত্রিকার জন্য ধারাবাহিক প্রবন্ধ চাই। বিষয় ‘আর্ট’ এর মূল সূত্র। রবীন্দ্রনাথ। রমাঁ রলাঁ। টলস্টয়। টলস্টয়কে চোখে দেখিনি। কিন্তু টলস্টয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা কিউরিয়াস। টলস্টয়ের গল্প অনুবাদ করেই আমার সাহিত্য জগতে প্রবেশ। টলস্টয়ই আমার সাহিত্যের ছাড় পত্র। তাই কিছু একটা করার প্রত্যাশা মনে মনে ছিল। বুদ্ধদেব বাবু আমায় সেই সুযোগটা দিয়েছিলেন। যাক, ক্রান্তদর্শী’র কথায় আসি। স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে দেশের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় এল। ব্রিটিশ যুগ শেষ কিংবা বলতে পারি গান্ধী যুগ শেষ। গান্ধী হত্যার ঠিক পর দিন ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনীর শেষ জাহাজও ভারত ভূখণ্ড থেকে ফিরে গেল ইংলণ্ডে। যে ঘটনাকেই ধরি না কেন, একটা অধ্যায়ের শেষ, নতুন অধ্যায়ের শুরু। নতুন করে বাঁচা। গান্ধীজী এই স্বাধীনতাকে বলেছেন,—‘ইন গ্লোরিয়াস এণ্ডিং অব এ গ্লোরিয়াস স্ট্রাগল’। ইচ্ছে ছিল বড় একটা বই লেখা। উপন্যাস নয়। সমাজের পুর্ণবিন্যাস। হলো ক্রান্তদর্শী। গ্রন্থটি একটি যুগকে চিহ্নিত করেছে। এমন যুগ, যখন একই কালে সংগঠিত হচ্ছে বিশ্বযুদ্ধ, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম, হিন্দু-মুসলমানে দ্বন্দ্ব, ব্রিটিশ অপসারণ। এবং একাধিক অর্থে মহাত্মা গান্ধীর মৃত্যু। গান্ধীজির লক্ষ্য ছিল একটি মরাল ওয়ার্ল্ড, যে জগৎ রাজনীতির দ্বারা নয়, নীতির দ্বারা শাসিত। রাজনীতি তার একটা আবশ্যক অঙ্গ। আমরা কিন্তু মরাল ওয়ার্ল্ডের কথা চিন্তা করি না, যার কথা চিন্তা করি সে হচ্ছে এক মডার্ন ওয়ার্ল্ড। যেখানে নীতি অত্যাবশ্যক নয়। যেমন রাজনীতি আর অর্থনীতি অত্যাবশ্যক। এখানে গান্ধীজির সঙ্গে কংগ্রেস নেতাদের তফাৎ। ফলে দেখতে পাচ্ছি, ভারত দিন দিন মডার্ন হচ্ছে, কিন্তু মরাল হচ্ছে না। এরকম ভারতে গান্ধীজি বাঁচতে চাইতেন না। বেঁচে থাকলে প্রতিদিনই স্বজন-বিরোধ ঘটত। তাঁর শেষ অনসনটাও স্বজনের বিরুদ্ধে অনশন। ভারতের জনগন গান্ধীজীকে ঠিক চিনতে পারেনি। মহাত্মা বলেই দূরে সরিয়ে রেখেছে। গান্ধীজি, এক নৈতিক জগতের স্বপ্ন দ্রষ্টা। সে জগতে জনগনও নীতিনিষ্ট হবে। কেবলমাত্র রাজনীতি নিয়ে মত্ত থাকবে না। এখন তো দেখা যাচ্ছে তারা ধর্ম নিয়েও উন্মত্ত। ক্রান্তদর্শী তে এত দূর পর্যন্ত দেখাতে পারি নি। যদিও ক্রান্তদর্শী কথাটার মানেই হচ্ছে যে বহুদূর পর্যন্ত দেখতে পায়। ক্রান্তদর্শী এক অর্থে ‘সত্যসত্য’র পরিপূরক। সেই ছ’খানা আর চারখানা—এই দশখানা একই সূত্রে গাঁথা এক মালা।

