সর্বদলীয় বৈঠক গণতন্ত্রকেই পোক্ত করে

কল্যাণ সেনগুপ্ত

সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকার ও বিরোধী, দুপক্ষই যদি আলাপ আলোচনার মধ্য দিয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌছতে পারে তবে তা হয়ে ওঠে সর্বাধিক শুভপন্থা। তবে এই সংসদীয় গনতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি খারাপ দিক হচ্ছে, সব দলই চায় সবসময় সব ঘটনার মধ্য দিয়ে নিজদলের লাভ এবং প্রতিপক্ষের লোকসান ঘটাতে। ফলে এতে কাজিয়া বৃদ্ধি পায়, জনসেবা বিঘ্নিত হয়। কিন্তু এই সবদলের বৈঠকের মধ্য দিয়ে সরকার ও বিরোধী, দুপক্ষেরই সুযোগ থাকছে নিজেদের কুশলতা প্রমাণের এবং এর থেকে রাজনৈতিক লাভ আদায় করা ও প্রতিপক্ষকে লাভের সুযোগ নিতে না দেওয়া।তবে লক্ষ্য করা গেছে, এইসব বৈঠক থেকে মোটের উপর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মানুষের পক্ষে সঠিক সিদ্ধান্তই গৃহীত হয়ে থাকে।

সাধারণ মানুষ সবসময়ই চায় ও পছন্দ করে যে, সরকার সবদলের সাথে কথা বলে সব সমস্যার সমাধান করুক। রাজ্যের মানুষ কিছুদিন আগেও দেখেছে সরকার জেলায় জেলায় তার প্রশাসনিক সভা করছে এবং তা মানুষকে জানাতে টিভিতেও তা সম্প্রচারিত করা হয়েছে। স্বভাবতই মানুষ খুব খুশী হয়, কারণ তারা সবকিছু চোখের উপর দেখতে পাচ্ছে ও জানতে পারছে বলে। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষ প্রকারান্তরে মানসিকভাবে একাত্মতাবোধ করে এরকম প্রশাসনিক সভার সঙ্গে। গণতন্ত্রে এর গুরুত্ব অপরিসীম। এর রাজনৈতিক লাভ কিন্তু ভোগ করে সরকার বা শাসকদল। কারণ মানুষ স্বচ্ছতা পছন্দ করে।

অনুরূপভাবে বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে সরকার যদি মাঝেমধ্যেই সর্বদলীয় বৈঠক ডাকে এবং তা টিভিতে লাইভ সম্প্রসারিত হয় তাহলে তার লাভও ভোগ করবে অবশ্যই শাসকদল। সরকার কোন সমস্যার সমাধানে উপযুক্ত ব্যাবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হলেই বিরোধীপক্ষ নানা ভাবে সরকারকে আক্রমণ করে বক্তব্য রাখবে। কারণ মানুষ ভুলত্রুটিকে খুব বেশি অন্যায় মনে করেনা, অন্যায় ভাবে তখনই, যখন দেখে ভুলকে স্বীকার না করে অনমনীয় মনোভাব দেখিয়ে জেদপুর্বক ভুল পথেই চলতে থাকে সরকার। অতীতে বামেদের এমন ভুলের এবং তা সংশোধন না করার চূড়ান্ত মাশুল দিতে হয়েছে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে। গণতন্ত্রে গা জোয়ারী মনোভাব আদৌ কাম্য নয়। পুলিশ প্রশাসন ও দমন পীড়নের সাহায্যে  আপত্তিজনক সিদ্ধান্তকে কার্যকরী করা গেলেও জনমানসে তা গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে এবং নির্বাচনে তার হিসেব চোকাতে হয়। কিন্তু সুবুদ্ধিমনস্ক প্রশাসন যে কোন বিতর্কিত সিদ্ধান্তকেই সবদলের বৈঠকে উপস্থিত করে আলোচনা করে এবং  প্রয়োজনে একাধিক বৈঠক করে ধৈর্য সহকারে লেগে থেকে বিরোধী পক্ষের সাথে একটি নূন্যতম বোঝাপড়ায় আসতে সক্ষম হতে পারলে অনেক বড় বিপর্যয় এড়ানো যায়। এছাড়াও অনেক ছোটখাটো সমস্যাও সবদলের বৈঠকে অতি সহজেই মিটিয়ে ফেলা যায়। যেমন ধরা যাক, করোনা মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন স্থানে কোয়েন্টারিন সেন্টার বা সেফ হাউস হিসেবে ব্যবহার করতে চাইলে গোল বাধাচ্ছে স্থানীয় মানুষজন এবং যার পিছনে অবশ্যই পরোক্ষ মদত আছে কোন বিরোধীশক্তির। এসব সমস্যার সমাধান খুব সহজভাবেই মিটে যায় সর্বদলীয় সিদ্ধান্ত থাকলে। এছাড়াও সবদলের বৈঠককে হাতিয়ার করে শাসকদল সুকৌশলে রাজনীতির ময়দানে প্রধান শত্রুকে অনায়াসেই কোণঠাসা করতে পারে বাকিদের সাহায্য নিয়ে।

সর্বদলীয় বৈঠকের অভ্যাস গোটা দেশেই খুব বেশি চালু নয়। কিন্তু গণতন্ত্রে এটি অত্যন্ত জরুরি পদক্ষেপ। তবু কৃতিত্ব লাভের তাড়নায় তা সম্ভব হয়না। সমালোচনার সুযোগদান ও তা গ্রহণের জন্য যে উদারতার প্রয়োজন তার খামতি সবদলেরই সংকীর্ণ ও  সুবুদ্ধিহীন চালু রাজনীতির ধারায় বিদ্যমান। এরজন্য এককভাবে কোন দলকেই দায়ী করা যায়না, দায়ী হচ্ছে দৈনন্দিন ব্যবহারিক রাজনীতির সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গী। সাহস করে এর থেকে বেরিয়ে এসে  সবার মতামত নিয়ে চলার মধ্যেই সুপ্ত আছে গণতন্ত্রের শুভ অগ্রগতি। এপথে চমক নেই ঠিকই, কিন্তু আছে নিশ্চিত সাফল্যের চাবিকাঠি। মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্রের সঠিক সাধনার সফলতা রাজনীতিতে নেতা নেত্রীকে অমরত্ব দান করে।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*