নিজের সম্বন্ধে তাঁর বক্তব্য,—‘না-না, নিজেকে আমি বৃদ্ধ মনে করি না। আর প্রাজ্ঞ হয়েছি কী না তাও বলতে পারব না। হ্যাঁ, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে অভিজ্ঞতা বেড়েছে, ম্যাচিওরিটি এসেছে। এখন জেনেছি, আগুনে হাত দিলে হাত পোড়ে। এই বয়সে ‘রত্ন ও শ্রীমতী’ লেখা আর সম্ভব নয়। যেমন ক্রান্তদর্শীও যৌবনে লিখতে পারতুম না। এর নায়ক অনেক দূর পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছে, যা ঘটেনি তাও দেখতে পায়, সেই অতিক্রান্ত দৃষ্টি যৌবনে সম্ভব ছিল না। ক্রান্তদর্শী’র অন্য খামতি আছে, যেমন এখানে প্রকৃতির বর্ণনা খুব কম, তবু লিটারেরি অ্যাচিভমেণ্ট হিসাবে দেখলে বোধ হয় এটাই আমার সেরা লেখা। বিনুর বই (২য় খণ্ড, পরে প্রকাশিত হয়েছে) যদি লিখে উঠতে পারি, তাহলে হয়তো এর চেযে ভালো হতেও পারে। এই ম্যাচিওরিটি, এই জীবনদৃষ্টি সময়ের দান। তবু নিজেকে আমি এখনো প্রবীন বলে ভাবি না, নবীন বলেই ভাবি। তবে এও মানি, আয়ুষ্কালকে অযথা প্রলম্বিত করে কি হবে ? যে কাজ বাকি আছে সেটুকু সারতে পারলেই হল। কিছু কবিতা লিখতে চাই, ব্যালাড লেখার সংকল্প রয়েছে, আরও একটা ছোট উপন্যাসের কল্পনাও লালন করছি। জীবনটা পুরোপুরি নিখুঁত না হলেও নিতান্ত অসার্থক না হলেই আমি তুষ্ট। এখনো কিছু দেবার আছে। দিয়ে যেতে পারলেই আমি ধন্য’। 

অন্নদাশঙ্কর একজন মানবতা বাদী লেখক। তাঁর কাছে মানুষের পরিচয় শুধু মানুষ হিসাবে। ছেলেবেলার স্মৃতিতে তিনি বলেছেন,—‘এক পুরাতন শক্ত পরিবারে আমার জন্ম। আমার বয়স যখন সাত কি আট বছর বয়স তখন আমার মা, বাবা, বৈষ্ণবধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন। তারপর থেকে আমি বৈষ্ণব ঐতিহ্যে মানুষ, কিন্তু আমাদের বাড়ির পেছনেই বাস করতেন এক ঘর মুসলমান, পাড়াতেই এক ঘর খ্রাষ্টান ও এক ঘর ব্রাহ্মণ। এছাড়া প্রায়ই আমাদের বাড়িতে বাবা ও কাকাদের নানা সম্প্রদায়ের বন্ধুবান্ধব আসতেন। আমার সবচেয়ে ছেলেবেলার ফটো যার কোলে বসে তোলা, তিনি আমাদের পাঠান মাষ্টার। পারিবারিক গ্রুপ ফটোতে তাঁরও স্থান। বাড়িতে অন্যান্য ধর্মগ্রন্থের মধ্যে বাইবেলও ছিল। ছেলেবেলায় আমার কাকা আমাকে চার্চেও নিয়ে গেছেন। সেখানে আমি চোখ বুঁজে উপাসনাও করেছি, মন্ত্রপূত বুটিজস লও মুখে দিয়েছি। আমাদের বাড়িতে বাবাজী মাতাজীরা যেমন আসতেন, তেমনি আসতেন ফকির, যোগী ও কত রকম লৌকিক ধর্মের সাধু-সন্ত। তখন বুঝতে পারিনি, এখন বুঝতে পারি যে মানুষকে হিন্দু, মুসলমান বা খ্রীষ্টান বলে বোঝান যায় না’।

তথ্যপঞ্জী

১) ‘দেশ’ ১০ নভেম্বর ১৯৯০ ‘প্রেম ছাড়া শিল্প হয়’ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন সুরজিৎ দাশগুপ্ত।

২) কবিতীর্থ সাহিত্য পত্রিকা, আগষ্ট ১৯৯৪, অন্নদাশঙ্কর ও ওড়িয়া সাহিত্য-কৃষ্ণচন্দ্র ভুঞ্যা ও অন্নদাশঙ্করের ওড়িয়া কবিতা নরেন্দ্র নাথ মিশ্র এবং জীবনকথা- সুরজিৎ দাশগুপ্ত। ভবিষ্যৎ। ভ্রমণ ও প্রবন্ধ।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*